অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম সিরিজ জয় করে ইতিহাস গড়ল টাইগাররা

0
92
শুক্রবার মিরপুরে অস্ট্রেলিয়ার বিপে টানা তৃতীয় টি২০ ম্যাচ জয়ের পর টাইগারদের বাঁধভাঙা উল্লাস

স্পোর্টস ডেস্ক

এ যে দম বন্ধ হওয়া এক ম্যাচ। শেষ ১২ বলের রোমাঞ্চ রক্তের চাপ এতটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, সবাইকে থমকে যেতে হয়। প্রেসবক্সের সাংবাদিকরা পারলে মাঠে গিয়ে ফিল্ডিং করে দেন। মুস্তাফিজের অমন জাদুকরী ওভারের পরও শরীরের কাঁপন থামছিল না। শেখ মেহেদী শেষ ওভারটা শেষ না করা পর্যন্ত নির্গত নিঃশ্বাসে বাধা পড়ছিল। টি২০ ম্যাচের এক ওভারে ২২ রান তো নিয়মিতই হয়। কে বলতে পারে অস্ট্রেলিয়া ২২ রান করে ফেলবে না! এই শঙ্কার শিহরণ জাগানো ভয় থেকে মুক্তি দেন মেহেদী। রোমাঞ্চকর জয়ের ম্যাচের নায়ক কিন্তু অন্যজন। তিনি কাটার মাস্টার মুস্তাফিজ। ১৯তম ওভারে এক রান দিয়ে জয় একপ্রকার নিশ্চিত করে দেন তিনি। সেটার আনুষ্ঠানিকতা দিতে হতো মেহেদীকে। নিখুঁত না হলেও নিজের কাজটি ঠিকঠাক করে সিরিজের ক্যানভাসে বিজয় এঁকে দেন তিনি। টান টান উত্তেজনায় ১০ রানে ম্যাচ জিতে নেয় বাংলাদেশ। তিনে তিন জয়ে সিরিজ নিশ্চিত করে টি২০ ক্রিকেটে অসি-বধের নতুন ইতিহাস লেখা হলো মিরপুরে।

দেশের ক্রিকেটের এমন সাফল্যের উদযাপন বাঁধভাঙা হতে পারত দর্শক থাকলে। ক্রিকেটারদের সে খুশি কেড়ে নিয়েছে করোনা। এর পরও সীমিত পরিসরে সিরিজ জয় উদযাপন করলেন ১১ জন এক জায়গায় জড়ো হয়ে, একজন অন্যজনের কাঁধে হাত রেখে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে। ড্রেসিংরুমে ফিরে হয়তো আরও উচ্ছ্বাস দেখিয়েছেন।

টাইগারদের এই সাফল্যে খুশি জাতি। স্বাভাবিকভাবেই ক্রিকেটাররা অভিনন্দন বার্তায় ভাসছেন। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল অভিনন্দন জানিয়েছেন বিজয়ী দলকে।

টি২০ ক্রিকেটে সব মিলিয়ে পঞ্চম, দেশের মাটিতে দ্বিতীয় সিরিজ জয় টাইগারদের। বলার অপো রাখে না, সেরা সাফল্য এই সংস্করণে। কারণ প্রতিপ বিশ্বের অন্যতম সেরা অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশ ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে গতকাল সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচ খেলতে নামে। সিরিজ জিততে মরিয়া হয়ে খেলেছে তারা। অন্যদিকে সিরিজ বাঁচাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে গেছে অসি বাহিনী। বোলারদের সমন্বিত পারফরম্যান্সে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধের সব বাধা ভেঙে গেছে। বাংলাদেশ ১২৮ রানের টার্গেট দিয়েছিল অসিদের। বৃষ্টিস্নাত দিনে শেরেবাংলার উইকেটে এই স্কোরও ছিল চ্যালেঞ্জিং। জিততে কঠিন ধৈর্যের পরীা দিতে হতো সফরকারীদের। টপঅর্ডার ব্যাটসম্যানরা ভালোভাবেই সেটা করে যান। দ্বিতীয় উইকেটে মিচেল মার্শ ও ম্যাকডরমট ৬৩ রানের জুটি গড়লে ম্যাচ হেলে পড়ে অসিদের দিকে। সেই জায়গা থেকে বোলাররা ইউটার্ন করেন। স্পিন-পেসের সমন্বয়ে প্রতিপরে কাজ কঠিন করে দেন বোলাররা। শরিফুল-মুস্তাফিজদের ব্যাকফুটে ঠেলে দিলেও পরমুহূর্তেই দারুণভাবে ফিরে আসতে দেখাটা ছিল চোখের আনন্দ। সাকিব-নাসুম উইকেটের পেছনে না ছুটে রান কম দিয়ে ওভার শেষ করার পরিকল্পনা দারুণ কাজে লাগান। যে কারণে একাধিক ক্যাচ ফেলার পরও ম্যাচ থেকে ছিটকে যেতে হয়নি বাংলাদেশকে। বরং ব্যাটসম্যান-বোলারের মধ্যকার উত্তেজনা ম্যাচ দেখার আনন্দ বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণ। এমন একটি জয়ের ম্যাচে মাহমুদুল্লাহকে সেরার পুরস্কার দেওয়া হলেও মুস্তাফিজকে বলতে হবে সেরার সেরা। চার ওভারে মাত্র ৯ রান খরচ করেন তিনি। তাকেই বলতে হবে জয়ের নায়ক। কারণ তিনি এই বোলিং না করলে শেষ দুই ওভারে ২৩ রান তোলা কঠিন হতো না সফরকারীদের জন্য।

সিরিজ জিতলেও বাংলাদেশের ব্যাটিং প্রত্যাশামতো হয়নি। টানা তৃতীয় ম্যাচে হতাশ করেছে ওপেনিং জুটিতে। সৌম্যর ব্যাটিং দেখে যে কারও মনে হতে পারে অস্ট্রেলিয়া জুজুতে আক্রান্ত। সহজ বলও সহজ করে খেলতে পারছেন না। পেস তো পেস, স্পিন বলেও ধুঁকছেন। তার চোখেমুখে বিষণ্ণতার ছাপ, শরীরটাই শুধু মাঠে আছে, মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। বয়সভিত্তিক দল থেকে যে মাঠে খেলে বড় হয়েছেন সেই মিরপুরেও হতাশ করা পারফরম্যান্স তার। তিন ম্যাচে ৪ রান (২, ০, ২) করেছেন। উইকেট কামড়ে পড়ে থাকার চেষ্টাও করতে দেখা যায়নি তাকে। আরেক ওপেনার নাঈম শেখও এখন পর্যন্ত বলার মতো কিছু করতে পারেননি। ভারতের বিপে টি২০-তে দুর্দান্ত অভিষেক করা বাঁহাতি এ ব্যাটসম্যানের উন্নতিটা দুই বছরে সেভাবে হয়নি। ১৫, ৯ ও ৩ রানের ওপেনিং জুটি গত তিন ম্যাচে। তিন ইনিংসে দুই ওপেনারের মোট রান ৬১ (৩৭, ২১, ৩)। এই পারফরম্যান্সের পর চতুর্থ টি২০-তে ওপেনিংয়ে একই জুটি রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বিষয়টি টিম ম্যানেজমেন্টেরও ভাবনার কারণ।

ওপেনিং জুটির ব্যর্থতার প্রভাব পরের ব্যাটসম্যানদেরও ওপর পড়েছে। সাকিব নেমেই শট খেলতে বাধ্য হচ্ছেন। মাহমুদুল্লাহ প্রথম দুই ম্যাচে সেট হতে পারেননি চাপ থাকায়। গতকাল অবশ্য দায়িত্বশীল ব্যাটিং করেছেন অধিনায়ক। দলের ৩ রানে সৌম্য-নাঈম আউট হওয়ায় আরিক অর্থেই সাকিব-মাহমুদুল্লাহকে নিতে হয়েছে ওপেনারের ভূমিকা। সাকিব আক্রমণাত্মক হওয়ায় সেট হওয়ার মতো সময় পেয়েছেন মাহমুদুল্লাহ। যদিও ৩৬ বলে ৪৪ রানে জুটি থেকে বিচ্ছিন্ন হন তারা। সাবলীল সাকিব ১৭ বলে ২৬ রানে ক্যাচ দেন সাকিব। আগের দুই ম্যাচের চেয়ে সাবলীল ছিলেন সব্যসাচী এ ক্রিকেটার। যে শট খেলে আউট হলেন সেটা মাঝ ব্যাটে লাগলে ছক্কা হতো নিশ্চিত। অসময়ে আউট হওয়ায় নিজের ওপরই ােভ দেখান ব্যাট দিয়ে প্যাডে আঘাত করে। আফিফ হোসেন, নুরুল হাসান সোহানের রান আউট হওয়াটা ছিল দুর্ভাগ্যজনক। দু’জনই বেশ খেলছিলেন। আফিফ এক রান নিতে গেলে প্রান্ত বদল করার আগেই স্টাম্প ভেঙে দেন ক্যারি। কভার থেকে দুর্দান্ত ফিল্ডিং করেন ক্যারি। সোহানের আউটটা অধিনায়কের ভুল কলে। আফিফ-সোহানের যে কোনো একজন টিকে গেলে বড় স্কোর হতে পারত। তবে স্লো শুরু করেও পরের দিকে কিছুটা পুষিয়ে দিতে পেরেছেন অধিনায়ক। ৪৪ বলে ৩৩ রানে থাকা এ ব্যাটসম্যান ইনিংস শেষ করেন ৫৩ বলে ৫২ রানে। এই সিরিজে টাইগারদের প্রথম হাফসেঞ্চুরি এটি। দিন শেষে মাহমুদুল্লাহর কারণেই ৯ উইকেটে ১২৭ রান পেয়েছে বাংলাদেশ।

১২৭ রানের পুঁজি নিয়ে জিততে হলে বোলিং ও ফিল্ডিং অসিদের মতোই ভালো করতে হবে, মাহমুদুল্লাহ তা ভালো করেই জানতেন। তাই ফিল্ডিংয়ে নামার আগে বোলিংয়ে লিড দেওয়ার দায়িত্ব সাকিবের হাতে তুলে দিয়েছিলেন অধিনায়ক। বাউন্ডারির বাইরে দাঁড়িয়ে সাকিব ছোটখাটো উজ্জীবনী বক্তব্য দেন। অভিজ্ঞতার আলোকে সাকিব বোলারদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘জিততে হলে হৃদয় বড় রাখতে হবে। মার খেলেও হতাশ হওয়া যাবে না। এমনভাবে বল করতে হবে, যেন স্লগে অস্ট্রেলিয়াকে ৯-১০ রান করে করতে হয়। পরিকল্পনামতো সেটা করতেও পেরেছেন নাসুমরা। এখন তো সবারই জানা, শেষ দুই ওভারে অর্থাৎ ১২ বলে ২৩ রান করতে হতো অসিদের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here