শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পোষাতে দূরদর্শী পরিকল্পনা চাই

0
37

কায়সুল খান

কভিড-১৯ বর্তমান সময়ের একটি বড় সংকট। বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি রাষ্ট্র বাদে মোটামুটি সারাবিশ্বেই এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা করেছে ব্যাহত। তবে মানুষের জীবনহানির পর কভিড-১৯-এর প্রভাবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করায়। গত বছর মার্চ-এপ্রিল থেকে সারাবিশ্বের অধিকাংশ দেশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষিত হয়। তবে উন্নত দেশগুলো সুপরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া শুরু করে। পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হওয়ায় ইউরোপ, আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বের শিক্ষার্থীরা প্রায় স্বাভাবিক শিক্ষা জীবনে ফিরে যেতে পেরেছে। কিন্তু মুশকিল হয়েছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে ৫২০ দিনের অধিক সময় কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন-ক্যাম্পাস কাস গ্রহণ বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশের কয়েক কোটি শিক্ষার্থী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ থেকে যেমন বঞ্চিত, তেমনি শারীরিক-মানসিক বিকাশ সাধনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

একটি আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রে শিক্ষাকে মেগা প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তারা বিজ্ঞানভিত্তিক অনুপাতে শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বিনিয়োগ করে। অন্যদিকে বাংলাদেশে বর্তমানে শিক্ষা সবচেয়ে অবহেলিত খাতগুলোর মাঝে একটি। বাংলাদেশে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি, যা আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। কভিড-১৯-এর বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম, মেগা উন্নয়ন প্রকল্প, শিল্প, বাণিজ্য, বিনোদন, ভ্রমণ, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ সব ধরনের কার্যক্রম সীমিত আকারে এতদিন চললেও এখন চলছে পুরোদমে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।

কিন্তু মনে রাখা উচিত, শিক্ষাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা না করলে কোনো জাতির পক্ষে চূড়ান্ত উন্নতি সাধন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের প্রাচীনপন্থি শিক্ষাব্যবস্থা এমনিতেই দক্ষ মানবসম্পদ উৎপাদনে ব্যর্থতা প্রদর্শন করছিল। বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে মোট জিডিপির অতি স্বল্প অংশ বরাদ্দকরণ, গবেষণার প্রতি অনাগ্রহ, উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেতিবাচক রাজনীতি, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, শিক্ষা পরিকাঠামোর অপ্রতুলতা, অবৈজ্ঞানিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরি বিমুখতাসহ নানা সংকট আগে থেকেই ছিল। এর মাঝে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে হাজির হয় করোনাভাইরাস। কভিড-১৯-এর সময়ে আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মাঝে যে দক্ষতাশূন্যতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তা পূরণ করা কঠিন।

একদিকে সুপরিকল্পনার অভাব, পাশাপাশি অনেকের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও অসচেতনতার কারণে মহামারি নিয়ন্ত্রণের গৃহীত পদক্ষেপ কার্যকরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, অধিক জনসংখ্যার কারণে সমগ্র দেশবাসীকে দ্রুততর সময়ের মধ্যে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন কার্যক্রমের আওতায় আনাও বড় চ্যালেঞ্জ। জানতে পেরেছি, সরকার শিক্ষার্থীদের কভিড-১৯ টিকার আওতায় আনার পরই স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। সরকারের সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি মাসে এক কোটি কভিড-১৯ ভ্যাকসিন দেওয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে। মোটের ওপর আমাদের শিক্ষার্থীদের মাঝে অধিকাংশই কভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে সক্ষম হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে যদি আমরা সব শিক্ষার্থীকে ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে এসে তারপর স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরিকল্পনা করি সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে আরও প্রায় এক বছর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে। এমনটি যদি হয় তাহলে আরও ক্ষতি হবে।

বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও (বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়) কভিড-১৯-এর সময়ে সাহসী ও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেনি বরং তারা সরকারের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। যেমন- বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষার্থীদের ভ্যাকসিন কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসা কিংবা অনলাইন কাস শুরু করতে গবেষণার ভিত্তিতে যেসব পদক্ষেপ নিতে পেরেছে, সেসব ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় প্রতিষ্ঠান ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বরং কিছু ক্ষেত্রে আমাদের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজগুলো নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমকে চালু রেখেছে।

সরকারও যে সব সময় বাস্তবতার নিরিখে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে, তা নয়। বাংলাদেশে প্রাইমারি ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা কার্যক্রম একেবারে স্থবির হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা সংস্থার গবেষণায় প্রকাশ, প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিকের গ-ি না পেরোনো অসংখ্য মেয়ে শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুদের পুষ্টি কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি শিশুদের সামাজিকীরণের মতো জরুরি বিষয় ঘটছে না। ফলে শিশুদের পূর্ণ মানসিক বিকাশ সাধিত হচ্ছে না।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সংস্থা বারবার দ্রুততর সময়ের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ব্যাপারে তাগাদা দিচ্ছে। তারা নানাভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছে, শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম থেকে দূরে সরিয়ে রাখলে কোনো দেশের পক্ষেই একবিংশ শতাব্দীর কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের কভিড-১৯-এর সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই চলতে হবে। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে সংক্রমণের হার শূন্যে নামিয়ে নিয়ে আসার স্বপ্টম্ন দেখা বাস্তবতাবিবর্জিত। বাংলাদেশ আসন্ন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যে ট্রেনে উঠতে চাচ্ছে তার জন্য আমাদের প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। এমত অবস্থায় যে কোনো মূল্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

গত ১৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুততর সময়ের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা প্রহণের কথা বলেছেন। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক লক্ষণ। আমরা আশা করব, বাংলাদেশ একদিকে যেমন কভিড-১৯ মোকাবিলায় ভ্যাকসিন কার্যক্রম সল্ফপ্রসারণের সক্ষমতা অর্জন করবে, তেমনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে যে কোনো মূল্যে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও সাফল্য প্রদর্শন করবে।

প্রবাসী শিক্ষার্থী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here