সুইডেনের চিকিৎসাব্যবস্থা

0
33

রহমান মৃধা

প্রাসঙ্গিকভাবে শুরুতেই আমরা একটি বিশেষ রোগের আলোচনা করব। উইলসন রোগ হলো এক ধরনের বিরল প্রকৃতির জিনগত ব্যাধি, যা শরীরে তামার পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে। মূলত মা-বাবার থেকেই সন্তানরা এই রোগ পেয়ে থাকে। এ রোগ তামাকে লিভার থেকে শরীরের অন্যান্য অংশে পরিবহন করতে সহায়তা করে।

এ ছাড়া এটি শরীর থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে তামা শরীরের অতিরিক্ত জমা তামার দিকে পরিচালিত করে। ফলে জমা হওয়া তামাগুলো বিষাক্ত রূপ নেয় এবং শরীরের তি করতে শুরু করে।

যদি বমি বমি ভাব, দুর্বলতা, পেটে অতিরিক্ত জল জমা, পা ফোলা, ফ্যাকাশে ত্বক এবং চুলকানির ভাব থাকে, তাহলে চেক করা যেতে পারে। উইলসন রোগ দেখা দিলে যে লণগুলো দেখা যায়, সেগুলো মূলত মস্তিস্ক এবং লিভারের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। যেমন- পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া, কথা বলতে সমস্যা হওয়া; ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন হয়, যেমন- উদ্বেগ, শ্রবণ ও দেখার েেত্র সমস্যা দেখা দেয়। এসব লণ যদি নিজের মধ্যে অনুভব করেন, তাহলে ডাক্তারের সঙ্গে অবশ্যই যোগাযোগ করবেন। ওপরে বর্ণিত উইলসন রোগের লণগুলোর কোনোরকম উপস্থিতি যদি টের পান, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

যদিও এর সঠিক চিকিৎসা নেই। তবে সময়মতো কিছু থেরাপির মাধ্যমে এর জটিলতা কমিয়ে আনা সম্ভব এবং বেড়ে যাওয়াকে আটকানো যায়। এমন কয়েকটি চিকিৎসা পদ্ধতি হলো :

ওষুধ সেবনের পাশাপাশি উইলসন রোগে আক্রান্ত রোগীদের ভিটামিন-ই পরিপূরক দেওয়া যেতে পারে।

যেসব খাদ্য তালিকায় তামার পরিমাণ কম, সেদিকে নজর রাখতে হবে। কিছু খাবার সম্পর্কে জেনে রাখা ভালো, সেগুলো হলো- যে কোনো দুগ্ধজাত পণ্য (যেমন- দুধ, দই), প্রোটিনজাতীয় খাদ্য, দস্তাসমৃদ্ধ খাবার, যা দেহে তামার শোষণকে বাধা দিতে পারে। তবে সমস্যার তীব্রতা অনুযায়ী পুষ্টি বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে খাদ্য তালিকা তৈরি করে নেওয়া উচিত। রোগীদের যেসব খাবার এড়িয়ে চলা উচিত, সেগুলো হলো মাশরুম, চকলেট, যে কোনো বাদাম, শুস্ক ফল, মাংসের লিভার, শেলফিস ইত্যাদি।

উইলসন রোগের কারণে যদি লিভারের তি মারাত্মক হয়, তাহলে লিভার প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। তবে সম্পূর্ণটাই লিভারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। সময়মতো চিকিৎসা করলে বিভিন্ন অঙ্গের তি হ্রাস করা যেতে পারে। রোগটি যদি যথাযথ সময়ে ধরা পড়ে, তাহলে এর জটিলতাগুলো এড়ানো যায়। যেহেতু এটি একটি বংশগত রোগ, তাই এটি যদি কারও হয়, সেটা সারাজীবন থাকতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং যথাযথ খাদ্য অনুসরণ করলে এই রোগের জটিলতা এড়ানো যায়।

সুইডেনে আমাদের পারিবারিক বন্ধু জর্গেনের ছেলের উইলসন রোগ ধরা পড়ে গত এক বছর আগে। হঠাৎ তার প্রচণ্ড বমি শুরু হয় এবং তৎণাৎ তাকে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নেওয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপ নানা ধরনের চেকআপ করার পর সিদ্ধান্তে আসে, তাকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অপারেশন করতে হবে। পুরো স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সব হাসপাতালে অ্যালার্ম দেয় ৭২ ঘণ্টার মধ্যে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করতে না পারলে রোগীকে বাঁচানো যাবে না। সাত ঘণ্টার মধ্যে প্রথম যে লিভারের সন্ধান পাওয়া যায়, সেটা এসেছে অ্যাম্বুলেন্স হেলিকপ্টারে করে ফিনল্যান্ড থেকে। যিনি রোগীকে অপারেশন করবেন, তিনি লিভার চেক করার পর জানতে পারেন যে এ রোগীর জন্য এ লিভার সুইটেবল না। নতুন করে অ্যালার্ম দেওয়া হয় এবং ২৩ ঘণ্টা পর পরবর্তী লিভারের সন্ধান মেলে ডেনমার্কে, সেটাও টেস্ট করে জানা গেছে এ রোগীর জন্য এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। কী আর করা! নতুন করে অ্যালার্ম দেওয়া হলো, সময় তার গতিতে চলছে জর্গেনের ছেলের জীবন বিনাশের দিকে।

এদিকে ৪৫ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, কী করা! হঠাৎ নতুন খবর পাওয়া গেল, সুইডেনের একটি রোড অ্যাপিডেন্টে একটি অল্প বয়স্ক ছেলে মৃত্যুবরণ করেছে, তার লিভার চেক করে দেখা গেছে জর্গেনের ছেলের জন্য সঠিক। প্রসঙ্গত, পাশ্চাত্যে অনেকেই জীবিত অবস্থায় তাদের শরীরের অর্গান ডোনেট করে থাকে এবং মৃত্যুর পরও যদি কোনো অর্গান কাজে লাগে, তাতে তাদের সম্মতি থাকে তবে নির্ভর করে কীভাবে মৃত্যুবরণ করে তার ওপর। চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ ৭০ ঘণ্টার মাথায় রোগীর অপারেশন করেন এবং অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে সেটা সম্পন্ন করেন।

পুরো ঘটনাটি যখন জর্গেন বর্ণনা করলেন, তখন আমি যেমন মনোযোগী ছিলাম, তেমন ইম্প্রেজড হয়েছি সুইডেনের চিকিৎসাব্যবস্থার কথা জানতে পেরে। অনেক ছোটখাটো চিকিৎসায় ব্যর্থতা থাকলেও জটিল বা ক্রিটিক্যাল সময়ে সত্যি এদের চিকিৎসার পারদর্শিতা প্রশংসা করার মতো। বিষয়টি শেয়ার করলাম শুধু অনুপ্রেরণা জোগাতে বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থা এবং চিকিৎসকদের জন্য, আমার শেয়ার ভ্যালুর কনসেপ্ট থেকে।

জর্গেন ও গুনিলা যখন ঘটনাটির বর্ণনা দিচ্ছিল, আমার অনুভূতিতে বারবার বাংলাদেশের চিকিৎসার কথা মনে পড়ছিল এই ভেবে, কবে হবে এমনটি বাংলাদেশে। আরও মজার ব্যাপার হলো, এতবড় একটি জটিল এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা, যা সম্পন্ন করতে কমপে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা দরকার হয়, অথচ জর্গেন ও গুনিলার খরচ হয়েছে মাত্র দুই হাজার সুইডিশ ক্রোনার (২০ হাজার টাকা মাত্র)।

গণতন্ত্রের দেশে ট্যাক্স পে করা জাতি তার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে কোনো রকম জড়তা ছাড়া, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কবে এমন গণতন্ত্র হবে বাংলাদেশে! হবে, নিশ্চয় হবে; তবে সময় লাগবে।

সুইডেন প্রবাসী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here