আইন কী তার নিজস্ব গতিতে চলছে??

0
38

আবু নাসের অনীক

দেশে কোন অপরাধমূলক কর্মকান্ড (আলোচিত) ঘটলেই আমরা এটা শুনে অভ্যস্ত,‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে, অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে’। এগুলো শুনে যেমন অভ্যস্ত একই রকম ভাবে এটা দেখে অভ্যস্ত, আইনের নিজস্ব কোন গতি নেই। সব অপরাধীও সমানভাবে আইনের আওতায় আসে না।

সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে আইন তৈরি হয়। তৈরির একটি দর্শনগত দিকও থাকে। এই দর্শন ঠিক করে দেয় আইন তৈরির দৃষ্টিভঙ্গি এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও ঐ দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পায়। শাসকগোষ্ঠী শাসন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তার অনুকূলে আইন তৈরি করে। শাসকগোষ্ঠীর শ্রেণী চরিত্রের উপর নির্ভর করে আইনের চরিত্র। সাম্প্রতিক সময়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’।

আইনের ৪ টি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। (১) আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া। (২) আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া। (৩) অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী না বলা। (৪) যে যতোটুকু অপরাধ করবে তাকে ততোটুকু শাস্তি দেওয়া। আইনের এই ৪ টি বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় জঁষবং ড়ভ খধ.ি বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে আইনের ৪ টি বৈশিষ্ট্যের অধিকাংশই প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়নি।

একটি দেশ কতোটা গণতান্ত্রিক, সভ্য সেটি অনেকটাই বোঝা যায়, জঁষবং ড়ভ খধি এর প্রয়োগ দেখে। যে দেশে এই ৪ টি বৈশিষ্ট্য আইন প্রয়োগে প্রতিফলিত হয় না, সেই দেশ যে একটি অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অধীন সেটি নিশ্চয়ই নতুন করে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই!

এটা দিবালোকের মতো পরিস্কার, বাংলাদেশে আইনের নিজস্ব কোন গতি নেই। এখানে আইনের গতি অনেকটাই রিমোট কন্ট্রোলের মতো করে নিয়ন্ত্রিত হয়। রিমোট কন্ট্রোল যার হাতে থাকে সে তার প্রয়োজনমতো গতি কমায়, বাড়ায়, পজ করে, ফরোয়ার্ড, প্রিভিউ করে। আমরা টিভি দেখার সময় রিমোট হাতে নিয়ে যা করি ঠিক তেমনি।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর তৎকালীন সরকার তার স্বার্থ রক্ষার্থে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকান্ডের মামলা হলো ঘটনার ১৪ বছর পর। ঘটনা ঘটেছে ৪০ বছর আর মামলা হবার ইতিমধ্যে ২৫ বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু এর বিচার আজো শেষ হয়নি। এই মামলাটিকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি উভয়ই এরশাদকে যখন যার প্রয়োজন হয়েছে তার কব্জায় রাখতে ব্যবহার করেছে। আইনের নিজস্ব গতিতে চল্লে, এই মামলা বহু আগেই নিষ্পত্তি হয়ে যাবার কথা ছিলো!

২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতের তান্ডবের অভিযোগে মামলা হয়। সেই মামলা ৮ বছর নিস্ক্রিয় থাকার পর ২০২১ সালে এসে সক্রিয় হয়েছে। ৮ বছরে একজন আসামী গ্রেপ্তার না হলেও এখন একাধিক আসামী গ্রেপ্তার হয়েছে একটি বিশেষ পরিস্থিতিকে সামনে রেখে। মাঝের এই সময় আইনের গতি ছুটতে ছুটতে কান্ত হয়ে মনে হয় গাছ তলায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। এখন ধাক্কা দিয়ে তাকে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি না হলে ঘুমটা হয়তো আরো ৮ বছর পরে ভাঙতো।

প্রকৃত অর্থে আইনের ‘নিজস্ব গতি’ বলে কিছু নেই! আইনের গতি কী হবে এটা নির্ধারণ হয়ে থাকে প্রধানত রাজনৈতিকভাবে। এখন প্রশ্ন রাজনীতিটা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের পক্ষে না বিপক্ষের! যদি পক্ষের হয়ে থাকে তবে আইন প্রয়োগে আদালত একটি স্বতন্ত্র-স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসাবে ভূমিকা রাখতে পারে। আইনের গতি ঐ প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। আর রাজনীতিটা যদি হয় গণবিরোধী তবে আদালত নামক প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীন-স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে ওঠার সুযোগ রুদ্ধ হয়ে যায়।

ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্রের স্বার্থ হাসিলের জন্য তাদের নির্দেশনা অনুসারে আইনের গতি নির্ধারিত হয়। সেক্ষেত্রে আইনের গতি প্রভাবিত করে ক্ষমতা, অর্থ ও অন্যান্য প্রভাবক শক্তি। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে এমনটাই ঘটে আসছে যা পূর্বে উল্লেখ করেছি।

হাল আমলের কিছু ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। সুনামগঞ্জের ঝুমন দাস’র নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মিথ্যা মামলায় ৫ বার জামিন আবেদন করা হলেও সেটি বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে আগুনে পুড়িয়ে ৫২ জন জলজ্যান্ত মানুষকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত সজিব গ্রুপের চেয়ারম্যান গ্রেপ্তারের ২২ দিনের মাথায় জামিনে মুক্তি পেয়ে যান। মুনিয়া আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলায় অভিযুক্ত বসুন্ধরা গ্রুপের পরিচালক আনভীর এর নাম চুড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ‘আইনের নিজস্ব গতি ও আইন সবার ক্ষেত্রে সমান’এর উজ্জ্বল উদাহরণ!!

সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত ঘটনা, হেলেনা-পিয়াসা-মৌ-পরীমণিকে গ্রেপ্তার। তাদের গ্রেপ্তার এবং পরবর্তীতে গোটা বিষয়টিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা মানবাধিকার ও আইনের শর্ত অনুযায়ী প্রয়োগের জায়গা থেকে সাংঘর্ষিক। তাদের গ্রেপ্তার বিষয়ে বলা হয়েছে সবার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিলো। সেক্ষেত্রে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট ছাড়া তাদের গ্রেপ্তার করার সাধারণভাবে কোন কারণ নেই। কিন্তু তারা স্বাভাবিক আইন প্রয়োগের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে।

একজন নাগরিক হিসাবে আমার প্রশ্ন, তারা কী কোন জঙ্গি গ্রুপের সদস্য ছিলো? দেশের মধ্যে বড় কোন নাশকতা তৎপরতায় লিপ্ত ছিলো? ব্যাপক গোলা-বারুদসহ আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ছিলো? না এর কোন অভিযোগই তাদের বিরুদ্ধে ছিলো না। অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট ছাড়াই কম্বিং অপারেশনের মতো করে দেশের একটি এলিট বাহিনীকে তাদের গ্রেপ্তার করার জন্য কেনো নিয়োজিত করতে হলো??

জঁষবং ড়ভ খধি অনুসারে, অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী বলা যাবে না। কোথায় প্রমাণিত হতে হবে, আদালতে। ডিবি বা র‌্যাব কার্যালয়ে নয়। অবস্থাদৃষ্টে যা দাঁড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেদেরকে বিচারক মনে করছে। অথচ বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় তাদের কাজ অভিযোগ গঠন করা। সেই অভিযোগ পত্রটি আদালতে উপস্থাপন করা এবং আইনবিদের কাজ তার প্রেক্ষিতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগটি প্রমাণ করা। অনেক ক্ষেত্রেই বিচারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনীত অভিযোগ সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে প্রমাণিত হয় না।

সেই পর্যায়ে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলো, তাকে যদি ঐ বিচারের আগেই অপরাধী ঘোষণা করা হয়, তবে দেশের সংবিধান অনুসারে, প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক মর্যাদা ও সম্মান সংরক্ষিত হয় না। বিষয়টি আইন ও সংবিধান দুটিরই পরিপন্থি। সেক্ষেত্রে জঁষবং ড়ভ খধি ভায়োলেট হচ্ছে। এটা করছে কে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আমরা এটাও শুনে অভ্যস্ত, ‘কেউ আইনের উর্দ্ধে নয়’। কিন্তু আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভুলে যান এটা শুধু যিনি অভিযুক্ত তার ক্ষেত্রেই নয়, যারা আইন প্রয়োগ করছেন এটা তাদের জন্যেও সমানভাবে প্রযোজ্য।

গণমাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বরাত দিয়ে নানা ধরনের সুড়সুড়িমার্কা কথাবার্তা এদের সম্পর্কে প্রচার করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ‘বিশেষ সঙ্গ’ ও বিভিন্ন পার্টিতে অংশ নিয়ে অর্থ আয় করতেন পরীমণি। তিনি দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ‘প্লেজার ট্রিপ’ দিতেন। এ সকল তথ্যের সাথে আইনগত জায়গা থেকে অপরাধের নুন্যতম কোন সম্পর্ক নেই! এটা নিতান্তই তার ব্যক্তিজীবনের ব্যাপার। ব্যক্তিজীবনের বিষয়গুলিকে সামনে এনে এই যে, তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে এটা পরিপূর্ণভাবে আইন ও সংবিধান পরিপন্থী। আইনের সাথে সংশ্লিষ্টগণ সেই বেআইনী কাজটিই করে যাচ্ছেন!

এসব তথ্য যদি তুলে ধরতে হয়, তবে পরীমণির কাছ থেকে যারা যারা বিশেষ সঙ্গ নিয়েছে, তার পার্টিতে যোগ দিয়েছে, বারে আসা-যাওয়া করেছে, প্লেজার ট্রিপ নিয়েছে তাদের প্রত্যেকের নাম প্রকাশ করা উচিত। সেসব নাম আড়াঁল করে পরীমণির ব্যক্তিজীবনের ঘটনা বর্ণনা অসভ্য-বর্বরের মতো আচরণের সামিল। কিন্তু সেই নামগুলি কোনভাবেই প্রকাশ হবে না, সেটি আমরা জানি। কারণ এখানে আইন সবার জন্য একইভাবে প্রয়োগ হয় না।

পরীমণিদের জিজ্ঞাসাবাদের সাথে যুক্ত একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন,‘ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হলেও সম্মানের কথা চিন্তা করে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি’। আহা ! কী সুমধুর বয়ান!! পরীমণি-পিয়াসা-মৌ’রা ঘৃণিত মানুষ আর তাদের কাছে যারা যায় তারা সম্মানে ভরপুর ব্যক্তি। আর তাদের সম্মান রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী!

পরীমণিদের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে এতো কথার সৃষ্টি হতো না যদি বিষয়টি ব্যক্তি নিরেপেক্ষভাবে ঘটতো।

যদি আইন তার নিজস্ব গতিতে চলতো!জঁষবং ড়ভ খধি প্রতিপালিত হতো! তারা এমনভাবে ঘটনাকে চিহ্নিত করেছে এবং গণমাধ্যম তাদের কন্ঠস্বর হিসাবে সংবাদগুলোকে যেভাবে ট্রিটমেন্ট দিয়েছে যেনো মনে হলো এরা দেশ বিক্রির গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো।

ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে যায়, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি করতে করতে ছিবড়ে বানিয়ে ফেলেছে, সারাদেশে মাফিয়াতন্ত্র কায়েম হয়েছে, অথচ এসব বিষয়ে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঠুটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকে। আদালত ঘুমিয়ে থাকছে!

পরীমণি’দের এই সমাজের ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্রের যারা ধারক-বাহক তারাই সৃষ্টি করেছে, আগামীতে আরোও করবে। যদি আইনের নিজস্ব গতি থাকতো তবে, পরীমণি’রা গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্বেই তারা গ্রেপ্তার, বিচারের মুখোমুখি হতো। আইন সবার জন্য সমান হলে আনভীরদের মতো ব্যক্তিরা চার্জশিটের বাইরে থাকতো না। সাগর-রুনি হত্যা মামলা ৯ বছরে ৭৮ বার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া পেছাতো না। তাদের যতো আগ্রহ পরীমণি’দের ঘিরে! তার ১০ শতাংশ আগ্রহ যদি তনু, ত্বকীসহ অন্য হত্যাকান্ডের তদন্তে থাকতো তবে এতোদিনে বিচার শেষ হয়ে যেতে পারতো!

আমরা বাস করছি এক অসভ্য-বর্বর সমাজ-রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। শুধুমাত্র পরীমণি’দের নয় সকল অপরাধের নিশ্চয় বিচার চাইতে হবে, কিন্তু তাদের ব্যক্তি চরিত্র হরণ করে না। পরীমণি’দের যারা সৃষ্টি করছে, সমাজে তাদের চাহিদা টিকিয়ে রেখে, যোগান অব্যহত রাখছে তাদের (লুটেরা শাষকগোষ্ঠী) বিচার নিশ্চিত করাটা আগে জরুরী। কন্ঠ সেই দাবিতে আরো বেশি সোচ্চার করে তোলাটাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা রাখবে। আইন সত্যিকার অর্থে নিজস্ব গতিতে চলার পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় যুব পরিষদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here