সর্প-দংশন : যা করবেন, যা করবেন না

0
18

স্বাস্থ্য ডেস্ক

প্রতিবছর সর্প-দংশনে বিশ্বে লাখো মানুষের অকাল মৃত্যু হয়ে থাকে। বাংলাদেশে এ মৃত্যু বছরে প্রায় ছয় হাজার। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, বন-জঙ্গল কমে যাওয়া, বন্যা-জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষি ও মৎস্য চাষে নতুন ক্ষেত্র তৈরির কারণে সর্প-দংশন ক্রমে বাড়ছেই। চিকিৎসা নিয়ে রয়েছে নানা ভ্রান্ত ধারণা। তাই বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা সম্পর্কে জানা ও সবার এ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।

বিষক্রিয়া : গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ সাপই বিষহীন। নির্বিষ সাপের কামড়ে কিছু হয় না। বিষাক্ত সাপের কামড়ও অনেক সময় বিষহীন হতে পারে। ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে, এমনকি গোখরা সাপের কামড় বিষহীন হতে পারে। চন্দ্রবোড়া সাপের ক্ষেত্রে এটি হতে পারে ৫০ শতাংশ। কামড় দেওয়ার সময় বিষথলি থেকে বিষ নাও আসতে পারে। এর নাম ড্রাই বাইট (শুকনো দংশন)। তবে সর্প-দংশনের পর দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। সাপের বিষক্রিয়ার অনেকগুলো উপসর্গ রয়েছে। বিষ শরীরে প্রবেশ করলে উপসর্গ দেখা দেবে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা করতে হবে।

দংশিত স্থানের উপসর্গ : তীব্র ব্যথা, জ্বালা-যন্ত্রণার পাশাপাশি আক্রান্ত অঙ্গ ফুলে যেতে পারে। বমি ভাব, বমি, পেটে ব্যথা, এমনকি বিষক্রিয়ায় ডায়রিয়া হতে পারে। কখনো দ্রুত ফোস্কা পড়ে। ফুলে যাওয়ায় রক্ত চলাচল আটকে অঙ্গে পচন শুরু হতে পারে। এমন হলে জীবনরক্ষার্থে পা কেটে ফেলতে হয়। এ ছাড়া কখনো রক্ত তরল হয়ে যাওয়ায় কাটা জায়গা থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

স্নায়ু বৈকল্য : সর্প দংশনে মাংসপেশি হয়ে পড়ে অসাড়। চোখের ওপরের পাতা শিথিল হয়ে চোখ বুজে আসে। দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসে। ঢোক গিলতে কষ্ট হয়। লালা ঝরতে থাকে। ঘাম নিঃসরণ বেড়ে যায়। শুরু হতে পারে মাথাব্যথা। মাথায় ঝিন ঝিন ভাব দেখা দেয়। খিঁচুনি হতে পারে। অজ্ঞান হতে পারে রোগী। শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তাকারী পেশি অসাড় হয়ে পড়লে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। রোগীর শ্বাসযন্ত্র বিকলও হতে পারে।

কিডনি ফেইলিউর : অনেক সাপের বিষক্রিয়ায় রক্তক্ষরণ শুরু হয়। ফলে কিডনি দিয়ে চলে আসে রক্ত। প্রস্রাব হয়ে পড়ে রক্ত মেশানো। জীবন রক্ষার্থে ডায়ালাইসিস প্রয়োজনও হতে পারে।

বিষে হৃদযন্ত্র বন্ধ : সর্প-দংশনের ফলে হৃৎপি-ে গোলযোগ দেখা দিতে পারে। হদস্পন্দন হতে পারে এলোমেলো। স্পন্দন একেবারে কমে বা বেড়ে যেতে পারে। এমনকি রক্তচাপও বাড়তে বা কমতে পারে। রোগী শকে চলে যেতে পারে। হঠাৎ হৃদযন্ত্র বন্ধ হতেও পারে।

করণীয় : সাপের কামড়ের পর রোগীকে দ্রুত উদ্ধার করতে হবে। রোগীকে অভয় দিতে হবে। আতঙ্কিত করা যাবে না। কারণ আতঙ্ক ও মানসিক অস্থিরতার কারণে নির্বিষ সাপের দংশনেও জটিলতা দেখা দেখা দিতে পারে। দংশিত স্থান সাবান পানি দিয়ে আলতো করে ধুয়ে পরিষ্কার কাপড় জড়িয়ে ব্যান্ডেজ করতে হবে। দংশিত অঙ্গের আংটি, চুড়ি, আঙ্কলেট খুলে ফেলতে হবে।

হাত-পা ভেঙে গেলে যেভাবে অঙ্গ স্থির রাখতে হয়, সেভাবে করে রোগী স্থানান্তর করতে হবে। প্রেসার ব্যান্ডেজ দিয়ে রোগী স্থানান্তর করতে হবে। হাসপাতালে নেওয়ার সময় রোগীকে এক কাত করে শুইয়ে রাখতে হবে। সাপ মেরে ফেললে যদি সম্ভব হয়, মৃত সাপ হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে। সম্ভব হলে ছবি কিংবা ভিডিও আপলোড করে আনতে পারলে চিকিৎসকের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া সুবিধা হয়।

বর্জনীয় : দংশিত অঙ্গ নড়াচড়া করানো যাবে না। পায়ে কামড় দিলে রোগীকে হাঁটানো যাবে না। হাতে কামড় দিলে হাত নাড়ানো যাবে না। কোনো অবস্থায় রশি দিয়ে গিট্টু দেওয়া যাবে না। তাতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে আক্রান্ত অঙ্গে দেখা দিতে পারে পচনরোগ। দংশিত স্থান কাটাছেঁড়া যাবে না। তাবিজ-কবজ-তাগাসহ অন্য কোনো কিছু সেঁটে রাখা যাবে না। ওঝার পেছনে ছুটে সময় নষ্ট করা যাবে না। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শতকরা ৪২ জন রোগী ওঝার পেছনে অযথা সময় ব্যয় করে হাসপাতালে পৌঁছতে দেরি করায় জটিলতা বেড়ে গেছে। রোগীর ঢোক গিলতে কিংবা কথা বলতে কষ্ট হলে, বমি হলে অথবা অতিরিক্ত লালা ঝরতে থাকলে রোগীর মুখে কোনো কিছু ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে না। কোনো হারবাল ওষুধ, পাথর, বিচি, থুতু, গোবর, মাটি বা পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট জাতীয় ওষুধ দেওয়া যাবে না। অ্যালকোহল, ব্যথানাশের জন্য এসপিরিন জাতীয় ওষুধ খাওয়ানো যাবে না।