এক পা দিয়ে জীবনযুদ্ধ জয় করে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার প্রত্যায় ঝিকরগাছার তামান্না নূরা

0
30

আফজাল হোসেন চাঁদ, ঝিকরগাছা

এক পা দিয়ে জীবনযুদ্ধ জয় করে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার প্রত্যায় ব্যক্ত করেছেন ঝিকরগাছা তামান্না নূরা। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ১১নং বাঁকড়া ইউনিয়নের আলিপুর গ্রামের রওশন আলী ও খাদিজা পারভীন এর মেয়ে। মা-বাবার তিন সন্তানের মধ্যে সে (তামান্না) বড়। ২০০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর তামান্না জন্মগতভাবে দুই হাত ও এক পা বিহীন জন্মগ্রহণ করেন। তবে তার আছে শুধুমাত্র একটি পা। এই একটি পা দিয়েই পিইসি, জেএসসি এবং এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেছে।

ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি অদম্য ইচ্ছাশক্তির কারণে হার মানতে বসেছে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা। কেউ মমতায়, কেউ বা করুণার চোখে তাকায় তার দিকে। তবুও সেই সব তাকানো কে পিছে ফেলে তার দৃষ্টি অনেক সুদূরপ্রসারী। এক পায়ে খুবই সুন্দর ছবি আঁকে। তার স্বপ্নপূরণের মূল হাতিয়ার হল একটি মাত্র পা। তার সাফল্যের পেছনে রয়েছে মা-বাবার একান্ত প্রচেষ্টা, তার নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি।

শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হারমানিয়ে তামান্না প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি ফলাফলে মেধা তালিকায় প্রথম হয়েছে। পাশাপাশি ‘এডাস বৃত্তি পরীক্ষায়’ প্রতিবছরই সে বৃত্তি পেয়েছে। প্রতিবন্ধি মেয়ে জন্ম নেয়ার কথা পেয়ে শুনতে পেয়ে পিতা বৈদেশিক চাকরি ছেড়ে বাড়ি চলে আসে। জন্মের পর থেকে পরিবারে অর্থাভাবের পাশাপাশি সামাজিকভাবে অনেক প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে কখনও তার মা-বাবা ভেঙ্গে পরেনি। সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করেই তার পরিবার (তামান্নার মা খাদিজা পারভীন) তাকে একটি পায়ের উপর ভর করে সব ধরনের শিক্ষা দিতে থাকে। অবশেষে তার পরিবারের শিক্ষা সফল হয়ে ক্রমাগতই সে সাফল্যের দাঁড়প্রান্তে।

তামান্নার মা খাদিজা পারভীন বলেন, প্রথমে তামান্নাকে এলাকার একটি স্কুলে ভর্তি করতে নিয়ে গিয়ে ছিলাম কিন্তু সেই স্কুল কর্তৃপক্ষ তামান্নাকে নিতে চায়নি। তাতে করেও আমরা থেমে যাননি। পায়ের আঙুলের ফাঁকে চক ধরিয়ে দিয়ে অক্ষর লেখা, তারপর কলম ধরিয়ে লেখা আয়ত্ব করে সে। ধীরে ধীরে বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানো, পায়ের আঙুলের ফাঁকে চিরুনী, চামচ দিয়ে খাওয়া, চুল আঁচড়ানো সবই সে আয়ত্ব করে নিয়েছে। তার দক্ষতা সবার নজরে আসে। যখন তাকে ভর্তি করতে চায়নি, তখন এগিয়ে আসে স্থানীয় আজমাইন এডাস স্কুল কর্তৃপক্ষ। তারা খুব সহজেই তামান্নাকে ভর্তি করে নেয়। তারপর থেকে কখনো কোলো, কখনো বা হুইল চেয়ারে করে তামান্নাকে স্কুলে আনা- নেয়া করেন তার বাবা।

তামান্নার বাবা রওশন আলী বলেন, আমি শিক্ষিত হয়েও কোনো চাকরি করিনি আমার মেয়ের জন্য। ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে আমার মনে চ্যালেঞ্জ ফুটে উঠল যে তামান্নাকে অনেক উপরে নিয়ে যেতে হবে। ঠিক সেই সময়ে আমার এলাকার অনেক লোকজন তাদের কথা আমাকে ভীষণ আহত করেছিল। তবে থেমে যাইনি। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর তামান্না প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ওঠে ফার্স্ট হয়ে। সেটা যেন ওর উৎসাহ আরও বাড়িয়ে যায়। এখন তামান্নার স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। আল্লাহ যদি আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। তাহলে আমি চেষ্টা করবো আমার মেয়ের চেষ্টাকে সফল করতে।

তামান্না নূরা বলেন, আমার আশেপাশের লোকজন মাঝে মধ্যেই বলতো, আমি পারব না। কিন্তু আমি কখনো ভাবিনি যে, আমি পরবোনা। আমি আমার সর্ব কাজের ক্ষেত্রে আমার নিজের উপর আত্মবিশ্বাসী। নিজের সর্বোচ্চ ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমি সাফল্যের দাঁড়প্রান্তে হাজির হয়ে দেখিয়ে দিতে চাই। যারা আমাকে নিয়ে ভেবেছিলেন আমি পারবো না, ইনশাআল্লাহ তাদের ধারণা পরিবর্তন করতে আমি বিসিএস ক্যাডার হতে পারবো।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এএসএম জিল্লুর রশিদ বলেন, তামান্না নূরার ইচ্ছা কথা শুনে আমি খুবই আনন্দিত। তবে তার সব সময় চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। নিজের ভুল-ত্রুটি ও দুর্বলতা খুঁজে বের করে অনুশীলন করতে হবে। নিজের দুর্বলতা নিজে যতটা বের করা যায়, অন্যরা ততটা পারেন না। আত্মবিশ্বাস থাকাটা জরুরি। আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে, আমি পারবই। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিসিএস ছাড়াও বিকল্প অপশন প্রস্তুত রাখতে হবে। জীবনের জন্য বিসিএস, বিসিএসের জন্য জীবন নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here