চীন প্রশ্নে ট্রাম্প যেখানে ব্যর্থ, বাইডেন সেখানে সফল হবেন না

0
30

কেন মোয়াক

চীনকে ধরার কৌশলের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তাঁর পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেখানো পথেই হাঁটছেন। এ ক্ষেত্রে প্রধান পার্থক্য হচ্ছে, এখনকার হোয়াইট হাউস প্রশাসন মার্কিন মিত্রদের নিয়ে জোট গড়ার চেষ্টা করছে। আর ট্রাম্প ‘একাই’ এশিয়ার পরাশক্তির সঙ্গে লড়েছিলেন।

ট্রাম্পীয় নীতির মূর্খতা

ইতিহাস বলবে, বাণিজ্যযুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বাজে উপদেশ চীনকে ধরার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দুর্দশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্টের করনীতি জিনিসপত্রের উৎপাদন খরচ ও ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য–ঘাটতি বাড়িয়েছে। দেশের ভেতরে উৎপাদন কর্মকা- কমিয়েছে। কৃষকদের আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এর কারণ হচ্ছে, রাজস্ব দিতে হয় আমেরিকান ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের। পক্ষান্তরে চীনের নেওয়া ‘ইটের বদলে পাটকেল’নীতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষি ও অন্যান্য পণ্যের আমদানির গতি ধীর করে দিয়েছে।

সাবেক প্রেসিডেন্টের প্রযুক্তিযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই আর্থিক সামর্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের যে আধিপত্য, সেটাকেও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। প্রযুক্তিযুদ্ধের ফলে এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধাক্কা লেগেছে। আয় কমে যাওয়ায় গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মকা- কাটছাঁট করতে হচ্ছে। এশিয়া ও ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধে কোনো পক্ষে যাচ্ছে না। কেননা, তাদের বেশির ভাগ নিজেদের অর্থনৈতিক ভালোমন্দের জন্য চীনের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।

না, চীনের অর্থনীতি ধসে পড়বে না

বাণিজ্যযুদ্ধে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশটি অনেক ভালো করছে। ২০২০ সালে প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে চীনই একমাত্র ইতিবাচক অগ্রগতি করতে পেরেছে। এর কারণ হচ্ছে, কোভিড মহামারি নিয়ন্ত্রণে সময়মতো ও কার্যকর পদক্ষেপ তারা নিতে পেরেছিল। জোড়া এ পদক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নেওয়া আরও কিছু কার্যকর পদক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ও অন্যান্য সংস্থা ধারণা করছে, ২০২১ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি হবে ৮ দশমিক ১ শতাংশ। এরপরের বছরে ৬ শতাংশের কাছাকাছি।

ট্রাম্প যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে চীনকে ধরে ফেলা এবং নিজের নির্বাচনী ওয়াদা পূরণে বাইডেনও সফল হবেন না। প্রকৃতপক্ষে বাইডেন দুই দেশের ‘বিষাক্ত’ সম্পর্ককে আরও বাড়িয়ে তুলেছেন। কেননা, তিনি ‘নব্য সংরক্ষণবাদী’ নীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানায়, এমন কোনো দেশকে তিনি মোটেই সহ্য করতে পারেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের প-িত আর রাজনীতিবিদেরা যা দাবি করছেন, তার থেকে চীনের চিত্রটা একেবারে বিপরীত। বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের বেশি বন্ধু রয়েছে। কেননা, চীন বিশ্বের ১২৫টির বেশি দেশের প্রধান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগী। চীন তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দায়িত্ব নিয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো কোনো দেশে হস্তক্ষেপ কিংবা বোমা মারা চীনের পছন্দ নয়।

চীন পাল্টা আঘাত করছে

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, চীন এ ক্ষেত্রে চুপচাপ বসে নেই। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘নেকড়ে যোদ্ধা কূটনীতি’তে পাল্টা আঘাত করেছে। বেইজিংকে তাক করে পরিভাষাটি ব্যবহার করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতার বোঝাতে এটি সবচেয়ে মোক্ষম পরিভাষা।

অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তি খাতে চীন ছাড় দিয়ে হলেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য নিজেদের তৈরি করছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ানোর জন্য ‘বেল্ট অ্যান্ড রোডস’-এর মতো উদ্যোগ তারা নিয়েছে। ১৪০ কোটি মানুষের বিশাল জনগোষ্ঠী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর আরও কয়েক শ মানুষকে সঙ্গে নিয়েছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিজেদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়া সত্ত্বেও, চীনের অর্থনীতি ধসে পড়বে না। চীনের অর্থনীতি বিশ্বের কাছে একটা ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে চীন এবং দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করা যায়।

একইভাবে ২০২০ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চীনের ৫ শতাংশ বাণিজ্য বেড়েছে। এর ফলাফল হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে চীন তার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যসঙ্গী করে ফেলেছে। যদিও ইউরোপীয় সংসদ চীন-ইইউ বিনিয়োগ চুক্তি (সিএআই) আটকে দিয়েছে। কয়েকটি সদস্যদেশ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। ফ্রান্স ও জার্মানি এটি অনুমোদনের জন্য বারবার বলেছিল। এই প্রেক্ষাপটের বিপরীতে চীন থেকে বরং যুক্তরাষ্ট্রই আরও বেশি একা হয়ে পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পুনরুদ্ধার নীতি টেকসই নয়

ট্রাম্পের মতো বাইডেনও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য খুব উদার মুদ্রা ও রাজস্ব নীতি নিয়েছেন। কিন্তু এ বছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৬ দশমিক ৪ ও ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। ট্রাম্পের পথ অনুসরণ এবং প্রায়ই সেটাকে অতিক্রম করে যাচ্ছেন বাইডেন। এর মাধ্যমে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে তিনি আরও গভীরে ডুবিয়ে দিচ্ছেন। এর ফলাফল হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপত্তার মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা খুবই ন্যূনতম। কিন্তু এসব বিষয়ে সহযোগিতা ছাড়া বাইডেনের পক্ষে তাঁর নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ একেবারেই দুঃসাধ্য।

তাহলে দাঁড়াচ্ছে, ট্রাম্প যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে চীনকে ধরে ফেলা এবং নিজের নির্বাচনী ওয়াদা পূরণে বাইডেনও সফল হবেন না। প্রকৃতপক্ষে বাইডেন দুই দেশের ‘বিষাক্ত’ সম্পর্ককে আরও বাড়িয়ে তুলেছেন। কেননা, তিনি ‘নব্য সংরক্ষণবাদী’ নীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানায়, এমন কোনো দেশকে তিনি মোটেই সহ্য করতে পারেন না।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

অর্থনৈতিক তত্ত্ব, জননীতি ও বিশ্বায়ন বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ও এর বৈশ্বিক প্রভাব বইয়ের সহলেখক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here