‘সামাজিক বনায়নের’ নামে আর কত বনবিনাশ

0
34

পাভেল পার্থ

‘সামাজিক বনায়ন’ প্রত্যয়টি শুরু থেকেই দেশের প্রকৃতি ও সংস্কৃতির ইতিহাসে গলার কাঁটা হয়ে আছে। প্রত্যয়টি প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে বেমানান। ‘বনায়ন’ মানে বন সৃজন, যা কৃত্রিমভাবে অসম্ভব। কারণ, বন এক প্রাকৃতিক বিবর্তনের মাধ্যমে বিকশিত বাস্তুতন্ত্র। মানুষ কোনোভাবেই বন সৃজন করতে পারে না। মানুষ যা করে তাহলো ‘বাগান’ বা উদ্যান। যেমন- বলধা, প্রেমকানন, রমনা, সোহরাওয়ার্দী। যখন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নেওয়া হয় বিভিন্ন বাগান গড়ে তোলার জন্য তখন নিদারুণভাবে ‘বনায়ন’ শব্দটিও ব্যবহূত হয়। পাশাপাশি বনায়নের আগে ‘সামাজিক’ প্রত্যয়টির ব্যবহার এ কাজটিকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কারণ, বন একটি সামাজিক বাস্তুতন্ত্র। সব অরণ্য বাস্তুতন্ত্রে নানামুখী সমাজ আছে। সে বন্যপ্রাণের হোক, কি বনবাসী মানুষের হোক। অরণ্য তাই ঐতিহাসিকভাবেই এক অরণ্য-সমাজ ও সভ্যতাকে বিকশিত করে চলে।

এ রকম প্রশ্নবিদ্ধ এক প্রত্যয় নিয়েই ‘সামাজিক বনায়ন’ কর্মসূচি টিকে আছে বা জোর করে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। আসলে স্থানীয় গরিব মানুষের মাধ্যমে বন বিভাগের পরিত্যক্ত জায়গায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির নামই ‘সামাজিক বনায়ন’; বলা ভালো, জনগোষ্ঠীভিত্তিক বৃক্ষরোপণ ও বাগান সৃজন কর্মসূচি। অনেকেই এ ধরনের কর্মসূচি বা ব্যবস্থাপনার বাংলা করেছেন ‘সমাজভিত্তিক সংরক্ষণ’ বা ‘জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক উদ্যোগ’ এ রকম কিছু। এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাস্তবিক যেসব ঘটনা ঘটে তা বেশ নির্মম ও নিদারুণ। বন বিভাগের বৃক্ষরোপণ ও বাগান সৃজন কর্মসূচির অসাধারণ সব সাফল্য আছে। কিন্তু সামাজিক বনায়নের নামে দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বিনাশের যে তর্ক বিদ্যমান, তার সুরাহা হচ্ছে না। এ নিয়ে যথেষ্ট একাডেমিক, গণমাধ্যম এবং গবেষিত প্রামাণ্য দলিল আছে। প্রতিটি ‘সামাজিক বনায়ন’ প্রকল্পে স্থানীয় বৃক্ষ প্রজাতি নির্মূল ও বাস্তুতন্ত্র ওলটপালট করা হয়। সামাজিক বনায়ন বিধিমালা অমান্য করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বহিরাগতের দ্বন্দ্ব উস্কে দেওয়া হয়।

দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত জনগোষ্ঠী বিশেষ করে আদিবাসী সমাজ এ প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদ হয় বা তাদের জীবিকা সংকটের মুখে পড়ে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বন বিভাগ নানা মিথ্যা, হয়রানিমূলক বন মামলা করে এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে গরিব নাগরিকের এক দীর্ঘ মানসিক ও রাজনৈতিক দূরত্ব প্রতিষ্ঠা করে। যেসব এলাকায় সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয় সেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রাণবৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের চেয়ে প্রবল হয়ে ওঠে নানা দ্বন্দ্ব, দুর্নীতি ও বাস্তুতন্ত্র ক্ষয়ের বহুমুখী ঘটনা ঘটে। আবারও ‘সামাজিক বনায়ন’ প্রকল্পের নামে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার মুরইছড়া বনবিট এলাকায় প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র বিনাশের ঘটনা ঘটেছে। বন বিভাগ বহু প্রাচীন বৃক্ষ কেটে ফেলেছে। জায়গা পরিস্কার করেছে সামাজিক বনায়নে নতুন গাছের চারা লাগানোর জন্য। এটি করতে গিয়ে শুধু বৃক্ষ নয়; সব সময় সমূলে নিহত হয় তরু-গুল্ম-লতা, ছত্রাক, ফার্ন, পরাশ্রয়ী কি অণুজীব। আমরা শুধু বড় বৃক্ষের সংখ্যা গুনতে পারি, কিন্তু একটি প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র কোনোভাবেই বৃক্ষ প্রজাতির মাধ্যমে গড়ে ওঠে না। বৃক্ষ ছাড়া আর যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কোনো নথি কি দলিল তাদের হিসাব করে না।

কী ঘটেছে ডলুছড়ায় :মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার কর্মধা ইউনিয়নের ডলুছড়াপুঞ্জির পানজুমের হাজার হাজার গাছ কেটে সামাজিক বনায়নের এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বন বিভাগ। এই সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের ফলে স্থানীয় ডলুছড়াপুঞ্জির খাসি আদিবাসীরা উচ্ছেদ হবে। মুরইছড়া বনবিটের অধীন এ প্রকল্পে স্থানীয় টাট্টিউলী ও গণকিয়া গ্রামের অনেক ধনাঢ্য পরিবারের লোকজনও উপকারভোগী হিসেবে আছেন (সমকাল, ১৮ আগস্ট ২০২১), যা সামাজিক বনায়ন বিধিমালা পরিপন্থি। মুরইছড়া বনবিটের দাবি, ডলুছড়ায় সামাজিক বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অনুমোদন আছে। সামাজিক বনায়ন নামে বন বিভাগ যে জায়গায় গাছ কেটে এলাকার প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র বিনাশ করছে, তা মূলত ডলুছড়া নামে এক প্রাচীন পানপুঞ্জি। এখানে আদিবাসী খাসিদের সংরক্ষিত বহু প্রাচীন দেশীয় বৃক্ষ ও পানজুম আছে। ডলুছড়া পানপুঞ্জির জায়গা নিয়ে স্বত্ব মামলা চলমান। আদালত ২০১০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রায় ও একই বছরের ৫ অক্টোবর এই জায়গায় খাসি আদিবাসীদের স্বত্ব দখলদার হিসেবে ডিক্রি প্রদান করেন।

কিছু অমীমাংসিত হদিস :সামাজিক বনায়নের নিদারুণ দুঃখগাথা জমে আছে মধুপুর শালবনের গ্রামে গ্রামে। মধুপুরে প্রাকৃতিক শালবন কেটে আগ্রাসী একাশিয়া, ম্যাঞ্জিয়ামের সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি শুরু হয়। প্রায় ৭০০ বছরের প্রাচীন একটি গ্রামের নাম কামারচালা। ফাতারাম কোচ এ গ্রামের পত্তন করেন। ২০০১-০২ সালে অরণখোলা মৌজার ৩৪৪ একর জায়গায় নতুন প্রকল্প শুরু হয়। ২০০৩ সালের ১৬ এপ্রিল প্রাচীন কামারচালা গ্রামের কোচদের উচ্ছেদ নোটিশ পাঠায় বন বিভাগ। কারণ জায়গাটি বন বিভাগের অধীন এবং এখানে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি নেওয়া হয়। সামাজিক বনায়ন বিধিমালা ২০০০-এর ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভূমিহীন, ৫০ শতাংশের কম ভূমির মালিক, দুস্থ মহিলা ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নির্বাচন করার কথা। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্বাচিত হন বহিরাগত প্রভাবশালী ও ধনী বাঙালি পুরুষেরা। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি হুট করেই তৈরি হয়নি। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আগ্রাসী বৃক্ষের আমদানি, বৈশ্বিক করপোরেট কাগজ বাণিজ্য এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো বহুপক্ষীয় সংস্থার খবরদারি। নেত্রকোনার দুর্গাপুরের মেনকীফান্দা পাহাড়ে প্রাকৃতিক শালবন কেটে আগ্রাসী একাশিয়া গাছের সামাজিক বনায়ন করতে গেলে স্থানীয় মান্দি আদিবাসীরা অজিত রিছিলের নেতৃত্বে বন বাঁচানোর আন্দোলন গড়ে তোলে। সামাজিক বনায়নের নামে বন বিভাগ মূলত আগ্রাসী বৃক্ষের প্রসার ঘটিয়ে দেশব্যাপী আগ্রাসী বৃক্ষকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০১২ আগ্রাসী বৃক্ষ প্রজাতিকে নিরুৎসাহিত করেছে। সামাজিক বনায়নের নামে কোনো একটি এলাকার প্রাকৃতিক বন ও এর বহু দিনে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র বিনাশ করা হয়। তাতে সামগ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল এবং প্রতিবেশ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

পানপুঞ্জির পরিবেশগত অবদান :বেশ কিছুদিন ধরে মৌলভীবাজার জেলার খাসি জনগোষ্ঠীর পানপুঞ্জিগুলো চা বাগান সম্প্রসারণ এবং বন বিভাগের সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের কারণে হুমকিতে আছে। অথচ খাসি পানপুঞ্জিগুলো স্থানীয় প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ করে দেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণে অবিস্মরণীয় পরিবেশগত অবদান রাখছে। দেখা গেছে, চা বাগান সম্প্রসারণ বা সামাজিক বনায়নের নামে পানপুঞ্জিগুলোর প্রাচীন আদিবৃক্ষ ও পানজুম কেটে ফেলা হয় এবং বাধ্য হয়ে খাসিরা জন্মমাটি ছেড়ে উচ্ছেদ হতে বাধ্য হয়। সিলেট বিভাগে পাহাড়ি টিলায় নিজেদের গ্রামকে খাসিরা বলে ‘পুঞ্জি’। নিকট-অতীতে ডলুছড়া পানপুঞ্জির গাছ ও পানজুম যেভাবে সামাজিক বনায়নের নামে কাটা হয়েছে; এর আগেও কুলাউড়ার কাঁকড়াছড়াপুঞ্জি এবং বড়লেখার আগার ও বনাখলাপুঞ্জির বহু গাছ ও পানজুম চা বাগান সম্প্রসারণের নামে কেটে ফেলা হয়েছিল। পানপুঞ্জিগুলো শুধু পান ও ফলফলাদি উৎপাদন করে না; স্থানীয় বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণে রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কারণ লতানো পান চাষের জন্য দেশি প্রজাতির বহু প্রাচীন বৃক্ষ দরকার। এমন বহু দেশি গাছে লাইকেন, শৈবাল, ছত্রাক, ফার্ন ও অর্কিড জন্মে। গাছগুলো বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। পানপুঞ্জিগুলোর পাশের পাহাড়ি ছড়াগুলো আবর্জনামুক্ত থাকে। একমাত্র জলের উৎস হিসেবে পুঞ্জিবাসী এসব সংরক্ষণ করে। পানপুঞ্জির এই পরিবেশত অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। জলবায়ু বিপর্যস্ত এই সময়ে পানপুঞ্জির এমন পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনা আমাদের মুমূর্ষু দুনিয়ার জন্য এক অবিস্মরণীয় উপহার। প্রাকৃতিক অরণ্য এবং বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষা করে রাষ্ট্রকে বাস্তুতন্ত্র সংবেদনশীল ‘সামাজিক বনায়ন’ নীতি গ্রহণ করতে হবে।

লেখক ও গবেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here