করোনা সংক্রমণ রোধে করণীয়

0
18

জাফরুল্লাহ চৌধুরী

প্রথমত. জরিমানা-লাঠিপেটা করে নয়; সব সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, ইমাম, পুরোহিত এবং রাজনীতিক ও এনজিও কর্মীদের সক্রিয় সাহায্যে শতভাগ রিকশা, ভ্যানচালক, নৌকার মাঝি, ফুটপাতের দোকানদার, ক্রেতা-বিক্রেতা ও সব স্তরের জনসাধারণকে বাড়ির বাইরে চলাফেরার সময় সার্বক্ষণিকভাবে সঠিকভাবে মাস্ক পরিধান এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে অভ্যস্ত করাতে হবে।

দ্বিতীয়ত. তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা ও মসজিদে জামাতে অংশ নেয়া যাবে।

তৃতীয়ত, বেবিট্যাক্সিতে দুজন, রিকশায় একজন চড়তে পারে। রিকশাচালকের আয় বৃদ্ধির জন্য সরকারের প্রণোদনা প্রয়োজন।

চতুর্থত, সব গণপরিবহন চালু রাখতে হবে। তবে প্রত্যেক বাসস্ট্যান্ডে ছাত্র ও বয় স্কাউট রেখে নিশ্চিত করতে হবে সবাই মাস্ক পরছে এবং পরিবহনে অর্ধেক সিট খালি থাকছে। সব স্টপেজে ১৫ মিনিট পরপর বাস আসবে এবং থামবে।

পঞ্চমত, ঈদে পরিবার-পরিজনকে দেখার জন্য গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে অবশ্যই করোনা টেস্ট করাতে হবে। টেস্ট নেগেটিভ হলে রিপোর্ট দেখিয়ে বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে বাড়ি যাবেন। পজিটিভ হলে শহরে অবস্থান করে চিকিৎসা নেবেন। রোগ নিয়ে গ্রামে গেলে প্রিয়জন রোগাক্রান্ত হবেন। সরকারের দায়িত্ব তিন শিফটে করোনা টেস্ট করার সুবিধা নিশ্চিত করা। লক্ষ্য হবে প্রতিদিন এক লাখ পরীক্ষা করা, বর্তমানে হচ্ছে দৈনিক মাত্র ৪০ হাজার পরীক্ষা। আরটিপিসিআরের মাধ্যমে প্রতিটি করোনা পরীক্ষায় বেসরকারি খাতে ২ হাজার টাকার বেশি চার্জ করা উচিত নয় এবং সরকারি হাসপাতালে ২০০ টাকায়। এক্ষেত্রে গণস্বাস্থ্য উদ্ভাবিত অ্যান্টিবডি টেস্টের অনুমোদন মিললে জনগণের সুবিধা হতো। পরীক্ষা আরো সম্প্রসারিত করা যেত।

লকডাউন শতভাগ কার্যকর করতে হলে সরকারের করণীয়

এক. লকডাউন শুরুর সাতদিন আগে থেকে প্রত্যেক দরিদ্র পরিবারকে এক মাসের রেশন বিনামূল্যে এনআইডি কার্ড দেখে প্রত্যেকের বাড়িতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। ন্যূনতম তিন মাস নিয়মিত রেশন দেয়ার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে।

এক মাসের রেশন বাবদ ১৫ কেজি চাল, পাঁচ কেজি আটা, পাঁচ কেজি আলু, দুই কেজি ডাল, এক লিটার তেল, ৫০০ গ্রাম মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন ও লবণ প্যাকেট দিতে সর্বোচ্চ ব্যয় হবে ১ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ চার কোটি দরিদ্র পরিবারের জন্য ব্যয় হবে মাসে ৬ হাজার কোটি টাকা।

দুই. লকডাউনকালে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, আইন-শৃঙ্খলা ও মিডিয়া কর্মী ছাড়া অন্য কেউ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন না। সবাইকে গণপরিবহন ব্যবহার করতে হবে, প্রতি ১৫ মিনিট পর পর সারা শহর ও শহরতলিতে ঘূর্ণায়মান গণপরিবহন চালু করা অত্যাবশ্যক। রোগীদের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, কিনিকে আনা-নেয়ার জন্য বিশেষ গণপরিবহন চালু করা অত্যাবশ্যক। চলাচলে কঠোর বিধি নিষেধের সময় দরিদ্র মানুষকে জরিমানা নয়, তাদের সমস্যার সমাধান করতে হবে। তাদের সঙ্গে অভদ্র, কঠোর ব্যবহার অমার্জনীয় অপরাধ। সব রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখতে হবে। তবে ফুটপাতের খাবার দোকান দরিদ্র কর্মজীবীদের জন্য খোলা রাখতে হবে। এসব দোকানে ২০-২৫ টাকায় পেট ভরে খাবার সুবিধে আছে, যা দরিদ্র মানুষের জন্য প্রয়োজন।

তিন. অনতিবিলম্বে ১০ কোটি ডোজ স্পুটনিক-ভি ও সিনোভ্যাক টিকা কিনে জরুরি ভিত্তিতে সব জনগণকে দিতে হবে। টিকা মৃত্যুহার এবং রোগের তীব্রতা কমায়। ফলে চিকিৎসা ব্যয় কমে।

চার. ট্রেন, লঞ্চ ও আন্তঃজেলা বাস চালু করা অত্যাবশ্যক। এতে দরিদ্র মানুষের যাতায়াতে সাশ্রয় হবে। তবে সব যাত্রীকে করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট প্রদর্শন করতে হবে। করোনা পজিটিভ ব্যক্তিদের ভালোভাবে বুঝিয়ে ভ্রমণ থেকে নিবৃত্ত করতে হবে।

পাঁচ. করোনায় মৃত্যুহার কমাতে হলে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে প্রত্যেক জেলা হাসপাতালে ৫-১০ শয্যার সুসজ্জিত আইসিইউ চালু করতে হবে এবং এজন্য ন্যূনতম ১০ জন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর তিন সপ্তাহের বাস্তব প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে ঢাকার হাসপাতালের কোনো উন্নত মানের আইসিইউতে। সঙ্গে প্রতিটি স্থানে অক্সিজেন উৎপাদন ও সরবরাহ প্লান্ট চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। চীনের পরিবর্তে জার্মানি থেকে মেশিন আনলে ব্যয় বাড়বে, তবে মানসম্পন্ন পণ্য পাওয়া যাবে। সময় লাগবে তিন মাস মাত্র।

ছয়. বাংলাদেশ সরকারের উদ্বৃত্ত সঞ্চয় আছে ৪৬ বিলিয়ন ডলার। মাত্র শূন্য দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ট্রিপস চুক্তির স্থায়ী লাইসেন্স পদ্ধতির (কম্পলসরি লাইসেন্স) আওতায় আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশে টিকা উৎপাদন ও বাজারজাত সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। প্রযুক্তি ও রয়েলটিসহ প্রতি ডোজ করোনা ভ্যাকসিন উৎপাদন ও বাজারজাতে খরচ পড়বে অনধিক ২ ডলার।

ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here