বাঘারপাড়ায় প্রতারণার টাকা উদ্ধারে আদালতে মামলা, তদন্তে পিবিআই

0
33

বাঘারপাড়া প্রতিনিধি

যশোরের বাঘারপাড়ায় চাকরি দেওয়ার নামে অর্ধ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে উচ্চ পদে চাকরি দেয়ার নামে কমপক্ষে বিশটা পরিবারকে পথে বসিয়েছে এ প্রতারক চক্র। কেউ জমি, কেউ হালের গরু বিক্রি করে আবার কেউ সমস্ত জমি বন্ধক রেখে প্রতারক চক্রকে টাকা দিয়েছেন।

প্রতারণার শিকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন অসহায় এ পরিবারগুলো। টাকা উদ্ধারের সব চেষ্টায় ব্যার্থ হয়ে গত ১২ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে বাঘারপাড়া আমলী আদালতে তিন জনের নাম উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন প্রতারণার শিকার মহিম রায় নামে এক যুবক। মহিম বাঘারপাড়ার জামদিয়া ইউনিয়নের বাকড়ী গ্রামের গোবিন্দ রায়ের ছেলে।

মামলার অভিযুক্তরা হলেন নড়াইল লোহাগাড়া উপজেলার পাকের চরের কাজী পাড়ার কাজী এমডি নূর ইসলামের ছেলে কাজী নয়ন আহমেদ (জীবন), যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার তেঘরী গ্রামের মোসলেম মোল্লার ছেলে জামির হোসেন এবং একই উপজেলা বাকড়ী গ্রামের রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাসের ছেলে পিযুষ বিশ্বাস। মামলার নম্বর পি-৩৫৪/২১। অভিযুক্ত জামির হোসেনও মহিম রায়ের নামে বাঘারপাড়া থানায় পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ৩ নম্বর অভিযুক্ত পিযুষের এবং বাদী মহিমের বাড়ি একই গ্রামে। তারা একই বাজার বাকড়ীতে ব্যবসা করেন। তাদের মধ্যে বন্ধুত্বও দীর্ঘ দিনের। প্রায়ই পিযুষ মহিমের দোকান থেকে মোবাইলে ৫’শত টাকা রিচার্জ করে মহিমের সামনেই সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে কথা বলতেন। এবং মহিমকে কাস্টমসে উচ্চ পদে চাকরির প্রলোভন দেখাতেন। কিন্তু পিযুষ ঠিকমতো বোঝাতে সক্ষম না হলে ২ নম্বর অভিযুক্ত জামির হোসেন বাকড়ী বাজারে আসেন। তাদের চটকদারী কথায় এক পর্যায়ে রাজী হয়ে যায় মহিম।

চাকরির চুক্তি মাফিক গত ২৫ জুন ২০২০ তারিখে ৫ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা তিন কিস্তিতে পরিাশোধ করেন মহিম রায়। প্রায় দুই মাস বেনাপোলের এক হোটেলে রেখে বেতনও (৪ হাজার টাকা) দেয় মহিমকে। কিন্তু নির্ধারীত সময়েও পোষ্টিং না হওয়ায় সন্দেহ হয় মহিমের। দুর্গা পূজার ছুটিতে গোপনে ঢাকায় যেয়ে হেড অফিসের খোঁজ করে করেন। কিন্তু অফিসের কোন হঁদিস পায় না। এরপর সামাজিকভাবে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আদালতে মামলা করেন। বর্তমানে মামলাটি যশোর পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন) দপ্তরে তদন্তাধীন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, যশোরের অভয়নগর উপজেলার হিদিয়া গ্রামের কৃষ্ণ বিশ্বাসের থেকে ২লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ও একটি প্লাটিনা মটরসাইকেল, নড়াইল সদর উপজেলা বেনাহাটি গ্রামের দেবু বিশ্বাসের থেকে ২ লক্ষ, একই গ্রামের অপূর্ব বিশ্বাসের থেকে ২০ হাজার, যশোরের বাঘারপাড়ার বাকড়ী গ্রামের সুলভ বিশ্বাসের কাছ থেকে ব্লাঙ্ক চেক, শ্রাবণী বিশ্বাসের থেকে ২০ হাজার টাকা সহ এরকম বিশটা পরিবারের থেকে টাকা নেন এই প্রতারক চক্র।

প্রতারণার শিকার কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, ‘আমার গ্রামে পিযুষের আত্মীয় বাড়ি আছে। সেই সূত্রে পরিচয়। প্রায়ই সে (পিযুষ) আমার ছেলে সজীবকে কাস্টমসে চাকরির প্রলোভন দেখাতো। এক পর্যায়ে রাজি হয়ে তার চুক্তিমাফিক টাকা ও মটরসাইকেল পরিশোধ করি। এখন আমি সর্বশান্ত। আমার মটরসাইকেল গ্যারেজ, জমি সব হারিয়ে পরের গ্যারেজে কামলা খাটছি’।

এ বিষয়ে মহিম রায় বলেন, ‘আমাদের দেড় বিঘা জমি ছিলো। সেই জমি ও গরু বিক্রি করে পিযুষকে আমি টাকা পরিশোধ করেছি। যা স্টাম্পে লিখিত আছে। এখন ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে সংসার চালাতে পারছি না। আমার মতো বিভিন্ন এলাকার প্রায় ২০ যুবকের কাছ থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নেয় এ চক্র। উচ্চ বেতনে চাকরির কথা বলে ২০ হাজার থেকে শুরু করে ৫ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে একেকজনের কাছ থেকে। আমি মামলা করার পর অনেকেই প্রতারণার বিষয় নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। আবার অনেককে মুখ খুলতে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে পিযুষ গংরা। তিনি আরও বলেন, পিযুষ ও জামির দালাল হিসাবে মাঠ পর্যায়ে লোক এবং চুক্তির টাকা সংগ্রহ করে। আমি এদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি চাই।

অভিযুক্ত পিযুষ বিশ্বাস বলেন, ‘ষড়যন্ত্রমুলকভাবে আমকে ফাঁসানো হচ্ছে। এর সাথে আমি জড়িত নই’।

প্রতারক জামির হোসেনের মামলার বিষয়ে বাঘারপাড়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা ওসি (তদন্ত) শাহিনুর রহমান বলেন, ‘জামির হোসেন একজন প্রতারক চক্রের সদস্য। এই চক্র বিভিন্ন লোককে চাকরি দেওয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নেয়। এখন জামির মহিমের মামলা থেকে বাঁচার জন্য যে মামলা করে তা তদন্তে ভুয়া প্রমানিত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে’।

মহিমের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (পিবিআই) গৌতম বিশ্বাস বলেন, ‘তদন্ত প্রায় শেষের পথে। খুব তাড়াতাড়ি আদালতে জমা দেওয়া হবে’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here