ভবদহে মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার দাবি

0
66

অভয়নগর প্রতিনিধি

ভবদহ অঞ্চলকে মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার দাবি জানিয়েছে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি। এ দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১ টায় কমিটির নেতারা একযোগে যশোর সদর, অভয়নগর, মণিরামপুর কেশবপুর ও ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে। স্মারকলিপিতে তারা জলাবদ্ধ এলাকার পানি দ্রুত নিষ্কাশন ও স্থায়ী সমাধানে ছয় দফা দাবি জানিয়েছে।

দাবিগুলোর মধ্যে অবিলম্বে বিল কপালিয়ায় টি.আর.এম প্রকল্প গ্রহণ, জমি অধিগ্রহন করে আমডাঙ্গা খাল প্রশস্থ ও গভীর ও খালের স্লুইচগেটের পূর্বাংশে অবিলম্বে খালের দুই পাশে স্থায়ী টেকসই প্রাচীর নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, লুটপাটের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ৫০ কোটি টাকার সেচ প্রকল্প বাতিল, ভবদহ এলাকায় বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিল কপালিয়ায় টি.আর.এম করার সরকারি সিদ্ধান্ত বানচালকারীদের বিচার, সমগ্র কাজ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কার্যকর এবং আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোকে কাজ মনিটরিংয়ে সম্পৃক্ত করার দাবি রয়েছে।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয় জনপদের ২০০ গ্রামের প্রত্যক্ষ ও অ-প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ একটি কুচক্রী সিন্ডিকেট কর্তৃক লুটপাটের লালসার শিকার হয়ে পানি তলে তলিয়ে যেতে বসেছে। উদ্ভব হয়েছে মহাবিপর্যয়কর পরিস্থিতি।

ভবদহ স্লুইচ গেটকে ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ উল্লেখ করে বলা হয় এই স্লুইচ গেটের কোন কার্যকারিতা নেই। স্লুইচ গেটই স্থায়ী জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। পানি উন্নয়ন বোর্ড, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, ঠিকাদার, রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত ও ঘেরমালিকরা স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর যোগসাজশে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে প্রতি বছর জনগণকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা লুটের স্থায়ী ব্যবস্থা করে নিয়েছে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাতের কয়েকঘন্টার বৃষ্টিতে যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার ১২০টি গ্রাম আংশিক ও সম্পূর্ণ তলিয়ে মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মানুষের বাড়িঘরে এখনও পানি। তলিয়ে গেছে শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এলাকার মসজিদ, মন্দির, কবরস্থানে পানি। মানুষের কাজ নেই। জলাবদ্ধ এলাকায় দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়।

বলা হয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন ‘নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে’। কিন্তু এই চক্র এতই ক্ষমতাবান যে সে ঘোষণাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর ধৃষ্টতা দেখিয়ে ভবদহ স্লুইচ গেট থেকে মোহনা পর্যন্ত ৫০/৬০ কিলোমিটার নদী ভরাট করে ফেলেছে। পানি বেরোবার পথ রুদ্ধ। এই পরিনতির কথা বারবার বলা সত্বেও পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় তাতে কর্ণপাত না করে গণ-দুশমনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, ১৯৯৮ সালে ভরত-ভায়না বিলে টি.আর.এম চলাকালীন আপনার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রীর উপস্থিতিতে সরকার আয়োজিত এক কনভেনশনে বিশেষজ্ঞ, ভুক্তভোগী জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে নীতিগতভাবে পর্যায়ক্রমের বিলগুলোতে টি.আর.এম প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০২ সালে বিলকেদারিয়ায় এবং পরবর্তী বিল হিসাবে ২০০৬ সালে বিল খুকশিয়ায় টি.আর.এম এর সফলতায় স্রোতের ভরবেগ বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্রুত নদীগর্ভের পলি কেটে কাট পয়েন্ট থেকে নদী ২৫/৩০ ফুট গভীর ও মোহনা সচল হয়েছিল। পরবর্তী নির্ধারিত বিল কপালিয়ায় টি.আর.এম কার্যকর করতে গেলে প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র আক্রমণে ২০১২ সালে তৎকালীন হুইপ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা আহত হন এবং সরকারি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সরকার সে সকল সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে টি.আর.এম প্রকল্প বাতিল করে। ২০১৬ সালে এলাকায় আবার দেখা দেয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা।

পুনরায় ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে ২০১৭ সালের ১৬ই মার্চ যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রীসহ উর্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একটি জাতীয় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। ও.ড.গ কর্তৃক ব্যাপক জরিপ ও জনমত যাচাই করে প্রস্তাবিত বিল কপালিয়া ও পর্যায়ক্রমে বিলে বিলে টি.আর.এম প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সে প্রকল্প ঐ চক্রের প্রভাবেই বাস্তবায়নে তালবাহানা শুরু হয়।২০১৭ সালের ১০ই ডিসেম্বর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রী ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে পুণঃপর্যালোচনার পর পানি সম্পদ মন্ত্রী টি.আর.এম প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। কিন্তু কোনো এক রহস্যজনক কারণে তা ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের রোষালনে পড়ে।সে ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচিত হয় ২০১৮ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর। আকর্ষিকভাবে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ঐ প্রকল্প বাতিল করে নতুন প্রকল্প প্রণয়নের নির্দেশ দেন। এরপর হঠাৎ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ভবদহ গেটে এসে টি.আর.এম হবে না বলে ঘোষনা দেন। এবং এই বিলগুলোকে জলাভূমি হিসাবে ঘোষণা দেন। উপস্থিত জনগণের মধ্যে আপত্তি উঠলে তিনি তাদের সাথে অশোভন আচরণ করেন।

২০২০ সালে আবার এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিলে ১৯শে ডিসেম্বর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আহ্বানে স্থানীয় আন্দোলনকারী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় ঐক্যমত হয় যে, টি.আর.এম ছাড়া বিকল্প নেই। সিদ্ধান্ত হয় ১) জনমত যাচাই বহির্ভূত ৮০৮ কোটি টাকার অবাস্তব প্রকল্প প্রকল্প বাতিল করে বিল কপালিয়ায় টি.আর.এম করার জন্য এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। ২) আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের জন্য ৪৯ কোটি টাকার প্রকল্প প্রণয়ণ করে দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে। ৩) এছাড়া আপদকালীন সময়ে পাম্প করে পানি বের করার প্রস্তাব পাশ করা হয়। সভায় ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ পাম্প-প্রকল্পের ব্যাপারে আপত্তি দিয়ে বলেন এ টাকাটা সম্পূর্ণ অপচয় হবে। ঘটেছেও তাই। পানি সেচে কোন ফল হয়নি। কোটি কোটি টাকা অপচয় হয়েছে। উপরন্তু নদী ভরাট হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, সেচের মাধ্যমে ব্যাপক ফসল হয়েছে। এ তথ্যটি ভিত্তিহীন। বিশেষ সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। প্রকৃত সত্য হলো, ২০ হাজার হেক্টরের উপরে জমি পানির তলে। কোন ফলস হয়নি। মিথ্যা তথ্য প্রদান করে সরকারকে বিভ্রান্তকারী কর্মকর্তাদের আইন আমলে আনা উচিত বলে আমরা মনে করি।

ইতিমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী বাঁচানোর বিপরীতে রাষ্ট্রের টাকা লুটপাটের জন্য ৫০ কোটি টাকার সেচ প্রকল্পের জন্য টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর পানি উন্নয়ন বোর্ড পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্ধতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে যশোর ডিসি কার্যালয়ে এলাকার ভুক্তভোগী জনগণ, ইউনিয়নগুলোর চেয়ারম্যান, রাজনীতিক ও আন্দোলনকারী প্রতিনিধিদের সামনে ৫০ কোটি টাকার সেচ প্রকল্পের অনুমোদন চাইলে সেখানে উপস্থিত দেড়শতাধিক মানুষ এর তীব্র বিরোধিতা করে টিআরএম প্রকল্প চালু ও আমডাঙা খাল সংস্কারের দাবি জানায়। এরপরও পানি উন্নয়ন বোর্ড থেমে নেই। তারা ওই সেচ প্রকল্প চালুর জন্য নানারকম তালবাহানা করছে। এলাকায় সেচের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন ও সমাধানের চেষ্টা অলিক কল্পনা মাত্র।

২০০৬ ও ২০০৭ সালে আন্দোলনকারী জনগণ স্বেচ্ছাশ্রমে আমডাঙ্গা খাল খনন করেছিলেন। তখন খালটি পরিপূর্ণ সংস্কারের দাবি করা হয়। ভৈরব নদের সাথে সংযোগ খালের প্রশস্ততা বৃদ্ধি, অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণ এবং সংযোগ স্থলে অবস্থিত বসতবাড়ির নিরাপত্তার জন্য মজবুত কাঠামো নির্মাণের দাবি করা হয়। সে দাবি মেনে নেওয়া হলেও তা কার্যকরী করা হয়নি। এখন বাড়িগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঐ সকল বাড়ির মালিকেরা সম্মিলিতভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে।

গতকাল অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে স্মারকলিপি দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন- আহবায়ক রনজিত বাওয়ালী, সদস্য সচিব চৈতন্য কুমার পাল, সদস্য অধ্যাপক অনিল বিশ্বাস, শিবপদ বিশ্বাস, জাকির হোসেন, সাধন বিশ্বাস, অমিতাভ মল্লিক, নীলকন্ঠ মন্ডল, উত্তম কুমার মন্ডল, ডাঃ শহিদুল হক, ইন্তাজ আলী, ইলিয়াস হোসেন, ডাঃ অরুন ঘটক, তারক বিশ্বাস প্রমুখ।