কাবুল বেলুচিস্তান কাশ্মীরে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হচ্ছে

0
37

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে তালেবানরা। কাবুলসহ আফগান ভূমির পুরোটায় তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে তাতে দেশটির চার দশকের সংঘাতের ইতি ঘটার সম্ভাবনা খুব কম। বরং এরপর তা নতুন মাত্রা পাবে বলে আশঙ্কা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের। তাদের ভাষ্যমতে, এ সংঘাতকে আরো তীব্র করে তুলতে পারে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির জটিল হিসাবনিকাশ। একই কারণে আরো মারাত্মক রূপ নিতে পারে সংঘাত জর্জরিত কাশ্মীরের পরিস্থিতিও। পাকিস্তানেও বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এখনো ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে পাকিস্তানের বৃহত্তম এবং জ্বালানি ও খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলটির সঙ্গেও।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অদূরভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক তত্পরতার সবচেয়ে বড় তিন কেন্দ্র হয়ে উঠতে যাচ্ছে এলাকা তিনটি। একে অন্যের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ছাড়াও এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করে অন্যান্য তত্পরতায়ও নানাভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এলাকাগুলোর ওপর এখন সতর্ক নজর রাখছেন পর্যবেক্ষকরা।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মনোযোগ সবচেয়ে বেশি নিবদ্ধ আফগানিস্তানের ওপর। মার্কিন সৈন্যদের প্রত্যাহার শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশটিতে তালেবানরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চরমপন্থী তালেবানদের ক্ষমতা দখল গোটা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের তোলপাড় ফেলে দিতে পারে।

আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোর একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো নয়। আফগানিস্তানের সঙ্গে এসব দেশের প্রতিটিরই এখন কোনো না কোনো ধরনের স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান ঐতিহ্যগতভাবেই চিরবৈরী। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তানেও দেশ দুটির স্বার্থ পুরোপুরি বিপরীতমুখী। নয়াদিল্লি চাইছে না আফগানিস্তানের দখল পুনরায় তালেবানদের হাতে যাক। কাশ্মীরভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে তালেবানদের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই। সেক্ষেত্রে তালেবানদের কাবুলে ক্ষমতা দখলের ধারাবাহিকতায় ভারতে চরমপন্থীদের উৎপাত আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া কাবুলের বর্তমান সরকারও নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে তালেবানদের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে পাকিস্তান। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বলছেন, তালেবানদের উপস্থিতি পাকিস্তানের জন্য বরাবরই কূটনৈতিকভাবে লাভজনক হিসেবে প্রমাণ হয়েছে। সেক্ষেত্রে তালেবান ও তালেবানবিরোধীদের মধ্যকার লড়াই দুই দেশের ছায়াযুদ্ধে রূপ নেয়ারও বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

উইঘুরের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলের কাছাকাছি সীমান্তে চরমপন্থীদের উপস্থিতি বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে বেইজিংয়ের জন্যও। এছাড়া আফগানিস্তানে এখন জঙ্গি সংগঠন আইএসও সক্রিয়। এ অবস্থায় সংঘাতমুখর আফগান ভূমিতে পরোক্ষভাবে উপস্থিত হতে পারে চীনও। এমনকি মার্কিন সৈন্যদের অনুপস্থিতিতে চীন এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাবক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে খোদ তালেবানরাও। এ অবস্থায় বেইজিংয়ের সঙ্গে কোনো ধরনের শত্রুতায় যেতে চাইছে না তারা। গত সপ্তাহে তালেবানদের এক মুখপাত্র হংকংভিত্তিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে বলেছেন, তালেবানরা চীনকে বন্ধু হিসেবে স্বাগত জানাতে চায়। একই সঙ্গে আফগানিস্তানের পুনর্গঠন নিয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনায়ও বসতে চায় তারা। তবে বেইজিং এ আহ্বানে সাড়া দেবে কিনা, সে বিষয়ে সন্দিহান আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। এছাড়া শিয়াদের ওপর তালেবানদের মারমুখী অবস্থান ময়দানে ইরানকেও সক্রিয় করে তোলার বড় সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলেও কাবুলের বর্তমান সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতার অঙ্গীকার করে রেখেছে। সে হিসেবে ওয়াশিংটন এখনই দৃশ্যপট থেকে পুরোপুরি উধাও হয়ে যাওয়ার বিষয়টি মানতে চাচ্ছেন না পর্যবেক্ষকদের কেউই।

কাবুলের পতনের সম্ভাবনা ও এর পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিদিনই কোনো না কোনো নিবন্ধ প্রকাশ হচ্ছে। এসব নিবন্ধের মূল বক্তব্য মোটামুটি এক, আফগানিস্তানের পরিস্থিতি খুব দ্রুতই আরো ঘোলা রূপ নিতে যাচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সংঘাতের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বিরোধপূর্ণ কাশ্মীরও। অঞ্চলটি নিয়ে ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা দীর্ঘদিনের। এ বৈরিতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্প। এ প্রকল্পের আওতায় পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের গিলগিট-বাল্টিস্তানে বর্তমানে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম চালাচ্ছে বেইজিং ও ইসলামাবাদ। বিষয়টি চিন্তিত করে তুলেছে ভারতকে। কাশ্মীরের এ অংশের ওপর থেকে এখনো দাবি তুলে নেয়নি নয়াদিল্লি। গত বছরের শেষ দিকে গিলগিট-বাল্টিস্তানকে পাকিস্তানের পঞ্চম প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করে ইসলামাবাদ। ওই সময়ে পাকিস্তানের প্রতি ওই অঞ্চলের অধিকার ছেড়ে দেয়ার জন্য জোর আহ্বান জানিয়েছিল ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তবে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি জটিল হয়ে উঠেছে ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে। ২০১৯ সালের অক্টোবরে ভারতীয় সংবিধান থেকে ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদের ঘোষণা দেয় নয়াদিল্লি। এর মধ্য দিয়ে বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত প্রদেশ থেকে রাতারাতি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হয়ে পড়ে জম্মু ও কাশ্মীর। একই সঙ্গে অঞ্চলটির প্রশাসনিক মানচিত্রেও বড় পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়। ওই ঘোষণার পর কাশ্মীরিরা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আসছে। বিষয়টি পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ভারতের উত্তেজনার মাত্রা বাড়িয়েছে। বর্তমানে কাশ্মীরে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে কিছুদিন পর পরই গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে লাদাখে গত বছর থেকেই এক ধরনের মুখোমুখি অবস্থায় রয়েছে ভারত ও চীন। যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে সামনের দিনগুলোয় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা পর্যবেক্ষকদের।

অন্যদিকে স্থানীয়ভাবেও স্বাধীনতার দাবি তোলা কাশ্মীরিদের সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর লড়াইয়ের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহেও ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর এক অভিযানে দুজন আধাসামরিক সেনাসদস্যসহ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। কাশ্মীরের এ পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে চরমপন্থী বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনও। প্রায়ই এলাকাটিতে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তুলছে তারা।

বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি খানিকটা ভিন্ন। সংঘাতপূর্ণ এলাকাটি পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ। যদিও জনসংখ্যা সবচেয়ে কম এ প্রদেশেই। দীর্ঘদিন ধরেই বালুচ জাতীয়তাবাদীদের বড় একটি অংশ স্বাধীনতার দাবিতে ইসলামাবাদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে।

পাকিস্তানের জ্বালানি, শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে ব্যবহূত গ্যাসের বড় একটি অংশ আসে বেলুচিস্তানের সুই অঞ্চল থেকে। যদিও দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার বরাবরই বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে অঞ্চলটিকে অবহেলার চোখে দেখে এসেছে। এখনো সেখানকার ৯০ শতাংশ পরিবারের জন্য সুপেয় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি।
রাষ্ট্রীয় অবহেলার ধারাবাহিকতায় চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ছে এ অঞ্চলের জাতীয়তাবাদীরা। অন্যদিকে তাদের দমনে ইসলামাবাদের অবস্থানও বেশ নিপীড়নমূলক বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তাদের সঙ্গে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘাত জোরালো হয়ে উঠেছে। এ সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে চীনেরও। বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে পাকিস্তানের গাদার বন্দর। এ বন্দরের অবস্থানও বেলুচিস্তানের উপকূলে।

বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লড়াইয়ে ভারতের পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিতে পারছেন না পর্যবেক্ষকদের কেউই। ইসলামাবাদও বরাবরই এ সংঘাতের জন্য দায়ী করেছে প্রতিবেশী ভারতকে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন নিবন্ধেও বলা হয়েছে, বেলুচিস্তানের সংঘাতও পাকিস্তান-চীনের সঙ্গে ভারতের ছায়াযুদ্ধে রূপ নেয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here