নিরাপদ পানি এবং স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার অভাবে নানা রোগে আক্রান্ত তালার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী

0
22

বাপ্পী তালা প্রতিনিধি

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শত শত মানুষ নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা এবং হাইজিন সংকটে ভুগছে। ফলে তারা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
জানা গেছে, উপজেলার খলিষখালী ইউনিয়নের ৩২ গ্রামের ৬২০০ পরিবার, জালালপুরের ১৩টি গ্রামের ৫৪০০ পরিবার এবং নগরঘাটা ইউনিয়নের ২১টি গ্রামের ৪২০০ পরিবার মিলে মোট ৩ ইউনিয়নের ৬৬ গ্রামের ১৫ হাজার ৮০০ পরিবার এখনো নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা এবং হাইজিন সমস্যায় আক্রান্ত। অনেকেই পুষ্টিহীনতা, ডায়রিয়া, আমাশয়, গ্যাস্ট্রিক, আলসার, চুলকানি, পাচড়া, উচ্চ রক্তচাপ, হাপানীসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

সমস্যা সমাধানে নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে এলাকাবাসীকে সচেতন করার জন্য সরকারের পাশাপাশি কাজ করছে বে-সরকারী সংস্থা উত্তরণ। উত্তরণের নিউ এরিয়া ওয়াশ এসডিজি ওয়াই এসপি বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় তিন ইউনিয়নের ৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ক্যাম্পেইন, শিক্ষকদের ও ম্যানেজিং কমিটির মিটিং এবং ওয়াশ তথা পানি, পায়খানা, হাতধোয়া ও পরিস্কার পরিচ্ছনানতার পাশাপাশি ছাত্রীদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ন্যাপকিন কর্ণার তৈরি করা হয়েছে।

এলাকায় অধিকাংশ মানুষ অগভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করেন। ৩টি ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ ব্যবহার করছেন আর্সেনিক ও আয়রনযুক্ত পানি। অধিকাংশ নলকূপের গোড়া পাকা নয়। পরিবারের সদস্যরা যে পায়খানা ব্যবহার করেন তা আদৌ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। পায়খানা ব্যবহারের পরে সাবান কিংবা ছাঁই দিয়ে হাত পরিস্কার করা তাদে কাছে বিলাসিতা। পরিস্কার পরিচ্ছতা সম্পর্কে এখনো অসচেতন।

উত্তরণের ওয়াশ এর পিও মোঃ সোহেল রানা জানান, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে তিনটি ইউনিয়নে ২০২১ সালের জানুয়ারী মাস থেকে কাজ করছি। খলিষখালী ইউনিয়নের ৩২ গ্রামের ৬২০০ পরিবার, জালালপুরের ১৩টি গ্রামের ৫৪০০ পরিবার, নগরঘাটা ইউনিয়নের ২১টি গ্রামের ৪২০০ পরিবার এবং ৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তাদের কার্যক্রম চলমান। ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত উক্ত কার্যক্রম চলবে।
জালালপুর ইউনিয়নের কানাইদিয়া গ্রামের অর্চনা দেবনাথ, আটুলিয়ার শাপলা খাতুন, খলিষখালী ইউনিয়নের বয়ারডাঙ্গা গ্রামের তাসলিমা বেগম, ফাহিমা বেগম, বাগডাঙ্গা গ্রামের খুকুমনি মন্ডল, নগরঘাটার বাখখালীর শিউলি মুন্ডা, ভৈরবনগরের অরুনা মন্ডল সহ অনেকেই বিশুদ্ধ খাবার পানি, স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ও হাইজিন সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন, তাদের এলাকায় বৃষ্টির সময় ৫/৬ মাস জলাবদ্ধতা থাকে এবং লবণাক্ত থাকায় খাবার পানির কোন ব্যবস্থা নেই। প্রায় ২/৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে খাবার পানি আনতে হয়। বর্ষা মৌসুমে ভিটেবাড়িতে পানি জমে থাকায় ল্যাট্রিন করার মতো জায়গাও থাকেনা। আর লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, চুলকানী, পাচড়া, পেটের পীড়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন তারা। এছাড়া আর্সেনিকের কারণে অনেকের মৃত্যু হয়েছে।

এ ব্যাপারে জালালপুর ইউপি চেয়ারম্যান এম মফিদুল হক লিটু জানান, এলাকায় খাবার পানি ও স্বাস্থ্য সম্মত ল্যাট্রিনের পাশাপাশি আর্সেনিকের সমস্যা প্রকট। ভয়াবহ আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে এলাকার কৃষ্ণকাটী গ্রামের একই পরিবারের ৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
জেঠুয়া জাগরনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ হাফিজুল ইসলাম বলেন, উত্তরণের ওয়াশ প্রকল্প থেকে বিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রী, শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সাথে পানি, পায়খানা, হাতধোয়া ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সভা করে থাকে। এছাড়া ছাত্রীদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় তাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে ন্যাপকিন কর্ণার।

এলাকাবাসী বলেন, বর্ষা মৌসমে জলাবদ্ধতা এবং শত শত মাছের ঘেরের কারণে পানি সঠিকপথে নিষ্কাশন হতে পারে না। এ সময় তাদের সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে। উত্তরণের পাসাপাসি এলাকা বিভিন্ন সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

তালা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মফিজুর রহমান জানান, উপজেলার কয়েকটি এলাকায় লেয়ার না পাওয়ায় ডিপটিউবওয়েল বসানো সম্ভব না। বিশেষ করে জালালপুর ও খলিষখালী ইউনিয়নে এই সমস্য বেশি। কিন্তু ২০০ ফুটের মধ্যে কিছু টিউবওয়েল বসলেও তাতে প্রায় ৯৫ ভাগ আর্সেনিক ও আয়রণের সমস্যা থাকে। তবে নগরঘাটা এলাকার অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভাল। তিনি আরও বলেন, নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা আগের চেয়ে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে।