করোনা: ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই-ছোট সে তরী!

0
43
আবু নাসের অনীক
করোনা সংক্রমণ আমাদের ভালোভাবেই গ্রাস করেছে। সরকারের বিধিনিষেধ, কঠোর-কঠোরতম-সর্বাত্বক এই শব্দগুলি ব্যববহার করতে করতে এর কার্যকারিতা তলানিতে এসে ঠেকেছে। তথাকথিত লকডাউন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রকৃত অর্থে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আগের ১০ দিনে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি, এখনও হচ্ছে না।
সংক্রমণের পরিস্থিতি পরিসংখ্যানগতভাবে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে। গত ১০ দিন আগের ১০ দিনে (৮-১৭ জুলাই) গড় শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৪৮৪, শনাক্তের হার ৩০%, মৃত্যু ২০৩, মৃত্যুর হার ১.৮০%। গড় টেস্ট হয়েছে ৩৮ হাজার ৫৭৫। সর্বশেষ গত ১০ দিনে (১৮-২৭ জুলাই) গড়ে শনাক্ত হয়েছে ১০ হাজার ২৩৬, শনাক্তের হার ৩০.২০%, মৃত্যু ২১১, মৃত্যু হার ২.০৪%। গড় টেস্ট হয়েছে ৩৪ হাজার ৩১৩ (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর)। অর্থাাৎ শনাক্ত ও মৃত্যু হার দুটিই উর্দ্ধমূখী। আগের ১০ দিনে শনাক্ত বেশি ছিলো, কারণ টেস্ট বেশি ছিলো। লকডাউন পূর্ববর্তী সংক্রমণের হার ও মৃত্যু পরবর্তিতে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভাইরাসটি টিকে থাকে একজনের শরীর থেকে অন্য জনের শরীরে আশ্রয় গ্রহণ করে। মানবদেহে অনুপ্রবেশের একটি নির্দিষ্ট সময় পর সে আর সক্রিয় থাকতে পারে না। যদি সক্রিয় থাকা অবস্থায় তার স্থানান্তর বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব হয়, তাহলেই সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। উচ্চ সংক্রমণ পরিস্থিতিতে এ জন্য লকডাউন করা হয়। যাতে মানুষের চলাচল বন্ধ করে ভাইরাসটির স্থানান্তর আটকে দেওয়া যায়। ফলাফলে সংক্রমণের হার নিম্নমূখী হবে।
সংক্রমণের গত ২০ দিনের তথ্য বলে, লকডাউনে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ কোনটাই ইফেক্টিভলি করা সম্ভব হয়নি। সাধারণ লকডাউন ও মেডিকেল লকডাউন এক বিষয় নয়। আমাদের অতি জ্ঞানী আমলা মহোদয়গণ এটা বুঝতেও ব্যর্থ হয়েছেন। দেশে যেটা চলছে এটা নন মেডিকেল লকডাউন। এর সাথে মেডিকেল কম্পনেন্টের কোন সংযোগ নেই। নন মেডিকেল লকডাউন করে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো অসম্ভব।
এটাই বাস্তবতা যে, আমাদের এখানে হোম আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টাইন এগুলো অসম্ভব একটি বিষয়। লকডাউন যখন করবেন, তখন প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশন-কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করতে হবে (বাংলাদেশে এটি এই মুহুর্তে সবসময়ের জন্য প্রয়োজন)। টেস্ট এভেলেবেল করতে হবে। একইসাথে দ্রুততম সময়ে রেজাল্ট নিশ্চিত করতে হবে। যে স্থানগুলি সংক্রমণের হাব সেগুলি রেস্ট্রিকটেড করতে হবে। সংক্রমণের একটি অতি সংবেদনশীল উৎস হাসপাতালগুলো। বর্তমানে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলো খেয়াল করলেই দেখা যাবে, প্রথমদিকে প্রটোকল মেনটেইন করলেও এখন নূন্যতমভাবেও সেটা মানা হচ্ছে না।
হাসপাতালগুলোতে ওয়ার্ডে, বারান্দার মেঝেতে, এমনকি সামনের খোলা জায়গায় রোগী যেমন আছে তাদের সাথে থাকছে একাধিক এটেনড্যান্ট। অন্য ওয়ার্ডের সাথে করোনা ওয়ার্ডের দৃশ্যত এখন পার্থক্য বোঝা কষ্টকর! রোগীর সাথে যিনি এটেনড্যান্ট থাকছেন তিনি স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই করোনা ওয়ার্ডে অবাধে ঢুকছেন-বের হচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে নিজে যেমন সংক্রমিত হচ্ছেন, অপরকেও সংক্রমিত করছেন। মেডিকেল প্রটোকল অনুসারে হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মী ব্যতীত রোগীর কাছে সার্বক্ষনিক অবস্থান করা যায় না। কিন্তু এখন রোগীর স্বজনরা সার্বক্ষনিক অবস্থান করছেন। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা রোগীর সকল ধরনের সেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হবার কারণেই এমনটি ঘটছে।
এটেনড্যান্টকে কী ধরনের প্রটোকল মেনটেইন করতে হবে তাকে অবগত করা হচ্ছে না। সংক্রমণের আর একটি হাব রোগীর বাসস্থান। সেখানে যথাযথভাবে আইসোলেশন হচ্ছে না, হওয়া সম্ভবও না। ফলাফলে পরিবারের অন্য সদস্যরাও সংক্রমিত হচ্ছে। এধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য প্রয়োজন জেলায় জেলায় ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করা। এই হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশনের ব্যবস্থা করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া। প্রয়োজন বুঝে মূল হাসপাতালে স্থানান্তর করা।
এই ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে সংক্রমণ অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব ছিলো। লকডাউনেরও যথাযথ ফলাফল পাওয়া যেতো। কিন্তু আমরা সে পথে হাটছি না। যারা ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত তারা এসব নিয়ে ভাবছে না। স্বল্প সংখ্যক ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী করোনা রোগীর স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। তাঁরা অত্যাধিক রোগীর চাপ, ক্রমবর্ধমান মৃত্যু সবকিছু মিলিয়ে মানসিক ও শারীরীকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। বর্তমানের চাইতে আরো বেশি রোগীর চাপ বাড়লে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে।
চিকিৎসকরা এই ‘বায়োলজিক্যাল ওয়ার’ এ সম্মুখভাগের যোদ্ধা। তাঁরা সামনে থেকে যুদ্ধটা করছে। এই যোদ্ধারা যদি শারীরীক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয় তবে যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে,‘Keeping all staff protected from chronic stress and poor mental health during this response means that they will have a better capacity to fulfil their roles. Be sure to keep in mind that the current situation will not go away overnight and you should focus on longer-term occupational capacity rather than repeated short-term crisis responses.’(Mental health and psychosocial considerations during the COVID-19 outbreak-WHO).
আমরা কী করছি? চিকিৎসকদের টানা ১৪ দিন ডিউটির পর কোয়ারেন্টাইনের জন্য সরকারী ব্যবস্থা প্রত্যাহার করেছে। কী অমনাবিক! ১৪ দিন টানা দিন-রাত ডিউটির পর দিন প্রতি ২০০০ টাকা ভাতা বরাদ্দ দিয়ে বলা হচ্ছে, তোমার ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে!! করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে ডিউটি করেছে শুনলে হোটেলগুলোও সাধারণভাবে রুম ভাড়া দিতে অপরাগতা প্রকাশ করে। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকলে বলা আছে, চিকিৎসকদের কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করতে হবে।
দেশে এখন পর্যন্ত সরকারী হিসাবে করোনায় মারা গেছে ২০ হাজার ৪৬৭। জুলাই মাসে এ পর্যন্ত (৩০ জুলাই) মারা গেছে ৫ হাজার ৯৬৪। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ২৯% ঘটেছে এই এক মাসে! এর বাইরে আছে হাসপাতালে আসা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু এবং হাসপাতালে না আসা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু, যা কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারের কাছে কোন পরিসংখ্যান নেই। এই সংখ্যা যোগ করলে মৃত্যুর পরিসংখ্যান সরকারী হিসাবের কয়েকগুন বেশি হবে। বগুড়ায় জুলাই মাসের ২৫ দিনে করোনায় মৃত্যু ১২৯ জনের। উপসর্গে মারা গেছেন ২১২ জন (প্র.আ.-২৫/৭/২১)। যা নিশ্চিত মৃত্যুর চাইতে প্রায় দ্বিগুন। সারা দেশেই এমন ঘটছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ বিষয়ে নির্বিকার।
কোভিড-১৯ জনিত কোন মৃত্যু রেকর্ড হবে সে বিষয়ে দি ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড বলছে,‘A positive COVID-19 test result is not required for a death to be registered as COVID-19, In some circumstances, depending on national guidelines, medical practitioners can record COVID-19 death if they think the signs and symptoms point towards this as the understanding causes.’ কিন্তু বাংলাদেশে করোনাজনিত মৃত্যু রেকর্ডে আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুসরণ করা হচ্ছে না। কারণ, তাহলে সাফল্য প্রকাশে বিঘ্ন ঘটবে।
ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট এর গ্রাস থেকে এখন শিশুরাও রক্ষা পাচ্ছে না। আইইডিসিআর জানিয়েছে, ০-১০ বছরের শিশু আক্রান্তের হার ৩%। আর হাজারে মারা যাচ্ছে ৩ জন। ঢাকা মেডিকেলে গড়ে প্রতিদিন ২০ জন ভর্তি হচ্ছে। ঢাকা শিশু হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডে বর্তমানে কোন সিট ফাকা নেই। এটা খুবই এলার্মিং বিষয়। হাসপাতালে ভর্তি মোট রোগীর মধ্যে ৭০% গ্রাম থেকে আসা। যুবকরা আক্রান্ত হচ্ছে, মারাও যাচ্ছে। অর্থাৎ ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট সকলকেই আক্রমণ করছে এবং পরাস্ত করে ফেলছে সহজেই।
হাসপাতালগুলোতে সাধারণ বেড, আইসিইউ কোনটিই এখন আর খালি নেই। ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই- ছোট সে তরী’! হাসপাতালগুলোর সামনে বেড খালি নেই সাইনবোর্ড ঝুলানো। অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট হাসাপতালের বেড ফাকা থাকার তথ্য উল্লেখ থাকছে। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাইনবোর্ড ঝুলছে ‘বেড খালি নেই’। পরিচালক বলছেন, ‘ভর্তি হতে আসা রোগীকে ফেরত পাঠাতে হচ্ছে’। কিন্তু অধিদপ্তরের ৩০ তারিখের প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে জানাচ্ছে ৭৬ টি বেড ফাকা আছে! এ ধরনের অসত্য তথ্য প্রদান শুধুমাত্র অপরাধই না, চরমভাবে অমানবিক। এই অসত্য তথ্য একজন রোগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকা দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহন করা হচ্ছে। অবশ্যই একটি ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু খোদ রাজধানীতে টিকার জন্য নিবন্ধন করার দুই সপ্তাহ পরেও মেসেজ দেওয়া হচ্ছে না। করোনা সংক্রমিত ব্যক্তির দেহে টিকা কাজ করে না। গ্রামগুলিতে এখন অধিকাংশ মানুষের করোনা উপসর্গ বিদ্যমান। এই অবস্থায় টিকা কেন্দ্রগুলিতে যদি র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের ব্যবস্থা রাখা না হয় তবে অনেক ভ্যাকসিন নষ্ট হবার সম্ভবনা তৈরি হবে। অথচ টিকা কেন্দ্রগুলিতে এ ধরনের টেস্টের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রত্যেকটি টিকা কেন্দ্রে আরএ টেস্টের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এতে সামগ্রিকভাবে টেস্ট বৃদ্ধি পাবে এবং ভ্যাকসিন নস্ট হবার সম্ভাবনা থাকবে না।
‘শয্যার আশায় রোগী ও স্বজনদের ছোটাছুটি’, ‘আইসিইউতে মায়ের শয্যায় ছেলে, পরে মায়ের মৃত্যু’, ‘১০ দিনে শনাক্ত ১ লাখ রোগী’, ‘সরকারি আইসিইউ ফাকা মাত্র ৯ টি’, ‘করোনামুক্ত হয়েও ধকল বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা’, ‘কোথায় গেলে একটি সিট পাবো?’। গত ৩ দিনে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ শিরোনাম। যারা করোনাকে ইগনোর করছেন, এই শিরোনামগুলো তৈরি হবার দায় অনেকটা আপনাদেরও। সংবাদগুলি আপনার জীবনে এখনো ঘটেনি তার অর্থ এই নয় যে, আগামীকাল ঘটবে না।
পরিস্থিতি যে জায়গায় পৌছেছে এটার রাশ টেনে ধরতে না পারলে সংবাদগুলো আপনার জীবনে অবশম্ভাবী। শুধু এটুকু বুঝুন,আপনার স্বাস্থ্যবিধি মানায় অবহেলা, অন্য একজনের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। এটা একটা সামাজিক অপরাধ। এই অপরাধ করা থেকে বিরত থাকুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here