সীমান্তে নারী পাচারকারী চক্রের অর্ধশতাধিক ‘সেফ হোম’

0
35

সত্যপাঠ ডেস্ক

পাচারের শিকার হওয়া হাজারের বেশি নারী ভারত থেকে ফিরে এসেছেন। এখনো প্রায় ১০ হাজার নারী ভারতের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছেন। এসব নারীর অধিকাংশকেই নানা ফাঁদে ফেলে সীমান্তের ওপারে নিয়ে যৌনকর্মে বাধ্য করা হয়েছে। এই অপকর্মের জন্য দুই দেশে কয়েক স্তরে গড়ে উঠেছে বিরাট পাচারকারী চক্র। পাচারের পুরো প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে সীমান্তের এপার-ওপারে তৈরি করা হয়েছে অর্ধশতাধিক ‘সেফ হোম’।

ভারতে নারী পাচার নিয়ে প্রায় দুই মাস তদন্ত করে এই চিত্র পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত মে মাসের শেষ দিকে ভারতের বেঙ্গালুরুতে এক বাংলাদেশি তরুণীকে যৌন নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর এ বিষয়ে একযোগে অনুসন্ধান শুরু করে পুলিশ ও র‌্যাব। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পাচারের জন্য সাধারণত উঠতি বয়সী মেয়েদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়ে থাকে। ফেসবুকে বন্ধু হয়ে, আবার অন্য কোনোভাবে পরিচিত হয়ে দীর্ঘদিন যোগাযোগ রেখে সম্পর্ক গড়ে তোলেন পাচারে জড়িত ব্যক্তিরা। পরে ভালো বেতনে সুপারশপ, শপিং মল বা বিউটি পারলারে চাকরির কথা বলে তাঁদের নেওয়া হয় সীমান্তের ওপারে। অনেক তরুণীকে ফাঁদে ফেলা হয় টিকটক ভিডিও তৈরির নামে। একবার সীমান্ত পার করতে পারলেই জিম্মি করা হয় এসব নারীকে। এরপর তাঁদের দিয়ে করানো হয় অবৈধ ব্যবসা।

পাচারের পর ভারত থেকে পালিয়ে আসা একাধিক তরুণী প্রথম আলোকে বলেন, ভারতের সেফ হোমে জিম্মি রেখে তাঁদের ওপর বীভৎস যৌন নির্যাতন চালিয়ে তা ভিডিও ধারণ করা হতো। এ সময় তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া, অবৈধ অভিবাসী হিসেবে পুলিশের ভয় দেখিয়ে এবং তাঁদের স্বজনদের কাছে পাঠানোর কথা বলে যৌনকাজে বাধ্য করা হতো।

এভাবে ভারতে নারী পাচারে বাংলাদেশের ভেতরে সক্রিয় রয়েছে চারটি চক্র। আর সীমান্তের ওপারে কলকাতা ও বেঙ্গালুরুতে রয়েছে তিনটি চক্র। সেখানে ভারতীয়রা নেতৃত্ব দিলেও বাংলাদেশিরাও সম্পৃক্ত রয়েছেন। সব কটি চক্রের সমন্বয়ক হিসেবে এসেছে এক বাংলাদেশির নাম। তিনি নড়াইলের চান মিয়া বিশ্বাস ওরফে সবুজ (৩০)।

বাংলাদেশি তরুণীকে নির্যাতনে জড়িত অভিযোগে বেঙ্গালুরু পুলিশ এ পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে এই সবুজসহ ১১ জন বাংলাদেশি। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একমাত্র ভারতীয় নাগরিক অখিল ওরফে হাকিল বেঙ্গালুরুতে এই চক্রের নেতৃত্ব দেন।

অভিযান তদারকি কর্মকর্তা পুলিশের তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. হাফিজ আল ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, দেশে ও ভারতে অবস্থানরত নারী পাচার চক্রের সদস্যদের নাম পাওয়া গেছে। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

দেশে সক্রিয় আড়াই শ’

ভারতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে পালিয়ে আসা চার তরুণী মানব পাচার দমন প্রতিরোধ ও পর্নোগ্রাফি আইনে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় পৃথক পাঁচটি মামলা করেন। এরপর পুলিশ-র‌্যাব নারী পাচারকারী ধরতে যশোর ও সাতক্ষীরা সীমান্তে অভিযান চালায়। এখন পর্যন্ত এসব মামলায় মোট ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১১ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ছাড়া দুজন সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দেন।

পুলিশের ভাষ্যমতে, ঢাকার মগবাজার এলাকার রিফাদুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয়, যশোরের শার্শার বাসিন্দা আল আমিন হোসেন, বেনাপোলের ইস্রাফিল হোসেন খোকন এবং পুরান ঢাকার নুরজাহান ওরফে নদী আক্তার ওরফে জয়া আক্তার ওরফে জান্নাত ওরফে ইতির নেতৃত্বে চারটি চক্র সক্রিয় ছিল। এঁদের প্রত্যেকের নেতৃত্বে ৫০ জনের বেশি সদস্য রয়েছে। তাঁরা নানা প্রক্রিয়ায় মেয়েদের সংগ্রহ, পাচারের কাজে বিভিন্ন জায়গায় সহযোগী হিসেবে কাজ করেন।

র‌্যাব সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে পাচার হওয়া প্রায় ১০ হাজার নারী অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে র‌্যাব নিশ্চিত হয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে নারী পাচার চক্রের প্রায় ৫০টি সেফ হাউস রয়েছে। যেখানে পাচারের জন্য নারীদের রাখা হয়। দেশের ভেতরে বিভিন্ন পাচারকারী চক্রের দালালসহ প্রায় আড়াই শ সদস্য সক্রিয় রয়েছে। এর বাইরে ভারতে সক্রিয় প্রায় ১০০ জন।

তদন্ত তদারকি কর্মকর্তারা জানান, ঢাকার হাতিরঝিল, মগবাজার, উত্তরা, পূর্বাচলসহ আশপাশের এলাকায় টিকটক ভিডিও তৈরি করতেন রিফাদুল ইসলাম ওরফে হৃদয়। এর মধ্য দিয়ে টিকটক হৃদয় নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। টিকটক ভিডিও বানানোর কথা বলে অসচ্ছল পরিবারের স্বল্পশিক্ষিত তরুণীদের ফাঁদে ফেলে ভারতে পাচার করেছেন।

আরেক চক্রের প্রধান আল আমিন হোসেন যশোরের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ২০১৭ সাল থেকে নারী পাচার করছেন। গত বছর ঈদুল আজহার পর একজনকে পাচারকালে তিনি ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের (বিএসএফ) গুলিতে আহত হন। বেনাপোলে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক পরিচয়ের আড়ালে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের ভারতে পাচার করে আসছিলেন। আর নূরজাহান ওরফে নদী নিজেই ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায় পাচারের শিকার হয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে এখানকার একটি পাচার চক্রের প্রধান হন।

ভারতে সক্রিয় তিন চক্র

পাচার হওয়া তরুণীরা জানান, সীমান্ত পার করার পর তাঁদের প্রথমে কলকাতায় নেওয়া হয়। সেখানে এই চক্রের সেফ হোমে রেখে ভারতের আধার কার্ড (জাতীয় পরিচয়পত্র) তৈরি করে দেওয়া হয়। এরপর উড়োজাহাজ বা ট্রেনে করে তাঁদের বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ে পাঠানো হয়। কলকাতায় এই কাজের নেতৃত্ব দেন বকুল ওরফে খোকন। আর বেঙ্গালুরুতে যাওয়ার পর তাসলিমা ওরফে বিউটি এবং অখিলের নেতৃত্বে দুটি চক্র পুরো বন্দোবস্ত করে।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলেন, খোকনের সহযোগীরা সীমান্তে মেয়েদের গ্রহণ করে তাঁদের সেফ হোমে রাখতেন। দু-তিন দিন রেখে তাঁদের ছবি তুলে সেই ছবি দিয়ে চক্রের পলক ম-ল ভারতের আধার কার্ড (পরিচয়পত্র) বানাতেন। পরে তিনি ওই পরিচয়পত্র দিয়ে উড়োজাহাজ বা ট্রেনের টিকিট কেটে তাতে তুলে দিতেন। এরপর বেঙ্গালুরু বিমানবন্দর বা রেলস্টেশন থেকে মেয়েদের আনার জন্য গাড়ি পাঠাতেন অখিল। পরে ওই সব মেয়েকে চক্রের প্রধান তাসলিমার বেঙ্গালুরুর আনন্দপুর সার্কেলের আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁদের আলাদা করে রাখার জন্য বাসা ভাড়াও নিতেন অখিল। চক্রগুলোর হোতা সবুজ বেঙ্গালুরু, কেরালা ও চেন্নাইয়ের চুক্তিবদ্ধ বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও ম্যাসাজ সেন্টারে পাচার হওয়া মেয়েদের পাঠিয়ে টাকা নিতেন।

যেভাবে সীমান্ত পার

গ্রেপ্তার তিনজনের জবানবন্দিতে মেয়েদের সাতক্ষীরা ও বেনাপোল নিয়ে সীমান্ত পার করার বিবরণ উঠে এসেছে। এ ঘটনায় সাতক্ষীরা সদর উপজেলার একজন ইউপি চেয়ারম্যান ও একজন মেম্বারের নাম এসেছে। মেহেদী হাসান নামে একজন বলেছেন, তাঁর বাড়ি সাতক্ষীরার বৈকারি ইউনিয়নের কালিয়ানি গ্রামে। বাড়ি থেকে ভারতের সীমান্ত ৩০০ গজ। তিনি মেয়েদের নিয়ে ভারতের সীমান্তে লাইনম্যান আকবরের হাতে তুলে দিতেন। তার জন্য তিন হাজার টাকা করে পেতেন।

সীমান্ত পার করার ক্ষেত্রে বিজিবিকে হাত করা হতো বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিজিবির মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়জুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশের তদন্তের সঙ্গে আমরা একমত নই এবং বিষয়টি আমাদের জানা নেই।’

পাচার আসলে কত

মানব পাচার প্রতিরোধে কাজ করা দুই বেসরকারি সংস্থা জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি ও রাইটস যশোরের তথ্যমতে, ভারতে পাচার হওয়া প্রায় ২ হাজার নারীকে গত ১০ বছরে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির তথ্যমতে, ২০০৪ থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত গত ১৭ বছরে দেশ থেকে মানব পাচারের ঘটনায় ৬ হাজার ৭৩৫টি মামলা হয়েছে।

র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ও র‌্যাব ভারতে অবস্থানরত পাচারকারীদের বিষয়ে সেখানের পুলিশকে তথ্য দিচ্ছে। সেই ভিত্তিতে বেঙ্গালুরুতে চক্রের সদস্য ধরাও পড়ছে। আর দেশে গ্রেপ্তার চক্রের সদস্যদের তথ্যের ভিত্তিতে পালিয়ে থাকা চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পাচারের শিকার মেয়েদের ফিরিয়ে আনা চেষ্টা চলছে বলে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল কে এম আজাদ জানিয়েছেন।

সূত্র : প্রথম আলো

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here