বাঘ বাঁচাবে সুন্দরবন নাকি সুন্দরবন বাঁচাবে বাঘ

0
12

ড. জহিরুল হক শাকিল

বাঘ ও সুন্দরবন। বাঘ হলো সুন্দরবনের প্রাণ আর সেই প্রাণের কোটর বা দেহ হলো সুন্দরবন। বাঘ ও সুন্দরবনের সম্পর্ক যেহেতু দেহ ও প্রাণের সম্পর্ক; সেহেতু একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটির আলোচনা অর্থহীন। গত ২৯ জুলাই করোনা সংকটকালীন সময়ে অনাড়ম্বরভাবেই পালিত হয়েছে বিশ্ব বাঘ দিবস। এ বছরের বিশ্ব বাঘ দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘বাঘ বাঁচাবে সুন্দরবন, সুন্দরবন বাঁচাবে লক্ষ প্রাণ’। আর গেল বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাঘ বাড়াতে পণ, রক্ষা করি সুন্দরবন’। ২০১৯ সালে ছিল ‘বাঘ বাড়াতে শপথ করি, সুন্দরবন রক্ষা করি’। এ প্রতিপাদ্যগুলোর মাধ্যমে সহজেই অনুধাবন করা যায় বাঘ ও সুন্দরবন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর বাংলাদেশে বাঘ ও সুন্দরবন দুটিই সংকটাপন্ন। সেই সংকটে পুরো বাংলাদেশের পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন।

বাঘ মূলত শক্তি, সাহস, শৌর্য, বিক্রম ও আভিজাত্যের প্রতীক। বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় প্রাণীর মর্যাদা পেয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বাংলাদেশ-ভারতের সুন্দরবন ছাড়াও নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও দক্ষিণ তিব্বতের কিছু অঞ্চলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার প্রজাতির বাঘ রয়েছে। এক সময় বাংলাদেশের সর্বত্র এই প্রজাতির বাঘের বিচরণ ছিল। ১৯৫০-৬০-এর দশকেও গাজীপুর ও মধুপুরে বাঘের বিচরণ ছিল। সারাদেশে বন উজাড়ের জন্য আজ সুন্দরবন হলো বাঘের শেষ আশ্রয়স্থল। বাঘ আমাদের কেবল জাতীয় প্রাণীই নয়; আমাদের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে মিশে আছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের টাইগার হিসেবে তুলনা করা হয়। বিশ্বের অনেক দেশেই বাংলাদেশের পরিচিতি দেওয়া হয় বাঘ বা টাইগার দিয়ে। আমরা যে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে চলছি অনেক অর্থনীতিবিদ ও পত্রিকা-সাময়িকী বাংলাদেশকে বলেন এশিয়ার বা বিশ্বের ইমার্জিং টাইগার।

বাংলাদেশের ছোট্ট এক কোনায় বসবাস করেও বাঘ মিশে আছে আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে। বাংলার এমন জনপদ নেই যেখানে বাঘ নিয়ে গল্পগাথা বা রূপকথা গড়ে ওঠেনি। আর সেই দেশেই কিনা বাঘ অস্তিত্ব সংকটে। যে দেশের জাতীয় প্রাণী বাঘ, যে দেশে বীরত্বের প্রতীক বাঘ, যে দেশের আনাচে কানাচে বাঘ নিয়ে নানা গল্প-উপমা সে দেশ বাঘ রক্ষায় ব্যর্থ সেটা মেনে নেওয়া যায় না। সরকারের গত মেয়াদের বনমন্ত্রী বলতেন, বাঘ শুমারির সময় নাকি আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগার ভারতের সুন্দরবন অংশে বেড়াতে গিয়েছিল সেজন্য বাঘের সংখ্যা কমে গেছে। দায়িত্ববান ব্যক্তির দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য যদি সত্যও ধরা হয়; তাহলে ভারতে বেড়াতে যাওয়া সে বাঘগুলো কি আমাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল? আন্তর্জাতিক সীমানা হলো মানুষের জন্য; অন্যান্য প্রাণীর জন্য প্রাকৃতিক সীমানা। আর মানুষ যদি হস্তক্ষেপ না করে তাহলে বাঘ কেন কোনো প্রাণীই তাদের নির্ধারিত সীমানা লঙ্ঘন করে না।

২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত বাঘ সম্মেলনে বাঘের প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা করা এবং বাঘ সংরক্ষণের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতি বছরের ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশে এক যুগে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়। তার মধ্যে নেপাল, ভুটান, ভারতের অগ্রগতি ভালো হলেও হতাশ করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘ ছিল ৩৫০টি, ১৯৮২ সালে ৪২৫টি, ১৯৮৪ সালে ৪৩০-৪৫০টি, ১৯৯২ সালে ৩৫৯টি, ১৯৯৩ সালে ৩৬২টি, ২০০৪ সালের জরিপে ৪৪০টি। ২০১৫ হতে ২০১৮ সালে ৪ বছরে সুন্দরবনে বাঘ বেড়েছে মাত্র ৮টি। এ পরিসংখ্যানে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের অনেক সরকার ও পরিবেশবাদীরা নড়েচড়ে বসেন। অনেক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে বাঘের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য। কিন্তু বাঘ আর বাড়ে না। বাঘ না বাড়ার প্রাকৃতিক কারণ থাকতে পারে। জিনগত কারণে বাঘের প্রজনন কমে থাকতে পারে। সেটা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সংশ্লিষ্ট করে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

বাঘ কমে যাওয়ার অপর একটি কারণ হলো সুন্দরবনে বাঘের খাদ্যের সংকট। সুন্দরবনের বাঘের ৭০ ভাগ খাবার আসে হরিণ থেকে। বাকি খাবার আসে বন্য শূকর ও অন্যান্য প্রাণী থেকে। ২০১২ সাল থেকে প্রতিবছর গড়ে ১১ হাজার হরিণ শিকার করে বনদস্যুরা। অন্যান্য দেশে বাঘের খাবারে বৈচিত্র্য থাকলেও সুন্দরবনে একটি প্রাণীর ওপর খাদ্য নির্ভরশীলতাও বাঘ বৃদ্ধি না হওয়ার জন্য দায়ী।

পাচারকারী ও বনদস্যুদের মাধ্যমে বাঘ হত্যা বাঘ কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ। বাঘের চামরা, মাংস, হাড়, দাঁত প্রভৃতি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া মূল্যে চোরাইপথে বিক্রি করতে একটি চক্র বিষটোপ বা ফাঁদে ফেলে বাঘ হত্যার সঙ্গে জড়িত। হাবিব তালুকদার (৫০) নামে এমনই একজনকে গত ২৮ মে বাগেরহাট থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। গত ২০ বছরে হাবিব একেকটি বাঘ হত্যা করত আর সেই গল্প এলাকার লোকজনকে শুনাত। এভাবে সে ৩২টি বাঘ হত্যার গল্প স্থানীয়দের শুনিয়েছে। তার মধ্যে ১৯টিই নারী বাঘ। বাঘ হত্যায় ‘বীরত্বের’ জন্য এলাকাবাসী তাকে ‘বাঘ হাবিব’ বা ‘বাঘা হাবিব’ বা ‘টাইগার হাবিব’ বলে ডাকেন। বাঘ হাবিব নিজেই বলে বেড়াত সুন্দরবনের এমন কোনো স্থান নেই যা তার অজানা। বাঘ হত্যায় সে এপার-ওপার দুই বাংলায় কুখ্যাত। সে সুন্দরবনের বাংলাদেশ ও ভারতীয় অংশে বাঘ হত্যার জন্য উভয় দেশের পুলিশের কাছে মোস্ট ওয়ান্টেড ছিল। সংবাদপত্রে এসেছে গত ২০ বছরে অন্তত ৭০টি বাঘ মারা পড়েছে বাঘ হাবিবের হাতে। এমন আরও হাবিব থাকতে পারে। সেই চক্রের মূলোৎপাটন না করতে পারলে বাঘ টিকানো যাবে না। আর বাঘ টিকে না থাকলে সুন্দরবনও থাকবে না। সুন্দরবন না থাকলে পুরো বাংলাদেশ সংকটে পড়বে।

অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here