লুটেরা রাষ্ট্রব্যবস্থা: উপজাত হেলেনা-পিয়াসা-মৌ-পরিমনি….

0
78

আবু নাসের অনীক

গণমাধ্যম-সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেনসেশনাল আলোচনা বা খবর হেলেনা-পিয়াসা-মৌ-পরিমনি গ্রেপ্তার হওয়া। এই খবরকে আরো বেশি মাত্রায় সুড়সুড়ি যুক্ত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের চেষ্টার কমতি নেই। বিভিন্ন আঙ্গিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেমনভাবে উপস্থাপন করছে, সংবাদমাধ্যম সেটিকে একই সুরে রিলে করছে।

তথ্যের একটি অন্যতম উপাদান মদের বোতল উদ্ধার। একটি হাস্যকর বিষয়! আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশের অনেক মন্ত্রী, এমপি, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, আমলা, সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তা সংবাদিক, সাহিত্যিক, শিল্পীসহ অনেকের বাসাতেই মদের বোতল সংরক্ষণ করা হয়। সংরক্ষণ ও পান করার জন্য লাইসেন্স বা পারমিট ইস্যু করা হয়। এটা কোন গোপন বিষয় নয়। আমি যে শ্রেণীর কথা উল্লেখ করেছি, এদের বাসায় যদি তল্লাশি চালানো হয় তবে অধিকাংশের বাসা থেকেই মদের বোতল উদ্ধার হবে। কারণ তাঁরা নিয়মিত এটা পান করেন।

এ ধরনের কেউ গ্রেপ্তার হলে তারপরেও বিষয়টিকে সামনে আনা হয়, যাতে সুড়সুড়ি তৈরি করা যায়। মধ্যবিত্তের মনন জগত যাতে এই মদের বোতলেই আটকে যায়। অন্য সকল অপরাধ ছাপিয়ে মস্তিস্কের মধ্যে ‘মদের বোতল উদ্ধার’ ভিন্ন ধরনের অনুরণন তৈরি করে। সবচেয়ে স্বাভাবিক ঘটনাটিকে (মদের বোতল উদ্ধার হওয়া) এ কারণেই সবচেয়ে অস্বাভাবিক ঘটনা হিসাবে উপস্থাপন করা হয়।

পূর্বে আমরা দেখেছি সম্রাট, জিকে শামীম, এনামুল, রুপন, মমিনুল, শফিকুল, আরমান, শাহেদ, আরিফ, ডা. সাবরিনা, পাপিয়ারা গ্রেপ্তার হয়েছে। সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে হেলেনা, পিয়াসা, মৌ ও পরিমনি। এরা প্রত্যেকেই সরকারী দলের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলো। প্রত্যেকেরই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সাথে যোগাযোগ ছিলো, যেটি তাদের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিচয়ের ডকুমেন্টশনের মাধ্যমে জানা গেছে।

যে সমস্ত নামগুলি উল্লেখ করলাম এরা কেউ আকাশ ফুঁড়ে হঠাৎ করে কোন একদিন মাটিতে পা রাখেনি। বরং বছরের পর বছর ক্ষমতা চর্চা করে এই জায়গায় এসে উপস্থিত হয়েছে। যে মুহুর্তে সরকার সিগন্যাল দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঠিক সেই সময়ে এদেরকে অপরাধী হিসাবে ঘোষণা করেছে, গ্রেপ্তার করেছে। অর্থাৎ তারা সতস্ফুর্তভাবে অপরাধ দমনের জন্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এভাবেই সবকিছুকে ব্যালেন্স করে লুটেরা রাষ্ট্রব্যবস্থা।

ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই সম্রাট-শাহেদ-পাপিয়া-হেলেনা’দের তৈরি করে এ ধরনের কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সরকার। এদেরকে দাবার গুটি হিসাবে ব্যবহার করা হয়। তাদের মাধ্যমেই মাথা থেকে সর্বনিম্ন স্তর পর্যন্ত ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। যাতে সরকার তার কর্তৃত্ববাদী শাসন কাঠামো টিকিয়ে রাখতে পারে।

কোথাও কোন স্তরে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলে যাতে এই চেইন ব্যবহারের মাধ্যমে বাধা অপসারণ করা সম্ভব হয়। এদের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দুর্নীতি-লুটপাটকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যা সংক্রামক ব্যাধির মত বিস্তার ঘটে। একসময় মহামারীতে পরিণত হয়। আমাদের রাষ্ট্র সেই পর্যায়ে এসে উপস্থিত হয়েছে।

এনামুল-রুপন-সাবরিনা-হেলেনা-পিয়াসা-মৌ’রা যে ধরনের অপরাধ সংঘটিত করে, তা সাধারণ কোন অপরাধ নয়।

এমন অপরাধ তখনই করা সম্ভব, যখন রাষ্ট্রের অন্যতম উপাদান সরকার ও তার বাহিনীকে ইনএকটিভ রাখা যায়। সরকার এবং তার বাহিনী কী স্বার্থ ব্যতীত কয়েকজন ব্যক্তির অপরাধ তৎপরতাকে রক্ষার জন্য নিস্ক্রিয় থাকে? অবশ্যই সেটি সম্ভব নয়। মূলত শ্রেণী স্বার্থের জায়গা থেকেই তাঁরা সক্রিয় অবস্থায় থাকে না।

র‌্যাব হেলেনার বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ উত্থাপন করেছে, জয়যাত্রা আইপিটিভি’র নামে অবৈধভাবে স্যাটেলাইট তরঙ্গ ব্যবহার করে ২০১৮ সাল থেকে সম্প্রচার করছে। আলাপের বিষয়, গত ৩ বছর পূর্ব থেকে দেশে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে হংকং থেকে স্যাটেলাইট ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে অথচ র‌্যাব এটা টের পেল ৩ বছর পরে এসে!! এই টিভির তিন বছর পূর্তিতে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীসহ একাধিক এমপি।

একজন মন্ত্রী একটি টিভির বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে অংশগ্রহণ করছেন, অথচ সেই টিভি চ্যানেলের কোন বৈধ কাগজপত্র নেই। সেটি এখন, ভাস্কো দ্যা গামার আমেরিকা আবিস্কারের মতো আবিস্কার হচ্ছে!! কারণ সরকার তখন আবিস্কারের প্রজেক্ট গ্রহণ করেনি, এখন করেছে এজন্য হয়েছে। প্রকৃত সত্যটা সরকার আগে থেকেই জানতো। তখন পর্যন্ত তাঁরা ইনএকটিভ ছিল কারণ সে প্রভাবশালীদের শতভাগ আনুগত্য মেনে পারপাস সার্ভ করছিল।

শাহেদ-হেলেনা-পিয়াসাদের যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখন ক্রসফায়ারের গতবাধা গল্পের মতো একটি গল্প উপস্থাপন করা হয়। র‌্যাব বলেছে,‘প্রতিনিয়ত বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে তার (হেলেনা)। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যাকেই প্রয়োজন হয়েছে তাকে তিনি ঘায়েল করেছেন’। কী চমৎকার বয়ান! একই ধরনের বক্তব্য শাহেদ-সাবরিনাদের সম্পর্কেও দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতা, আমলা, সাংবাদিক এরা সবাই দুগ্ধজাত শিশু! এরা এতোটাই নাবালক যে, একজন মহিলা বা পুরুষ চাইলেই অতি সহজেই তাঁদের ঘায়েল করে ফেলতে পারে!! পাঠক, এভাবেই যদি তাঁরা ঘায়েল হন তাহলে রাষ্ট্র-সরকার কিভাবে চালায় একটু ভাবুন!

প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, হেলেনা’রা ঘায়েল করে না, বরং হেলেনা’দের ঘায়েল করা হয়। ঘায়েল করে হেলেনা’দের মাধ্যমে ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র জারি রাখা হয়। যাদেরকে বলা হচ্ছে ‘ঘায়েল’ করা হয়, তাঁরাই মূলত সম্রাট-পাপিয়া-হেলেনাদের প্রডাকশন হাউজ। তথাকথিত ঘায়েল হওয়া ব্যক্তিরাই এদেরকে প্রডাক্ট করে বাজারে ছাড়ে। খোঁজ নাই-খবর নাই একজন এমনিতেই সরকারী দলের একটি উপকমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য হয়ে গেলেন!! নেতারা ঘায়েল হয়ে তাদেরকে নেতা বানিয়েছে! তাহলে তো ঘায়েল হওয়ার অপরাধে তাদেরই আর নেতা থাকার কথা নয়। যে ঘায়েল হয় সে তো নেতা হিসাবেই অযোগ্য! কিন্তু এই মন্ত্রী-নেতারা বহাল তবিয়তেই আছেন।

প্রডাক্ট’রা (সম্রাট-শাহেদ-পাপিয়া-হেলেনা-পিয়াসা’রা) ক্ষমতা চর্চা করতে করতে একটা পর্যায়ে বাধনহারা হয়ে যায়। তারা তাদের জন্মদাতাকে ভুলে যায়। মাধ্যম থেকে তারা নিজেরাই উৎস হয়ে উঠতে চায়। নিজেরাই নিজেদেরকে প্রডাকশন হাউজ ভাবতে শুরু করে। শতভাগ আনুগত্য অস্বীকার করে হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণহীন। শুরু হয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত। তখনই ঘটে বিপত্তি! তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়, যে ক্ষমতা চর্চার মাধ্যমে লুটপাট আর গুন্ডামী চালিয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সেটা অব্যহত রাখা অসম্ভব।

হেলেনা-পিয়াসা-মৌ এদের সম্পর্কে অভিযোগ প্রায় কাছাকাছি। র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে,‘তিনি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মানহানি ও সুনাম নষ্ট করেছেন’। রাষ্ট্রীয় এ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সুনাম নষ্ট না করলে জয়যাত্রা টিভি অবৈধ হলেও বন্ধ হতো না, হেলেনা-পিয়াসা’রা গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি হতো না। হয়তো আগামীতে পূর্বের মত প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যোগ দিত!!

হেলেনা’দের বিচার হবে, শাস্তিও হবে। একটা পর্যায়ে যোসেফের মতো পুরো সাজা ভোগ না করে বের হয়েও আসবে।

সম্রাট-শাহেদ-সাবরিনাদের সাজা হয়, কিন্তু এদের পৃষ্ঠপোষকরা ধরাছোয়ার বাইরে থেকে যায়। বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে একটি মামলাও খুঁজে পাওয়া যাবে না এধরনের প্রেক্ষাপটে তাঁরা বিচারের মুখোমুখি বা সাজা হয়েছে।

কিছু অপরাধীকে রাষ্ট্র-সরকার বিচারের মুখোমুখি করে, সাজাও নিশ্চিত করে। কারণ ক্ষমতাতন্ত্র- লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই এটা করতে হয়। কিছু ব্যক্তি যখন বিচারের মুখোমুখি হয় তখন লুটেরা রাষ্ট্রব্যবস্থা আড়াল হয়ে যায়। নাগরিক ব্যক্তির বিচার দাবি করে, বিচারে সন্তুষ্ট হয়। কেউই লুটেরা রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে আঙ্গুল তোলে না। এভাবেই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র টিকে থাকে।

প্রডাকশন হাউজের কাজ নিত্য নতুন প্রডাকশন করা। এই হাউজ যতোদিন টিকে থাকে প্রডাক্টের অভাব হয় না। সম্রাট- এনামুল-রুপন-শাহেদ-পাপিয়া-হেলেনা’রা হারিয়ে যেতে পারে, তাতে কোন সমস্যা তৈরি হয় না। এরকম হাজারো হেলেনা গত ৫০ বছরের বাংলাদেশে প্রডাকশন হয়েছে এবং আগামীতেও হবে। কারণ প্রডাকশন হাউজ টিকে রয়েছে বিনা চ্যালেঞ্জে।

এমনভাবেই একটি কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সরকার জনগণের সামনে একটি সৎ ইমেজ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। বোঝাতে চায়, তারা লুটপাট, দমন-পীড়ন সবকিছুর বিরুদ্ধে। Georgi Dimitrov তাঁর লেখা The Class Character of Fascism’এ বলেছেন, ‘Fascism delivers up the people to be devoured by the most corrupt and venal elements, but comes before them with the demand for “an honest and incorruptible.” Speculating on the profound disillusionment of the masses in bourgeois-democratic governments, fascism hypocritically denounces corruptions.’ (Georgi Dimitrov Selected works, Volume-2, Sofia Press, Sofia, 1972) এভাবেই ফ্যাসিস্ট লুটেরা রাষ্ট্রব্যবস্থা জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র- গুন্ডাতন্ত্র জারি রাখে। আইনি-বেআইনি পদ্ধতিতে বিরুদ্ধ মতকে দমন করে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ার একমাত্র পথ ব্যক্তি অপরাধের সাথে সাথে যে ব্যবস্থাপনা এই অপরাধীর জন্ম দেয় তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করা। জনগণের রাজনীতিকে সামনে এনে সংগঠিত হওয়া।

সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here