ফুল: পুলিশের শ্রেণী চরিত্র

0
94

আবু নাসের অনীক

গত কয়েকদিন ধরে শাবিপ্রবিতে ছাত্রদের আন্দোলন চলছে। প্রথম পর্যায়ে আন্দোলনটি ছিলো একটি ছাত্রী হলের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা ও হল প্রভোস্টের অসদাচরণের প্রতিবাদে। প্রাথমিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেমন কোন আন্দোলনকেই গুরুত্ব দেয়না এক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে।

ফলশ্রুতিতে এই আন্দোলনে বরাবরের মতো সরকারী দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ হামলা করেছে, এক পর্যায়ে ভিসি’র নির্দেশে পুলিশ হামলা করে, সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে ছাত্র-ছাত্রীদের আহত করে আন্দোলন দমন করতে চেয়েছে। যথারীতি নিয়মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সকল একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ এবং হল খালি করার নির্দেশ দিয়েছে।

পুলিশের হামলা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণার পর আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে গৃহীত দুইটি পদক্ষেপ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মূলত এই দুইটি বিষয় নিয়েই আলোচনা করতে চাই।

একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আন্দোলনকারী ছাত্রদের একটি অংশ হাটু গেড়ে বসে তাদের আন্দোলন কর্ডন করে রাখা পুলিশ সদস্যদের ফুল উপহার দিয়ে বরণ করার চেষ্টা করছে। পুলিশকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়ার এই প্রচেষ্টাকে অনেকেই সৃজনশীলতা হিসাবে দেখছেন। এটাকে আন্দোলনের একটি নতুন স্তর হিসাবে বিবেচনা করছেন। অনেকেই পুলিশকে ছাত্রদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়ার প্রচেষ্টাকে বিবেক জাগ্রত করা, শুভ চেতনার উদয় ঘটানো এমন নানা বিশেষণে জাস্টিফাই করছেন।

প্রকৃত বিষয়টি হচ্ছে, আমাদের এই সমস্ত ছাত্ররা রাষ্ট্র বোঝেনা। বোঝেনা বলেই, ছাত্রলীগ-পুলিশ হামলা করে, বোঝেনা বলেই প্রত্যেকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারী দলের ছাত্র সংগঠন সন্ত্রাসী রাজত্ব কায়েম করে। ভিসি হিসাবে তারাই নিয়োগ পায় যারা গডফাদারের ন্যায় আচারণ করতে পারে। বোঝেনা বলেই আমাদেরকে একটি পুলিশী রাষ্ট্রে বসবাস করতে বাধ্য হতে হয়!!

রাষ্ট্র একটি শোষণ যন্ত্র। এই যন্ত্রটিকে ক্রিয়াশীল রাখার জন্য যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান কার্যকর ভূমিকা পালন করে পুলিশ বাহিনী তারমধ্যে অন্যতম। ‘পুলিশ’ একটি বাহিনীর নাম। এখানে ব্যক্তির কোন ভূমিকা নেই। তাকে ফুল আর সাথে চন্দন দিয়ে বরণ করার চেষ্টা করলেও সে তার দমন-পীড়নের জায়গা থেকে একচুলও পিছনে সরবেনা।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার বলেন,‘আমরা এখানে দায়িত্ব পালনে এসেছি। ফুল নেওয়া এবং না নেওয়া আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা’। তিনি সত্যটাই বলেছেন। তাদের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশক্রমে আন্দোলনকে দমন করা। তার জন্য ছাত্রদের মাথা ফাটানো, হাত-পা ভেঙ্গে দেওয়া, প্রয়োজনে গুলিবর্ষণ করে হত্যা করা। এ সবকিছুই তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। যা বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে আমরা অনেকবার দেখেছি।

ছাত্ররা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে, পুলিশ একটা সিস্টেমের অধীন, যে সিস্টেমটাই গণবিরোধী। পুলিশ সেই গণবিরোধী সিস্টেমের পাহারাদার। যে বাহিনীটি এখনো ঔপনিবেশিক আমলের আইন দ্বারা পরিচালিত হয় সেই বাহিনীর মানবিক হয়ে ওঠা অসম্ভব একটি ব্যাপার। ফুল দিয়ে বরণ করার মতো কর্মসূচি দিয়ে তার চরিত্র বদল ঘটানো দিবাস্বপ্ন। বরং তা আন্দোলনের গতিপথকে বিভ্রান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

প্রশ্ন হতে পারে, পুলিশ কী তাহলে সবসময়ের জন্য একই আচরণ করবে? না, করবে না। আন্দোলনের তীব্রতায় আমরা অনেক সময়ই দেখেছি পুলিশ নিউট্রালাইজ হয়ে গেছে। ’৯০ এর গণআন্দোলনের শেষ ধাপে অর্থাৎ চুড়ান্ত বিজয়ের প্রান্তে এমনটিই ঘটেছিলো। ছাত্র-গণআন্দোলনের তীব্রতায় পুলিশ বাহিনীকে ঐ ভূমিকায় নিয়ে যেতে পারে, ফুল দিয়ে বরণ করার মতো কর্মসূচি দিয়ে নয়।

অন্যদিকে রাষ্ট্রের ও তার শাসকগোষ্ঠীর শ্রেণী চরিত্রের উপরেও নির্ভর করে পুলিশ বাহিনী কি ধরনের ভূমিকা পালন করবে। লুটেরা রাষ্ট্রব্যবস্থার পুলিশের শ্রেণী চরিত্র আর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার শ্রেণী চরিত্রের মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকে। এটাই আমাদের ছাত্রদের বুঝতে হবে। আম গাছে কাঠাল ধরবে এটা নিশ্চয়ই একধরনের অলীক চিন্তা হবে।

আন্দোলনের দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য ঘটনা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বন্ধ ঘোষণার বিপরিতে ছাত্রদের পাল্টা নির্দেশনা। এই কর্মসূচিই আন্দোলনকে নতুন প্রাণ দিয়েছে। সময় এসেছে পিছু না হটে পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। শাবিপ্রবি’র ছাত্রদের অভিনন্দন এধরনের কর্মসূচি ঘোষণা দিতে পারার জন্য। ছাত্রদের এই আন্দোলনের সফলতা কামনা করি ছাত্র আন্দোলনের একজন সাবেক কর্মী হিসাবে।