আবু নাসের অনীক
লেখাটির প্রথম পর্বে আলোচনা করেছিলাম ফ্রান্সের ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ ফর্ম হওয়ার প্রেক্ষাপটের সাথে গণঅভ্যূত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অমিল প্রসঙ্গে।
এখানে আলোচনা করবো ফ্রান্স, ইরান বা ইতালীতে দ্বিতীয় রিপাবলিক যে সমস্ত রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছে তাদের সাথে এনসিপি’র মিল ও অমিল নিয়ে। এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, রাজনৈতিক দল হিসাবে তার শ্রেণী চরিত্র কী।
যে কয়েকটি রাষ্ট্রে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো সেগুলি সবগুলোই ছিলো গণমিলিশিয়া বাহিনীর নেতৃত্বে বিপ্লব। এবং এর পেছনে যে রাজনৈতিক শক্তি ছিলো সেটি রাষ্ট্রের নিম্ম শ্রেণীর অংশ।
বাংলাদেশে ২৪ এ বিপ্লব; এমনকি সশ্রস্ত্র গণঅভ্যূত্থানও ঘটে নাই। এটি ছিলো একটি স্বতঃস্ফূর্ত (কারো কারো মতে পরিকল্পিত) আরবান মিডিল ক্লাস আর শহুরে শ্রমজীবী মানুষের গণঅভ্যূত্থাণ।
যার নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্ররা। যাদের শ্রেণীগত অবস্থান পেটি বুর্জোয়া। এটি বলে রাখি শ্রেণীগতভাবে বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘সুবিধাবাদী’।
পরবর্তীতে এই ছাত্রদেরই একটি অংশ রাজনৈতিক দল গঠন করেছে এনসিপি। তারাই দাবী করছে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ করতে হবে। শ্রেণীগত জায়গা থেকে একটি টিপিক্যাল পেটি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল করবে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’!!
দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ডয়চে ভেলেকে বলেন,‘আমরা জুলাই বিপ্লব এবং ২০২৪ এর চেতনায় একটি দেশ গড়তে চাই। সেজন্য আমরা সেকেন্ড রিপাবলিকের কথা বলেছি। এজন্য সংবিধান নতুন করে প্রণয়নের দরকার’(১ মার্চ ২০২৫)।
কিন্তু জুলাইয়ে কোন বিপ্লব হয় নাই; যতোই আপনারা এটাকে বিপ্লব বলার চেষ্টা করেন না কেন। এটি ছিলো ছাত্র-জনতার গণঅভ্যূত্থান। আপনারা ২৪ এর চেতনায় দেশ গড়তে চেয়েছেন এজন্য একটি রাজনৈতিক দল করেছেন।
সমস্যা হলো, আপনারা যে প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে এনসিপি গঠন করেছেন সেটাই তো জুলাই চেতনার পরিপন্থী। যেখানে দল গঠনই সেই চেতনাকে ধারণ করে করতে পারলেন না; সেখানে দেশ গঠন করা তো অনেক পরের বিষয়।
আপনারা প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি পাল্টে নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা করতে চাইলেও প্রথমেই তার খেলাপ করেছেন।
রাজনীতিবিদসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদেরকে নিয়ে ইফতার পার্টি করলেন হোটেল কন্টিনেন্টালে কোটি টাকে ব্যয়ে। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঠে তাঁবু বানিয়ে ইফতারের আয়োজন করলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য।
অর্থাত মুখে বলেন এক আর কার্যক্রম করেন তার বিপরিত। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা যেভাবে শোডাউন করেন আপনাদের নেতারা পারলে তার চাইতেও একটু বেশি করেন।
আসিয়াকে দেখতে ঢাকায় থেকে একবারও হাসপাতালে যেতে পারলেন না; অথচ সে মারা গেলে পুলিশের হেলিকাপ্টার ব্যবহার করে ফুটেজ নেওয়ার জন্য চলে গেলেন মাগুরা!!
আপনারই বলেন ছাত্র নির্ভর একটি দল, জুলাই চেতনার দল; সেই আপনারা সুরম্য কার্যালয়ে বসে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করছেন। এদিক-ওদিক যাওয়ার জন্য বিলাসবহুল গাড়ি, এমনকি হেলিকাপ্টার ব্যবহার করছেন।
এই বিপুল অর্থের উৎস কী? এর উত্তরে নাহিদ ইসলাম বলেন,বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আর্থিক সহায়তা ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা আসা উচিত। তবে, এককভাবে এটি সম্ভব নয় এবং তাদের সহায়তাকারীদের নাম প্রকাশ করতে সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রয়োজন (০৭ মার্চ ২০২৫-সংবাদ সারাবেলা)।
কি হাস্যকর বিষয়! অন্যরা প্রকাশ করেনা বলে আপনারা করবেন না? তাহলে পরিবর্তনের কথা বলে বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেই তো গা ভাসাচ্ছেন।
আবার বলছেন নাম প্রকাশ করলে সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা লাগবে। অর্থাত আপনারা তাদের কাছ থেকেই অর্থ সাহায্য নিচ্ছেন যাদের নাম প্রকাশ হলে তারা জনরোষে পতিত হবে।
কেন ধনী ব্যবসায়ীরা চাঁদা দিচ্ছে? এই অভিযোগ তো সবসময়ই আওয়ামী লীগ, বিএনপির মতো বড় দলগুলোকে বলে এসেছেন এতদিন; এখন এই নামগুলোর সঙ্গে নিজেরা যুক্ত হয়েছেন । তাহলে আদর্শ, বিবেচনাবোধ কিংবা পক্ষ-প্রতিপক্ষ কোথায় থাকে আর!
বাংলাদেশের এই লুটেরাগোষ্ঠী যেমনভাবে অন্য রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে পূর্বে বিভিন্ন অন্যায় সুযোগ গ্রহণ করেছে আপনারও তাদের গাটছাড়ায় যুক্ত হয়েছেন। এইটা অস্বীকারের কোন সুযোগ নাই।
এনসিপি’র সদস্য সচিব আক্তার বলেছেন,‘বিদ্যমান সংবিধানের মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বাংলাদেশে ইসলামফোবিয়ার চর্চা হয়েছে। এই শব্দের মধ্য দিয়ে ধর্মের সম্প্রীতির বদলে বিভাজন তৈরি করা হয়েছে। রাজনীতির মাধ্যমে বিভাজন আরও বাড়ছে। ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দের যে রাজনীতি,এর বাইরে গিয়ে সম্প্রীতির রাজনীতি করতে চাই’ (১৯ মার্চ ২০২৫-সমকাল)।
এই চিন্তাটি সঠিক না। একইসাথে পশ্চাৎপদ এবং অতি দক্ষিনপন্থী। আগে বোঝা প্রয়োজন সমাজে-রাষ্ট্রে ইসলামফোবিয়া তৈরি হবার কারণ কি? কখন এই ইসলামফোবিয়া বৃদ্ধি পায়?
হেফাজত যখন তার পশ্চাৎপদ ১৩ দফা দাবী উপস্থাপন করে; হিযবুত তাহরীর খেলাফত কায়েম করতে চায় বা এই সময়ে মাজার ভেঙে ফেলা,লালন বা বসন্ত উৎসব করতে না দেওয়া, গান-বাজনা বন্ধ করার হুমকী দেওয়া, ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা, মোরাল পুলিশিং করা, মব তৈরি করে সহিংসতা-হত্যা, লেখার জন্য ধর্ম অবমাননার কথা বলে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকী দেওয়া এসবই ইসলামফোবিয়া তৈরি করে।
এর সাথে ধর্ম নিরেপেক্ষতার সম্পর্ক কোথায়? ইসলাম ধর্ম পালনে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বা গোষ্ঠীগতভাবে কি কোন বাধা সৃষ্টি করা হয়? করা হয় না। আজকে যারা ইসলামফোব তৈরি করছে তাদের প্রতি এনসিপি অনেক বেশি নমনীয়।
আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করলেও অন্য বিষয়ে যেভাবে হাসনাত বা সার্জিস হুমকী প্রদান করে এই বিষয়ে তারা নিশ্চুপ থাকে এবং তাদেরকে মব করতে উৎসাহ দেয়; কোন কোন সময় প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে।
এজন্যই তারা এখন ধর্ম নিরেপেক্ষতার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে। এনসিপি ৭১ এর চেতনা ধারণ করে অন্যদিকে ধর্ম নিরেপক্ষতাকে একিউজ করছে! বুঝুন অবস্থা!
এনসিপি‘র জৈষ্ঠ্য যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা বলছেন,‘নারীদের পোষাক-আসাক কি হবে; পুরুষের কি হবে; শিশুদের কি হবে এই সবকিছুর জন্য যদি প্রয়োজনবোধ করি জাতীয়ভাবে তাহলে আমাদের জন্য বোর্ড গঠন করে দেওয়া হোক। এবিষয়ে আমরা একটা ন্যাশনাল কনসাস ডেভলপ করতে চাই।’
খালেদ মহিউদ্দিন যখন সামান্থাকে বলছেন,‘নারী-পুরুষের বিভেদ আপনারা দেখছেন না; তার প্রতিক্রিয়াতে সামন্থা বলছেন,‘এখানে বাস্তবতা আছে।’ প্রকারন্তরে এটাই বোঝায় এনসিপি নারী-পুরুষের বিভেদকে সার্টিফাই করছে।
আমার মনে হয়, আমি পরিস্কার করতে পেরেছি তারা ঠিক কী কারণে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ এর দাবী উপস্থাপন করেছেন। তারা যে ভয়েজ রেডি করছেন এর জন্য সেটি একটি স্ট্যান্ডবাজী বক্তব্য।
ব্যবহারিকভাবে যা তারা মনে করছেন, সেটি তাদের বিভিন্ন নেতাদের বক্তব্যেই উঠে আসছে। এবং সেটি প্রয়োগ করতে হলে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ তাদের করতে হবে। কারণ বর্তমান রিপাবলিক রেখে সেটি সম্ভব না।
আর ফর্মালি যা বলছে সেটি বাস্তবায়নের জন্য সেকেন্ড রিপাবলিকের প্রয়োজন নাই। এবং শ্রেণীগত জায়গা থেকে তারা সেটি করবেও না।
তাদের সমস্ত ব্যবহারিক চিন্তা এবং কর্মকান্ড ৭১ এর সাথে সাংঘর্ষিক যেটা প্রথম পর্বের লেখাতেই আমি বলেছি।
এনসিপি’র কাছে কার্যত নতুন কিছু প্রত্যাশা করার নাই। বরং বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদী রাজনীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এনসিপি সামাজিক-রাজনৈতিক সম্মতি উৎপাদনে ভূমিকা রাখছে এবং রাখবে।
সেটি রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করার জন্যই তারা ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ নিয়ে কথা বলছে। আল্টিমেটলি এনসিপি ‘মোল্লা তেরা খুন সে; ইনকিলাব আয়া হে’ এই শ্লোগানকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করছে।
তারা তাদের মিত্রশক্তি হিসাবে এদেরকেই (মুখে স্বীকার না করলেও) নির্বাচন করে নিয়েছে। এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অন্যরা যেমন অনৈতিক চর্চা করেছে তারাও সেটি করছে।
বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি অর্জনের জন্য গণমানুষের রাজনৈতিক শক্তির বিকল্প নাই! আর সেটি বিচার করার এবং গড়ে তোলার মানদন্ড শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গী।
চার বছর আগের আমার একটা লেখার কয়েকটি লাইন দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। সেদিন লিখেছিলাম আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ্য করে।
‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুঁজি করে এ এক ভয়ঙ্কর খেলা। অনেকটা সাপ-লুডু খেলার মতো। মই বেয়ে যেমন উপরে ওঠা যায় আবার ভুল চালে সাপ গিলে খায়। মামুনুল হকদের মতো ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক অপশক্তি সুযোগের অপেক্ষায় আছে গিলে খাওয়ার।’ (১৯ মার্চ ২০২১)
চার বছর পর সেটাই ঘটেছে। আজকে এনসিপিকে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বলছি, ‘২৪ এর চেতনাকে’ পুঁজি করে এ এক ভয়ঙ্কর খেলা। অনেকটা সাপ-লুডু খেলার মতো। মই বেয়ে যেমন উপরে ওঠা যায় আবার ভুল চালে সাপ গিলে খায়। মামুনুল হক আর জামায়াতের মতো ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক অপশক্তি সুযোগের অপেক্ষায় আছে গিলে খাওয়ার।
সাবধান হলে ভালো নতুবা আওয়ামী লীগের মতন পরিণতির জন্য অপেক্ষা করুন!