ফিরে দেখা : ফুলবাড়ী আন্দোলনের শক্তি ও নিশানা

0
23

আনু মুহাম্মদ

ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থান হয়েছে ১৫ বছর হলো। এরও এক বছর আগে থেকে একটি ভয়ংকর দেশবিনাশী প্রকল্পের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক এ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট লাখো মানুষ নেমে এসেছিল রাস্তায়। সেই জাগরণে ভীত-সন্ত্রস্ত সরকারি সশস্ত্র বাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছিল। শহীদ হন আমিন, সালেকিন, তরিকুল। গুরুতর জখম হন বাবলু রায়, প্রদীপ রায়, শ্রীমন বাস্কে। আরও আহত হয়েছিলেন দুই শতাধিক মানুষ। তারপরও মানুষ থামেনি। তৈরি হয়েছিল গণঅভ্যুত্থান। এক পর্যায়ে সরকার জনগণের সব দাবি মেনে চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু কোম্পানি-সরকারের চক্রান্ত এখনও বন্ধ হয়নি। তবে শহীদ ও যুদ্ধাহতদের রক্তে মাটি এখনও লাল; প্রতিরোধ এখনও জীবন্ত। ফুলবাড়ী আন্দোলনের দুটো দিক বিশেষভাবে লক্ষ্য করা দরকার- ১. এর মূল দাবি বা বিষয় যাকে কেন্দ্র করে জনগণের এই বিশাল উত্থান হয়েছিল এবং ২. এ আন্দোলন সংগঠনের ধরন।

ফুলবাড়ী আন্দোলনের বিষয়বস্তু আমরা জানি। ফুলবাড়ীসহ ছয় থানাজুড়ে একটি উন্মুক্ত খনি প্রকল্প নিয়ে হাজির হয়েছিল একটি নবগঠিত ভুঁইফোঁড় জালিয়াত বিদেশি কোম্পানি। পুরো প্রক্রিয়া আইনগত দিক থেকে বৈধ ছিল না। ছিল আপাদমস্তক অস্বচ্ছ এবং এটি অগ্রসর হতে যাচ্ছিল প্রতারণা ও জোর-জবরদস্তির ওপর ভর করে। এলাকার মানুষের কাছে এ প্রকল্প হাজির করা হয়েছিল উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে। ব্যয়বহুল প্রচারণায় দামি কাগজে ছবি-নকশা দিয়ে মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছিল যে, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এলাকার মানুষের আয়, উৎপাদন, শিক্ষা, চিকিৎসা, ঘরবাড়ি- সবকিছুর দারুণ উন্নতি হবে। এসব প্রচার যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও মানুষ তা গ্রহণ করেনি। কেন গ্রহণ করেনি, তার কারণ বহুবিধ-

প্রথমত, উন্মুক্ত খনি হলে কী ধরনের বিপদ হতে পারে তার কিছু বিষয় এলাকার নেতৃস্থানীয় মানুষ বুঝতে পেরেছিলেন। দ্বিতীয়ত, কোম্পানির লোকজনের প্রতারণামূলক তৎপরতা মানুষের সামনে ধরা পড়ে গিয়েছিল। তৃতীয়ত, এলাকার মানুষের কয়লা প্রকল্প নিয়ে আগে থেকেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কারণে। এ প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে এলাকাবাসীর অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না। তা ছাড়া পানি, জমি, ফসলের ওপর এ প্রকল্পের বিরূপ প্রভাবও তাদের নজরে এসেছিল। চতুর্থত, জাতীয় কমিটি এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর কয়লা প্রকল্পের বিপদ, সম্ভাব্য ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এলাকার মানুষের পরিচয় হতে থাকে। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা এ প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে থাকেন। জাতীয় পর্যায়ে গবেষণা, লেখালেখি, বিতর্ক, আলোচনার মধ্য দিয়ে শুধু এ অঞ্চল নয়; পুরো দেশ ও জনগণের জন্য ভয়ংকর এ প্রকল্প সম্পর্কে দেশজুড়ে মনোযোগ ও সচেতনতা তৈরি হয়। আন্দোলনের নৈতিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়। জাতীয় কমিটির মাধ্যমে এলাকার ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়াও জাতীয় সম্পদে জনগণের মালিকানা, চুক্তির অসংগতি, কোম্পানির জালিয়াতি ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়েও মানুষের ধারণা স্পষ্ট হয়। জাতীয় কমিটি প্রকাশিত ‘ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প; কার লাভ কার ক্ষতি’ একটি হ্যান্ডবুক হিসেবে বিভিন্ন বয়সের মানুষকে পুরো বিষয়টি সম্পর্কে সক্রিয় হতে সাহায্য করে।

এ সবকিছু মিলিয়ে ফুলবাড়ীসহ ছয় থানার মানুষের পাশাপাশি জাতীয় এ আন্দোলনের দাবিনামায় দুটো বিষয় প্রধান হয়ে ওঠে। ১. উন্নয়নের নামে একটি বিদেশি কোম্পানির প্রকল্পের কারণে দেশের মাটি, মাটির ওপর ও নিচের পানি, তিন ফসলি জমি, বসতভিটাসহ জীবন-জীবিকার ধ্বংসযজ্ঞ এবং লাখ লাখ মানুষের উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে কয়লা সম্পদ পাচার এবং ২. সর্বজনের সম্পদে সর্বজনের মালিকানার প্রশ্ন। ফুলবাড়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ, খনিজ সম্পদের ব্যবহার, জনগণের মালিকানা এবং উন্নয়ন দর্শন জন-মনোযোগে আলোচনায় গুরুত্ব পেতে থাকে। আগে এসব বিষয় রাজনীতি বা উন্নয়ন চিন্তায় এ রকম গুরুত্ব পায়নি।

আন্দোলন শুরু হয়েছিল সব দলের অংশগ্রহণে গঠিত ‘ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটি’র নেতৃত্বে। এ কমিটিতে সব বড় শাসক দলের স্থানীয় নেতা ছিলেন। ছিলেন বিভিন্ন বাম দলের স্থানীয় নেতা; সেই সঙ্গে দলবহির্ভূত এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নেতারা। কিন্তু এ কাঠামো অব্যাহত থাকতে পারেনি। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত- এ চারটি দল কখনও না কখনও বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। বিভিন্ন সময়ে জনস্বার্থবিরোধী নানা চুক্তি করায় এদের সবারই দায়িত্ব আছে। ঠিক যে সময়ের কথা বলছি, তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট; সঙ্গে জাতীয় পার্টির একাংশ। সে সময় এলাকার সংসদ সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের; যার সঙ্গে কোম্পানির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায় ছিল না, কিন্তু উন্নয়ন দর্শনে তাদের অবস্থানে কোনো ভিন্নতা ছিল না।

ফুলবাড়ী কয়লা খনি প্রকল্পের মূল ছিল বিদেশি কোম্পানি। এর পক্ষে দেশি ব্যবসায়ী, কনসালট্যান্ট, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অর্থ সংস্থানকারী প্রতিষ্ঠান ছিল সক্রিয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিল। এ প্রকল্পে স্থানীয় সম্ভাব্য সুবিধাবাদীদের তালিকায় শাসক শ্রেণির এসব দলের লোকজনই ছিল। এটা শ্রেণিগত স্বার্থের বিষয়। সুতরাং এলাকার মানুষের আগ্রহে এসব দলের নেতা ‘ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটি’র আন্দোলন গড়ে তুললেও খুব শিগগির তারা উপলব্ধি করেন, এটি তাদের স্থান নয়। তা ছাড়া এসব দলের কেন্দ্রীয় নেতার পাশাপাশি এই জালিয়াত কোম্পানির কর্তারা নিশ্চয় তাদের এ উপলব্ধি লাভে সহায়তা করেছিলেন। তাই তাদের জন্য খুবই যৌক্তিক কারণে এসব নেতা এক পর্যায়ে থেমে যান। কিন্তু মানুষ কীভাবে থামবে, তার অস্তিত্বের প্রশ্ন যেখানে হুমকির মুখে। সে কারণে তখন জনমতের প্রবল চাপ এবং এলাকার বাম সংগঠনের নেতাদের উদ্যোগে ‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’র ফুলবাড়ী শাখা গঠিত হয়। উল্লেখ্য, জাতীয় কমিটির নামে খনিজ সম্পদ যুক্ত হয় ফুলবাড়ী ইস্যুকে কেন্দ্র করেই। এই শাখা কমিটিতে যুক্ত হয় এলাকায় সক্রিয় সব বাম সংগঠন। সেই সঙ্গে থাকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার যেমন ব্যবসায়ী, রিকশা-ভ্যানচালক, ইমারত নির্মাণ শ্রমিক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কুলি শ্রমিক ইউনিয়ন ও আদিবাসীদের প্রতিনিধিরা। অর্থাৎ ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটির অন্তর্ভুক্ত ওই চার দলের নেতারা বাদে বাকি সবাই জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখায় যোগ দেন।

আন্দোলনের কর্মসূচি-লক্ষ্য স্পষ্ট ও গতিশীল হওয়া এবং আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা সৃষ্টির কারণে অন্য কোনো বিপরীত ধারা এখানে ভাঙন ধরাতে পারেনি। ‘উন্নয়ন’-এর মিথ্যাচারে মানুষ কাবু হয়নি। সর্বব্যাপী ঐক্য ক্রমেই সংহত হচ্ছিল। জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ বয়স নির্বিশেষে ঐক্য ও সংহতি তৈরি হয়েছিল। অপচেষ্টা কম হয়নি। জাতিগত ধর্মীয় বিভেদ তৈরির চেষ্টা হয়েছে; জঙ্গি আক্রমণের গুজব ছড়ানো হয়েছে; এনজিও ঘরানা সামনে আনার চেষ্টা হয়েছে; গোয়েন্দা সংস্থার অবিরাম চাপ ও বিভিন্ন দিক থেকে হুমকি জারি রাখা হয়েছে; কোম্পানি থেকে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিকে ঘুষ সাধা হয়েছে; সন্ত্রাসী ব্যবহার করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সবকিছু অতিক্রম করে ক্রমে গ্রাম থেকে সারাদেশ- বিশাল ঐক্য ও সংহতির ভিত্তিতে আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে।

সারাবিশ্বে এখন ‘নব্য উদারতাবাদী’ নামে পরিচিত চরম আগ্রাসী পুঁজিবাদী উন্নয়ন দর্শনের ব্যাপক দাপট। বিভিন্ন দেশের মানুষ এর বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলতে চেষ্টা করছে। কিন্তু মতাদর্শিক আধিপত্যসহ বিভিন্ন কারণে তার সাফল্য এখনও খুব সীমিত। ফুলবাড়ীতে একটি বিদেশি কোম্পানির প্রকল্প, যা দেশি শাসক শ্রেণি ও সব আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্বারা সমর্থিত, তাকে জনপ্রতিরোধের মাধ্যমে থামিয়ে দেওয়া এবং সেই প্রতিরোধ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত রাখতে পারার উদাহরণ বিশ্বে খুব বেশি পাওয়া যাবে না।

এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জাতীয় কমিটি এর পর সুন্দরবন আন্দোলন গড়ে তোলে। এরও কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল ‘উন্নয়ন’ নামের প্রতিবেশ ও প্রাণবিনাশী প্রকল্প প্রতিরোধ। ২০১১ থেকে শুরু এ আন্দোলনে স্থানীয় জনভিত্তির সুযোগ ছিল কম। কেননা, সুন্দরবন অঞ্চলে এমনিতেই জনবসতি কম। কিন্তু এ আন্দোলন বিস্তৃত হয়েছিল দেশজুড়ে, এমনকি আন্তর্জাতিকভাবেও। প্রায় ১০ বছর স্থায়ী ও দেশজুড়ে বিস্তৃত এ আন্দোলন ব্যাপক জনমত তৈরি করলেও তা এই সুন্দরবনবিনাশী রামপাল প্রকল্প এখনও থামাতে পারেনি। এর প্রধান কারণ, দেশের প্রাণ-প্রকৃতি ও সর্বজনের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত করে লুম্পেন পুঁজিপতিদের দ্রুত বিকাশ এবং ভারত-চীন-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে খুশি করাই এখন সব কাজের কেন্দ্রীয় বিষয়। দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকলে প্রবল জনমতের চাপে রামপাল প্রকল্প অনেক আগেই বাতিল হতো। বাতিল হয়নি, কিন্তু এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক চিন্তা, উন্নয়ন চিন্তায় নতুন এ উপাদান শক্তিশালী ভিত পেয়েছে যে, প্রাণ-প্রকৃতিবিনাশী প্রকল্প কখনও উন্নয়ন প্রকল্প হতে পারে না।

এসব আন্দোলনের শক্তির ওপর দাঁড়িয়েই জাতীয় কমিটি বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনার পাল্টা মহাপরিকল্পনা হাজির করেছে ২০১৭ সালে। বর্তমান উন্নয়ন দর্শনের আগ্রাসী এবং একচ্ছত্র আধিপত্য রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে গেলে পাল্টা ছবি নিজেদের কাছে পরিস্কার থাকা এবং তা ব্যাপকভাবে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়া দরকার। এই বিকল্প মহাপরিকল্পনায় সে চেষ্টাই করা হয়েছে। যথারীতি সরকার কম খরচে, পরিবেশবান্ধব নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের এ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ না করে বেশি ব্যয়বহুল, প্রাণবিনাশী, জাতীয় স্বার্থবিরোধী পথেই চলছে।

যাই হোক, বিদ্যমান আধিপত্য চিন্তার আচ্ছন্নতা থেকে নিজেদের মুক্ত করা, সমাজের বিভিন্ন স্তরে তা নিয়ে চিন্তার লড়াই অব্যাহত রাখা একটি অবিরাম বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক সর্বোপরি রাজনৈতিক কাজ। একটি উন্নয়ন প্রকল্প থামিয়ে দেওয়া কিংবা কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রবল জনমত তৈরি করাই এ কাজের জন্য যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে এ সাফল্যের শক্তিকে উপেক্ষা করে নতুন চৈতন্যের পাল্টা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়াও সম্ভব নয়। বিদ্যমান উন্নয়ন দর্শন প্রত্যাখ্যান ও তার মৌলিক পরিবর্তনের চিন্তার স্বচ্ছ বিকাশ ছাড়া জনপন্থি রাজনীতিও বিকশিত হতে পারবে না। তাই মানুষের মুক্তির লড়াই বিদ্যমান উন্নয়ন দর্শনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সমার্থক।

অর্থনীতিবিদ; অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here