মাগুরায় বাসদ’র উদ্যোগে বেগম রোকেয়া স্মরণে আলোচনা সভা

0
53

মাগুরা প্রতিনিধি

আজ শুক্রবার বেগম রোকেয়ার ১৪১তম জন্ম ও ৮৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ দিবস উপলক্ষে বেগম রোকেয়া স্মরণে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিকদল-বাসদ মাগুরা জেলা শাখার উদ্যোগে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুক্রবার (১৭ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় শহরের পশ্চিম দোয়ারপাড় অদম্য পাঠশালায় (আমতলা) অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বাসদ কেন্দ্রীয় পাঠচক্র ফোরামের সদস্য প্রকৌশলী শম্পা বসু। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) এর কেন্দ্রীয় নেতা কাজী নজরুল ইসলাম ফিরোজ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য জাহিদুল আলম, জাসদ মাগুরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সমীর চক্রবর্তী, বিশিষ্ট সাংবাদিক রূপক আইচ। সভা পরিচালনা করেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ মাগুরা জেলা শাখার সংগঠক ভবতোষ বিশ্বাস জয়। আলোচনা সভা শেষে একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।

আলোচনা সভায় বক্তাগণ বলেন, সমাজে নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা, নারীর সামনে সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করার সাহস, যুক্তি ও আপন প্রত্যয় নিমার্ণের লক্ষ্যে আজীবন তিনি সংগ্রাম করেছেন–লেখনী ধরেছেন, স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, সংগঠন গড়ে তুলেছেন। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে এক রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তাঁর কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। সে সময় মেয়েদের লেখাপড়া ছিলো সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ ও পাপতুল্য। অশিক্ষার অভিশাপ ও পুরুষতন্ত্রের অবরোধ প্রথার মধ্যেই তিনি বড় হন। ভাই ইব্রাহিম সাবের ও বড় বোন করিমুন্নেসার কাছ থেকে কিছু বাংলা ও ইংরেজি শিখেছিলেন। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়তো তখন রোকেয়া মোমের আলোয় পড়ালেখা করতেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে ও ২৯ বছর বয়সে বিধবা হয়ে রোকেয়া বুঝেছিলেন সমাজে নারীর অবস্থান কতটা নিগৃহীত এবং এর বিরুদ্ধে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। তাই স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯০৯ সালে ভাগলপুরে নিজ বাড়িতেই ৫ জন ছাত্রীকে নিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এজন্য স্বামীর আত্মীয়স্বজন ও সমাজের নানা অংশের মানুষের কাছ থেকে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ও আঘাত সহ্য করতে হয়।

বক্তাগণ আরও বলেন, বেগম রোকেয়া সমাজে নারীর যে অবস্থান দেখতে চেয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর ৮৯ বছরেও আমরা সেখানে পৌঁছাতে পারিনি। বাহ্যিকভাবে হয়তো অনেক পরিবর্তন হয়েছে বলে বোধ হবে; নারী এমনকি মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীও হচ্ছেন। কিন্তু সমাজ মননে আরও বেশি অবক্ষয় ঘটে গেছে।

সারাদেশে নারী-শিশু ধর্ষণ-নির্যাতন-হত্যা এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দুই বছরের শিশুকন্যা বা ৬০ বছরের বৃদ্ধা যেকোন বয়সের নারী; হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান বা মুসলিম যেকোন ধর্মের নারী; পাহাড়ে বা সমতলে, ঘরে-পথে-স্কুলে-কারখানায় যেকোন স্থানে; দিনে বা রাতে যেকোন সময়ে বাংলাদেশে একজন নারী নির্যাতনের শিকার হতে পারেন। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, অপহরণ, বন্দি করে রেখে গণধর্ষণ, যৌতুকের জন্য নির্যাতন-হত্যা, বখাটেদের উৎপীড়ন, গণপরিবহনে যৌন হয়রানি-ধর্ষণ, ইন্টারনেটে ব্লাকমেইলসহ ঘরে বাইরে নানা উৎপীড়ন, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে সব সময় নারীকে উৎকণ্ঠা নিয়ে জীবনযাপন করতে হচ্ছে।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও বাংলাদেশের আইনে নারীর সমানাধিকার নাই। সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বিবাহ, বিবাহ-বিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব অর্থাৎ পারিবারিক জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আইনীভাবেই নারী বৈষম্যের শিকার। সমকাজে সমমজুরি আইনে থাকলেও; বাস্তবে প্রায় সমস্ত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারী পুরুষের তুলনায় কম মজুরি পেয়ে থাকেন। এখনও সরকারি হিসাব মতেই ১০০ জনে ৫২ জন নারীর বাল্যবিবাহ হয়। নারীরা দিনে প্রায় ১৬ ঘণ্টায় গড়ে ৪৫ ধরনের কাজ করেন। নারীর গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য এখনও জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এমন যে সন্তান লালন-পালনসহ পারিবার ও ঘর-গৃহস্থালি কাজের দায়িত্ব যেন শুধুই নারীর। এলাকা ও কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সেন্টার, গণ-পরিবহনে নারীর নিরাপত্তাহীনতা, নারীদের জন্য জেলা-উপজেলায় হোস্টেলসহ রাষ্ট্রীয় প্রায় কোন আয়োজন না থাকায় কর্মক্ষম, শিক্ষিত অনেক নারীই কর্মক্ষেত্রে আসতে পারছেন না বা কর্মক্ষেত্র থেকে ঝরে পড়ছেন। আজও এক দেশে দুই আইন বলবৎ; সরকারি চাকরিতে ৬ মাস সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি আর বেসরকারি চাকরিতে ৪ মাস সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটির নিয়ম বিদ্যমান রয়েছে। সেটাও অধিকাংশক্ষেত্রেই কেবল খাতা-কলমে; বাস্তবে শ্রমিক নারীরা গর্ভবতী হলে তার কপালে জোটে ছাঁটাই। এছাড়াও নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাষ্ট্রের তেমন কোন উদ্যোগ নেই। বিজ্ঞাপন, নাটক, সিনেমায় নারীকে পণ্যরূপে উপস্থাপন করা হয়। পর্নোগ্রাফি ও মাদক বন্ধে সরকার মুখে জিরো টলারেন্সের কথা বললেও বাস্তবে তেমন কোন কার্যকর উদ্যোগ নেই। মহিয়সী নারীদের জীবন ও কর্ম, বিভিন্ন গণ-আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা পাঠ্যবইয়ে অন্তভূক্তকরণ বা রাষ্ট্র ও সমাজে মূল্যায়িত হয় না। ওয়াজ-মাহফিলে নারীকে নিয়ে অশ্লীল-কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া হয়। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও ফতোয়া দিয়ে নারীর উপর অত্যাচার করা হয়। এ সবই ব্যক্তি মালিকানা ভিত্তিক শোষণমূলক পুঁজিবাদী আর্থ সামাজিক ব্যবস্থার কারণেই সৃষ্ট। এ ব্যবস্থায় নারী দ্বিমুখী শোষণ নির্যাতনের শিকার। একদিকে অর্থনৈতিক শোষণ অন্যদিকে ভোগবাদী পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার দ্বারা নির্যাতিত। ফলে এই শোষণমূলক ব্যক্তি মালিকানার সমাজ পরিবর্তন ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা পরিবর্তনে, সমাজের সকল বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, নারীমুক্তির আন্দোলনে বেগম রোকেয়া আজও প্রেরণার উৎস।