এবার যশোরে তোষককান্ড : যশোর কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল এর কেনাকাটায় পুকুরচুরি

0
45
যশোর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সখিনা বেগমের আলিশান বাড়ি (বাড়িটির নাম দিয়েছেন 'সাময়িকী')

সত্যপাঠ রিপোর্ট

পাবনা রুপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বালিশ কান্ড, চট্টগ্রাম মেডিকেলের বিভিন্ন উপাদান কেনাকাটা অনিয়ম নিয়ে ও ফরিদপুরের মেডিকেলের পর্দার কাপড় কেনাকাটার অনিয়মের চিত্র দেশজুড়ে আলোচনা এসেছিল। এবার তার সাথে যুক্ত হলো যশোর কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের আসবাবপত্র কেনাকাটায়।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে যশোর মহিলা কর্মজীবী হোস্টেলের আসবার কেনা বাবদ গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে বরাদ্দ দেয়া হয় ১৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।

হোস্টেলটির আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য এ বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় যশোর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের কার্যালয়। কিন্তু নামমাত্র কেনাকাটা করে পুরো টাকাটাই তসরুপ করেছে যশোর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সাবেক উপ-পরিচালক সখিনা বেগম। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, নারী ও শিশু কিশোর মন্ত্রলায়ের পক্ষ থেকে যশোর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে যশোর চাকুরীজীবী মহিলা হোস্টেলের আসবাবপত্র কেনাকাটার জন্য ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ১৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এই বরাদ্দের টাকা যশোর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সখিনা বেগম ২০টি সিঙ্গেল তোষকের ক্রয় মূল্য দেখান ৬৬ হাজার টাকা। যার প্রতিটি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩ হাজার ৩০০ টাকা। যা যশোরের স্থানীয় বাজার মূল্য প্রতিটি ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা। অথচ সখিনা বেগম নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিজেই এ দাম নির্ধারণ করেন।

এছাড়া সিঙ্গেল ২৬টি চৌকি খাটের ক্রয় মূল্য দেখান ৩ লাখ ৩২ হাজার ৮শ’ টাকা। সেখানে প্রতিটি চৌকি খাটের মূল্য দেখানো হয়েছে ১২ হাজার ৮শ’ টাকা। যার প্রতিটি চৌকি খাটের স্থানীয় বাজার মূল্য ১৫শ’ থেকে ২ হাজার টাকা। দুইটি ছোট স্টিল আলমারির ক্রয়ের মূল্য দেখান ৪৭ হাজার টাকা। যার প্রতিটির দাম নির্ধারণ করা হয় ২৩ হাজার ৫শ’ টাকা। অথচ স্থানীয় বাজারে এই আলমারির দাম ৭ হাজার টাকা। একটি ছোট স্টিল ফাইল কেবিনেট দাম দেখানো হয় ১৬ হাজার ৯শ’ ৫০ টাকা। এ ধরনের স্টিল ফাইল ক্যাবিনেটের যশোরের বাজার মূল্য ৬ হাজার টাকা।

১২টি ড্রেসিং টেবিলের ক্রয় মূল্য দেখানো হয় ২ লাখ ৪ হাজার টাকা। যার প্রতিটি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৭ হাজার টাকা। বাজারে এই ধরনের ড্রেসিং টেবিলের দাম সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা। দুইটি ডাইনিং টেবিলের ক্রয় মূল্য দেখানো হয় ৫০ হাজার টাকা। যার প্রতিটির মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২৫ হাজার টাকা করে। স্থানীয় বাজারে ডাইনিং টেবিলের দাম ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। হাতলযুক্ত সাধারণ সোফা সেট একটি ৩৫ হাজার পাঁচশ টাকা মূল্য দেখানো হয়। যার প্রকৃত বাজার মূল্য ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। ৬৪টি পণ্যের মূল্য দেখানো হয় ৭ লাখ ৭০ হাজার ২৫০ টাকা। ৭ শতাংশ ভ্যাট সহ দাম দেখানো হয় ৮ লাখ ২৪ হাজার ১৬৭ টাকা।

একটি ৫৬ সেফটি ড্রিপ ফ্রিজের মূল্য দেখানো হয় এক লাখ টাকা, প্রকৃতপক্ষে এটি বাজার মূল্য ১৮ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা। একটি ফটোগ্রফি মেশিন দাম দেখানো হয় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যার প্রকৃত বাজার মূল্য ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা। একটি চায়না ব্রান্ডের ৫৬ ইঞ্চি টেলিভিশন দাম দেখানো এক লাখ টাকা (নন-ব্রান্ড), যার প্রকৃত বাজার মূল্য ১৫ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা। একটি ডেক্সটপ কম্পিউটারের মূল্য দেখানো হয় ৮০ হাজার টাকা, যার প্রকৃত বাজার মূল্য ২৫ হাজার থেকে ২৮ হাজার টাকা। একটি প্রিন্টার দাম দেখানো হয় ২৫ হাজার টাকা, যার বাজার মূল্য ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। একটি স্ক্যানার মেশিন মূল্য দেখানো হয় ১০ হাজার টাকা, তবে অফিসে কোন স্ক্যানার মেশিন পাওয়া যায়নি। একটা ফ্যাক্স মেশিন মূল্য দেখানো হয় ১৫ হাজার টাকা। অফিসে গিয়ে কোন ফ্যাক্স মেশিন পাওয়া যায়নি। সাতটি পণ্যের মোট দাম দেখানো হয় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

এছাড়া বাকি অবশিষ্ট ৪ লাখ ৭১ হাজার ৮৩৩ টাকায় ক্রয় দেখানো হয়েছে ১২টি স্টিলের আলনা, একটি কম্পিউটার টেবিল, একটি চেয়ার, হাতলযুক্ত দশটি গদিওয়ালা চেয়ার, দুইটি জুনিয়র এক্সিকিউটিভ টেবিল, একটি এক্সিকিউটিভ টেবিল, একটি মিটসেফ, হাতলযুক্ত কাঠের চেয়ার তিনটি, রিডিং টেবিল ৩৬ টি, সাধারণ চেয়ার ২৬ টি।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, সখিনা বেগম যশোর মহিলা অধিদপ্তরে দায়িত্ব থাকাকালীন বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রণালয়ের দেওয়া টাকা পয়সা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিজেই তসরুপ করেছে। এরমধ্যে যশোরে কিশোর কাবে জন্য দেওয়া টিফিনের টাকা ও বিভিন্ন অনুদানের টাকা নিজে আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া নারীদের মাতৃকালীনের অনুদানের টাকাও তিনি আত্মসাৎ করেছেন। আত্মসাৎ করা টাকা দিয়ে যশোর মেডিকেল কলেজের সামনে মেইন রোডের সাথে (শংকরপুর মৌজায়) নুরুদ্দিন নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৪ শতক জমি ক্রয় করেছেন প্রায় এক কোটি টাকা দিয়ে। ওই জমির উপরে তিনি বর্তমানে তিনতলা আলিশান বাড়ি (বাড়িটির নাম দিয়েছেন ‘সাময়িকী’) তৈরি করেছেন। চতুর্থ তলার কাজ দ্রুত চালিয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় কানাঘোষাও শুরু হয়েছে।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, সখিনা বেগম ৬ থেকে ৭ বছর ধরে শংকরপুর এলাকার মাহবুবের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। বছর তিনেক আগে তিনি শংকরপুর বটতলা মেনডোরের সাথে মইনুদ্দিন নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে চার শতক জমি ক্রয় করেন প্রায় এক কোটি টাকা দিয়ে। বর্তমানে তিনি ওই জমিতে তিনতলা আলিশান বাড়ি কমপ্লিট করেছেন। জোরেশোরে চতুর্থ তলার কাজও চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি একটা চাকরি করে এত টাকা কোথায় পেলেন বিষয়টি নিয়ে এলাকায় গুঞ্জন চলছে! তার স্বামীও তেমন কিছুই করেন না। এই বিলাসবহুল জীবনযাপন নিয়ে অনেকের মধ্যে কৌতূহল শুরু হয়েছে। তার স্বামীও সারাদিন ঘরের ভেতরে আবদ্ধ থাকেন। এলাকায় কেউ কখনো তার চেহারাও দেখেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েজন স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানান, একটা মানুষ চাকরি করে শহরে ভাড়া বাড়ি থেকে এমন কত টাকায় বা জমাতে পার যে, তিন বছরের মধ্যে কোটি টাকার জমি ক্রয় করে আবার সেই জমির উপরে অন্তত ২ কোটি টাকা টাকার বেশি খরচ করে বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করা যায়। অনৈতিকভাবে উপার্জন করা টাকা ছাড়া এমন বাড়ি তৈরি করা সম্ভব নয় বলেও তিনি জানান।

এ বিষয়ে যশোর কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের অফিস সহকারি নাসরিন আক্তার মালার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যশোর কর্মজীবী মহিলাদের সুবিধার্থে কেনাকাটার জন্য সরকার হোস্টেলে বিপুল পরিমাণে টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। সেটা তিনি মহিলাদের দপ্তরের উপ-পরিচালক সখিনা বেগম সরকারের নিয়ম-নীতির কোন তোয়াক্কা না করে নামসর্বস্ব মালামাল ক্রয় করে হোস্টেলে সরবরাহ করেছে। তিনি আরো জানান, আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য একটি কমিটি থাকলেও কমিটির কারো কোন মূল্যায়ন না করে তিনি নিজের ইচ্ছামত নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের প্যাডে বিল ভাউচার করে মালামালগুলো সরবরাহ করেছে। মালামালগুলো গ্রহণ করা হয়েছে এই মর্মে একটা লিখিত নিয়েছেন তিনি। এছাড়া এ বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। ভুতুড়ে বিল ভাউচার দেখে আমিও অবাক হয়েছি। নিম্নমানের কিছু মালামাল দিয়ে উচ্চ মূল্য নির্ধারণ করেছে তিনি। বিষয়টি আমি বর্তমানের দায়িত্বে থাকা উপ-পরিচালক আনিসুর সাহেবকেও বিষয়টি জানিয়েছে। তিনি ইতিমধ্যে হোস্টেল পরিদর্শন করেছেন এবং বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

এদিকে, বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকবার যশোর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সাবেক উপ-পরিচালক সখিনা বেগমের মুঠোফোনে সংযোগ দিয়ে নানা অনিয়মের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বারবার ফোনটা রিসিভ বলেন আমি ব্যস্ত আছি? প্রকৃতপক্ষে গত দুই মাস ধরে সখিনা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বারবার বলেন, আজ আমি মনিরামপুরে, তো কাল সাতক্ষীরায় আছি। এভাবে নানা অজুহাতে দিন অতিবাহিত করতে থাকেন। একপর্যায়ে বুধবার সকাল থেকে দুপুরে মধ্যে কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি আবারো বললেন ব্যস্ত আছি। একথা বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

নিয়ে বিষয়টি নিয়ে যশোর মহিলা অধিদপ্তরের বর্তমানে দায়িত্বে থাকা উপ-পরিচালক আনিসুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এখানে এসেছি গত দু’মাস হলো। আসার পরপরই বিষয়টি জেনেছি। বিষয়টি জানার পরে সাবেক মহিলা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সখিনা বেগমকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি লিখিতভাবে জানিয়েছেন কেনাকাটার বিষয়টি বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে। তাই আমার মনে নেই। সখিনা ম্যাডামের এ ধরনের বক্তব্য আমি নোট করেছি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হবে বলে তিনি জানান।

বিষয়টি নিয়ে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ন সচিব মনোয়ারা ইশরাতের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যশোর মহিলা কর্মজীবী হোস্টেল জন্য আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল কেনাকাটার জন্য টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে গত দেড় বছর আগে। সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে কেনাকাটার বিল ভাউচার জমা দিয়েছে হয়তোবা আগেই। কিন্তু কেনাকাটায় অনিয়ম হয়েছে কিনা সেটা জানা নেই। তবে আপনাদের মাধ্যমে এখন বিষয়টি অবগত হলাম। অবশ্যই এ বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হবে। সখিনা বেগম টাকা আত্মসাৎ করে থাকলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।

উল্লেখ্য, পাবনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আবাসন প্রকল্পে অ-স্বাভাবিক দামে বালিশসহ আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী কেনায় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে গতবছর ১২ ডিসেম্বর পাবনায় একাধিক মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরমধ্যে একটি মামলায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সাজিন কনস্ট্রাকশনের স্বত্তাধিকারী শাহাদাত হোসেনকে আসামি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন কর্মকর্তারা।

সে সময়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্রিনসিটি প্রকল্পের ২০ ও ১৬ তলা ভবনের ১১০টি ফ্যাটের জন্য অস্বাভাবিক মূল্যে আসবাবপত্র কেনা ও তা ভবনে উঠানোর খরচ দেখানোর ঘটনা দেশ জুড়ে আলোচনা ঝড় তৈরি করে।

বিষয়টি এনিয়ে সংবাদমাধ্যমে ফলোও করে প্রকাশিত হবার পর জাতীয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি অনুসন্ধানে নামে। এই তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলমসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশপাশি দুদক মামলা দায়ের করেন।

ওই প্রকল্পের কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের থাকার জন্য গ্রিন সিটি আবাসন পল্লীতে ২০ তলা ১১টি ও ১৬ তলা ৮টি ভবন নির্মিত হয়েছিল। এরই মধ্যে ২০ তলা আটটি ও ১৬ তলা একটি ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়।সেই ভবনের প্রতিটি ফ্যাটের জন্য একটি বৈদ্যুতিক চুলার দাম ধরা হয়েছিলো ৭ হাজার ৭৪৭ টাকা এবং তা ভবনে তুলতে খরচ ধরা হয়েছিলো ৬ হাজার ৬৫০ টাকা, একটি বালিশের দাম ধরা হয়েছিলো ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা এবং তা ভবনে তুলতে খরচ ধরা হয়েছিলো ৭৩০ টাকা। একটি বৈদ্যুতিক কেটলির দাম ৫ হাজার ৩১৩ টাকা যা তুলতে খরচ দেখানো হয়েছিলো ২ হাজার ৯৪৫ টাকা।

অনুরূপভাবে, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বালিশ ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের পর্দা দুর্নীতির পর এবার সামনে এলো যশোর মহিলা কর্মজীবী হোস্টেলের কেনাকাটার নানা অনিয়ম।

চট্টগ্রামে নতুন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি), যেখানে ৭৫০ টাকার বালিশ ক্রয়ে ব্যয় প্রস্তাব করা হয় ২৭ হাজার ৭২০ টাকা, আর বালিশের কাভারের দাম ধরা হয় ২৮ হাজার টাকা, যার বাজার মূল্য ৫০০ টাকা। এছাড়া মাত্র ২০ টাকার হ্যান্ড গ্লাভসের দাম ধরা হয় ৩৫ হাজার টাকা, আর ১৫ টাকার টেস্ট টিউবের দাম ধরা হয় ৫৬ হাজার টাকা।একই সঙ্গে বিল্ডিং নির্মাণে মাল্টিপ্লাগের দাম ধরা হয় ৬ হাজার ৩০০ টাকা, যার বাজার মূল্য মাত্র ২৫০-৫০০ টাকা। অপারেশন থিয়েটারের রাবার কথের বাজার মূল্য ৫-৭শ টাকা হলেও প্রকল্প প্রস্তাবে দাম ধরা হয় ১০ হাজার টাকা, রেক্সিনের বাজার মূল্য ৩-৫শ টাকা হলেও প্রতিটি ৮৪ হাজার টাকায় কেনার প্রস্তাব করা হয়। সুতি তোয়ালে বাজারে ১০০-১০০০ টাকায় পাওয়া গেলেও প্রস্তাবনায় ধরা হয় ৫ হাজার ৮৮০ টাকা। ডাক্তারদের সাদা গাউনের বাজার মূল্য ১০০-২০০০ টাকা হলেও প্রকল্পে প্রস্তাব করা হয় ৪৯ হাজার টাকা। সার্জিক্যাল ক্যাপ ও মাক্সের দাম ধরা হয় ৮৪ হাজার টাকা, যার বাজার মূল্য মাত্র ১০০-২০০ টাকা। বাজারে সু-কাভার প্রতিটির দাম ২০-৫০ টাকা, এখানে প্রস্তাব করা হয় ১৭ হাজার ৫০০ টাকা।

উল্লেখ্য, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রালয়ের অধীন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নারীর উন্নয়ন ও সমতা ও দারিদ্র্য বিমোচন নানা ধরনের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে নারীর উন্নয়নে গৃহীত সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নারীবান্ধব আবাসিক-অনাবাসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বৃত্তিমূলক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের ও সুযোগ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। দরিদ্র মা ও শিশু মৃত্যু হার হ্রাস, মাতৃদুগ্ধ পানের হার বৃদ্ধি, গর্ভাবস্থায় উন্নত পুষ্টি উপাদান গ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে “দরিদ্র মা”র জন্য মাতৃত্বকাল ভাতা কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন এ দপ্তরটি।

এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮৬ সাল থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইনগত পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করে আসছেন। বিশেষ করে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের অধীনে ৭টি বিভাগীয় শহরে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) স্থাপন করে নারী-শিশুদের সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে। ওসিসি হতে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের চিকিৎসা সহায়তা, আইনি সহায়তা, পুলিশি সহায়তা, ডিএনএ পরীক্ষা, মানসিক কাউন্সেলিং, আশ্রয় এবং সমাজের পুণর্বাসনের জন্য সহযোগিতা প্রদান করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। কর্মজীবী মহিলাদের জন্য মহিলা হোষ্টেল ও কর্মজীবী নারীদের নিরাপদ আবাসন সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে সারাদেশে ৭ টি মহিলা হোষ্টেল পরিচালনা করে আসছে। সারাদেশে কাবে সংগঠিত করে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে কিশোর কিশোরীদের ক্ষমতায়ণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। দেশের ৭ বিভাগের ৭ জেলায় সকল উপজেলায় ৩৭৯টি কাবের মাধ্যমে নারী-শিশু উন্নয়নে নানা বিধ কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু একশণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনৈতিক কার্যকলাপের জন্য সরকারের এ মহৎ উদ্যোগকে অম্লান করে দিচ্ছে।