বাংলাদেশে চার কোটির বেশি শিক্ষার্থী মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত

0
40

সত্যপাঠ ডেস্ক

মঙ্গলবার জাতিসংঘের শিশু তহবিলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, যত বেশি সময় শিশুরা স্কুলের বাইরে থাকবে, সহিংসতা, শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ের ঝুঁকির কারণে তত বেশি কমে যাবে তাদের স্কুলে ফেরার সম্ভাবনা।

স্কুলগুলো দ্রুত খুলে দিতে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তার জন্য বিস্তৃত পরিসরে পদক্ষেপ নিতে সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ।

করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় গত বছরের মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিতে সরকারের উপর চাপ বাড়ছে শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ নানা পর্যায় থেকে। তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের টিকার আওতায় আনা ও সংক্রমণ পরিস্থিতি ‘সন্তোষজনক অবস্থায়’ হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

কোভিড-১৯ এর কারণে যেসব দেশে দীর্ঘ সময় ধরে স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ। দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকলে পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতার উপর ‘অত্যন্ত গুরুতর প্রভাব ফেলে’ বলে সতর্ক করেছেন বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি টোমো হোযুমি।

ইউনিসেফের প্রতিবেদনে তিনি বলেন, ‘‘প্রান্তিক শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, যা তাদেরকে দারিদ্র্য এবং অসমতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেবে। নিরাপদে স্কুল খুলে দেওয়া এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিনিয়োগ করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সিদ্ধান্তটি এই শিশুদের পুরো জীবনকে প্রভাবিত করবে।”

সরাসরি পাঠদান বন্ধ থাকলেও সরকার অনলাইন ও টেলিভিশনে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে ইন্টারনেট ও ডিভাইস না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী এর বাইরে যা বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশ দূরশিক্ষণ পদ্ধতির জন্য পদক্ষেপ নিলেও প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের কমপক্ষে ২৯ শতাংশের কাছে এই শিক্ষা পৌঁছানো যাচ্ছে না, বলছে ইউনিসেফ।

শিক্ষার উপকরণের ঘাটতি, সর্বকনিষ্ঠ শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা, মানসম্পন্ন পরিবেশের অভাব এবং গৃহস্থালির কাজের চাপ বা কাজ করতে বাধ্য হওয়া এর কারণ হতে পারে বলে মনে করে ইউনিসেফ।

বিশ্বের সবচেয়ে অসহায় শিশুদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে রয়েছে জানিয়ে বলা হয়, এই শিক্ষা সঙ্কট যাতে শিক্ষা বিপর্যয়ের দিকে না যায় সেজন্য যত দ্রুত সম্ভব স্কুল খুলে দিতে প্রচারাভিযান চালানো হবে। এবং নিরাপদে স্কুল খোলার লক্ষে ইউনিসেফ বাংলাদেশ সরকারের সাথে কাজ করে যাচ্ছে।

প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা

দেশে করোনা ভাইরাস ধরা পড়ার পর ২০২০ সালের মার্চ মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুরো বছর জুড়ে স্কুল বন্ধ থাকায় অনুষ্ঠিত হয়নি ২০২০ সালের প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী সমাপনী পরীক্ষা। অটোপাস দিয়ে শিক্ষার্থীদের পরের শ্রেণিতে উঠার অনুমতি দেওয়া হয়। সে বছর দেশে ২৯ লাখের বেশি শিক্ষার্থী প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা ছিল।

শিশু এবং শিক্ষকদের মাস্ক পরা, সাবান পানিতে হাত ধুয়ে স্বাস্থবিধি মেনে নিরাপদে স্কুল শুরু করতে পারে সেজন্য একটি নিরেদেশিকা তৈরি করা হচ্ছে। ইউনিসেফ শিশু, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সাথেও যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে নিরাপদে স্কুল খুলে দেওয়ার বিষয়ে সবার মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।

মহামারির কারণে বিশ্বের প্রায় ১৪ কোটি শিশুর প্রথমবার স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পিছিয়ে যাচ্ছে। যাদের মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাংলাদেশের।

এই শিক্ষার্থীদের প্রায় ৮০ লাখ এমন স্থানে বাস করে, যেখানে মহামারির পুরো সময় স্কুল বন্ধ। স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিনটির জন্য তারা এক বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছে, যা বেড়েই চলেছে।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটো ফোর বলেন, “যখন বিশ্বের অনেক জায়গায় কাস পুনরায় শুরু হয়েছে, তখন প্রথম শ্রেণির লাখ লাখ শিশু এক বছরেরও বেশি সময় কাসরুমে যাওয়ার অপেক্ষায়। আরো লাখ লাখ শিশুর হয়তো এই মেয়াদেও স্কুলে যাওয়া হবে না। যারা সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে রয়েছে তাদের জীবনে আর কখনোই স্কুলে ফিরতে না পারার ঝুঁকি প্রবল বেগে বাড়ছে। ”

প্রথম শ্রেণির শিক্ষা যে ভবিষ্যতের সব ধরনের শিক্ষার ভিত্তি গড়ে দেওয়ার পাশাপাশি শিশুদের স্বাধীনস্বত্ত্বার বিকাশ, নতুন নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সম্পর্কে সহায়তা করে সেকথা প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে ইউনিসেফ।

মহামারিতে বিশ্বের ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য স্কুলগুলো প্রায় পুরো বছর বন্ধ থাকায় অনেক শিশুর ঝরে পড়ার উচ্চ ঝুঁকি, শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ের মতো পরিণাম ভোগ করতে হবে। বিশ্ব ব্যাংকের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সমাধানমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা না হলে এই পুরো প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ আয়ের ক্ষেত্রে যে পরিমাণ ক্ষতি হবে তা প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ।

বিশ্ব ব্যাংক ও ইউনেস্কোর সঙ্গে মিলে ইউনিসেফ স্কুলগুলো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য তিনটি অগ্রাধিকারের প্রতি মনোযোগ দিতে বলছে সরকারগুলোকে।

সেগুলো হচ্ছে, সকল শিশু এবং তরুণদের স্কুলে ফিরিয়ে আনতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি প্রণয়ন, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করতে কার্যকর প্রতিকারমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং শিক্ষার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ও শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য শিক্ষকদের সহায়তা দেওয়া।

হেনরিয়েটা ফোর বলেন, “মহামারিতে শিক্ষা কার্যক্রমের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে তা না হলে কিছু শিশু হয়তো কখনোই এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবে না। ”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here