বাঘারপাড়ায় কাবিটা ও কাবিখা প্রকল্পের টাকা বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও ইউপি চেয়ারম্যানের পকেটে

0
13

বাঘারপাড়া প্রতিনিধি

যশোরের বাঘারপাড়ায় চলতি অর্থ বছরের কাবিটা (গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার) ও কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি) প্রকল্পে চরম অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকল্পের বেশীর ভাগ কাজ না করেই বিল উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে। এমনকি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সভাপতি। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকতার যোগসাজসেই কাজ না করেই বিল তুলে নিয়েছেন প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কাবিটা ও কাবিখা সংস্কার কর্মসূচির অধীন গ্রামীণ পর্যায়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়নে (সাধারন) ২০২১-২২ অর্থ-বছরে প্রথম পর্যায়ের এ উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ৩৭ লাখ ৮২ হাজার ৬১৪ টাকা, ৮০.০৩৯ মেট্রিক টন চাল ও ৮০.০৩৯ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেয় সরকার। এসব বরাদ্দে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। কাজের তদারকি করেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির প্রকল্পের শ্রমিক দিয়ে কাবিটা ও কাবিখা কর্মসূচির কয়েকটি প্রকল্পে নাম মাত্র কাজ করানো হয়েছে। কিছু প্রকল্পে কোন কাজই হয়নি। আর এসব প্রকল্পের বিল ছাড় করেছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা। এ উপজেলার সদ্য বিদায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সামসুন নাহার কাজ না দেখে তড়িঘড়ি করে নিজের ভাগেরটা কেটে রেখে বিল ছাড় দিয়েছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় উপসচিব স্বাক্ষরিত পত্রে অর্থ উত্তোলনের ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত কাজের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। ২০২১- ২০২২ অর্থ বছরে প্রথম পর্যায় কাবিটা/কাবিখা কর্মসূচীর আওতায় গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষনাবেক্ষণ ১ম পর্যায়ে নারিকেলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ২৪ টাকা নগদ অর্থ, ৭.৯১৫ মেট্রিক টন চাল ও ৭.৯১৫ মেট্রিক টন গম বরাদ্ধ রাখা হয়।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের পশ্চিমা দাখিল মাদরাসা হইতে শহিদের বাড়ি পর্যন্ত কাঁচা রাস্তা মাটি দ্বারা সংস্কার বাবদ ২ লাখ ৪ হাজার ২৪ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এখানে কোনো সংস্কারের কাজ না করেই পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রকল্পের সভাপতি ইউপি সদস্য জাহিদ হাসান জানান, বিলে স্বাক্ষর করেছি। টাকার কথা বললে চেয়ারম্যান বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি আরো বলেন, দেখি ঈদের আগে কোনো লাইন হয় না-কি।

একই ইউনিয়নের পলাশ মাস্টারের বাড়ি হইতে মফিজের বাড়ি পর্যন্ত মাটি দ্বারা সংস্কার বাবদ ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখে সরকার। এখানে ৪০ দিনের কর্মসূচিতে নিয়জিত শ্রমিকদের দিয়ে সামান্য কিছু মাটি দেওয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পের সভাপতি ইউপি সদস্য রেবা খাতুন জানিয়েছেন, প্রকল্পের বিল উত্তোলনের জন্য চেয়ারম্যান আমার স্বাক্ষর নিয়েছেন। কোনো টাকা পাইনি। চেয়ারম্যানই সব জানে।

এ বিষয়ে চেয়ারম্যান বাবলু সাহা বলেন, সব প্রকল্পের কাজই করা হয়েছে যা সংশ্লিষ্ট ইউপি মেম্বাররা জানে।

রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৬০৪ টাকা নগদ, ৭.৮৬৩ মেট্রিক টন চাল ও ৭.৮৬৩ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ রাখা হয়। এ ইউনিয়নে রামকৃষ্ণপুর ইমানীর জমির সামনে হতে তেমাথা মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা মাটি দ্বারা মেরামত ও তাল গাছের চারা রোপনে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৬ শত চার টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। এই প্রকল্পসহ একাধিক প্রকল্পে তালগাছের চারা রোপনের সিদ্ধান্ত থাকলেও কোথাও তাল গাছের চারা খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারপরও এ প্রকল্পের পুরো অর্থ ছাড় করেছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা।

ওই প্রকল্পের সভাপতি চেয়ারম্যান মঞ্জুর রশিদ স্বপনের ফোনটি বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে প্রকল্পের সম্পাদক ইউপি সদস্য রাবেয়া বেগম জানেন না তিনি ‘সম্পাদক’। কাজ না করার বিষয়ে তিনি বলেন, যদি কাজ না হয়ে থাকে তবে অবশ্যই চেয়ারম্যান করে দেবেনে।

জহুরপুর ইউনিয়ন পরিষদে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৩৭২ টাকা নগদ, ৬.৩১৪ মেট্রিক টন চাল ও ৬.৩১৪ গম বরাদ্ধ রাখা হয়। এ ইউনিয়নে নরসিংপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে শমসের বিশ্বাসের বাড়ি পর্যন্ত সংস্কারের জন্য ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩২৪ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়। এ প্রকল্পে কোন কাজ না করে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। প্রকল্পের সভাপতি ইউপি সদস্য আব্দুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, শতভাগ কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে বিলে স্বাক্ষর করে দিয়েছি টাকা তুলবেন ইউপি চেয়ারম্যান।

ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান মিন্টু জানান, সব কাজই করা হয়েছে। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের সাথে আগামীকাল দেখা করতে চান।

একই ইউনিয়নে উত্তর চাঁদপুর আব্দুল ডিলারের বাড়ি হতে মুক্তারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত ও তাল গাছের চারা রোপন বাবদ ৩.১৫৭ মেট্রিক টন চাল বরাদ্ধ রাখা হয়। এ প্রকল্পে কোন কাজ না করে সমূদয় অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের সভাপতি সংরক্ষিত ইউপি সদস্য তহমিনা বেগম জানান, প্রকল্পের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। চেয়ারম্যান ডেকে নিয়ে কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছেন। বিল তুলেছেন নাকি না অন্য কিছু করেছেন তার কিছুই আমি জানি না। নতুন মেম্বারতো তাই এ বিষয়ে আমার ধারণা কম।

তবে এসব বিষয়ে কথা বললে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য ও প্রকল্পের সভাপতি জানান, বরাদ্দের নির্ধারিত ভাগের একটি বড় অংশ বিশেষ পার্সেন্টেজ হিসাবে দিতে হয় প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে। এতে চলে যায় মোটা অংকের অংশটি। এ কারনে সঠিক ভাবে কাজ করা সম্ভব হয় না।

বিদায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সামসুন নাহার জানান, কাজ দেখেই বিল ছাড় করা হয়েছে। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি।

যশোর সদরের ও এ উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ জানান, আমি কিছুদিন হলো এই অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্বে আছি। যা হয়েছে সবই আমার আসার আগের পকল্প। তাই এ বিষয় আগের পিআইও ভালো জানেন।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আ ন ম আবুজর গিফারী বলেন, প্রকল্পে অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।