যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ত্যাগ রাশিয়ার ‘নিরাপত্তা হুমকি’

0
130

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার রাশিয়ার জন্য নতুন এক মাথাব্যথার জন্ম দিয়েছে। কারণ এর ফলে মধ্য এশিয়ায় শরণার্থীর ঢল, জিহাদি হুমকি এবং এমনকি একটি সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধের সূচনা হতে পারে। এক সাবেক রুশ কূটনীতিক ও দুই বিশ্লেষকের পর্যালোচনায় এমন পরিস্থিতি উঠে এসেছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এখবর জানিয়েছে।

গত সপ্তাহে আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটি ত্যাগ করে মার্কিন সেনারা। দেশটিতে এটিই ছিল তাদের প্রধান ঘাঁটি। বেশিরভাগ ন্যাটো সেনারাও আফগানিস্তান ছেড়েছে। এমন সুযোগে সশস্ত্র গোষ্ঠী তালেবান সরকারিবাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। বেশ কিছু অঞ্চলের দখলও নিয়েছে। কাবুল সরকারের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিয়ে আশঙ্কায় থাকা আফগান নিরাপত্তাবাহিনীর সহস্রাধিক সদস্য তাজিকিস্তানে পালিয়েছে।

এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি রাশিয়ার জন্য উদ্বেগের। কারণ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ এই অঞ্চলকে নিজেদের প্রতিরক্ষার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রান্তভাগ মনে করে মস্কো। এছাড়া উগ্রপন্থী ইসলামিদের প্রভাবও বাড়তে পারে আশঙ্কা রয়েছে।

১৯৭৯-৮৯ পর্যন্ত নিজেদের আফগান যুদ্ধে বিভীষিকা এখনও তাড়িয়ে বেড়ায় মস্কোকে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ স্পষ্ট করে বলেছেন, আফগানিস্তানে সামরিক উপায়ে জড়াতে চায় না রাশিয়া।

কিন্তু তাজিকিস্তানে শরণার্থীদের ঢল মানবিক সংকট তৈরি এবং জিহাদিদের অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে বলে মনে করছেন তিনটি সূত্র। এখানে ১৯৯২ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত ইসলামপন্থীদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধের ইতিহাস রয়েছে। সংকটে পড়তে পারে উজবেকিস্তান বা তুর্কমেনিস্তান।

সাবেক রুশ কূটনীতিক ভ্লাদিমির ফ্রোলোভ বলেন, সবচেয়ে ঝুঁকিতে মনে হয় তাজিকিস্তান। এটি প্রায় ভঙ্গুর রাষ্ট্র এবং প্রেসিডেন্ট এমোমালি রাখমনের ছেলের ক্ষমতা গ্রহণের উত্তরাধিকার রয়েছে। ঝুঁকির জায়গা হলো জিহাদি শক্তিগুলো সমাজের চলমান বিভাজন ও ন্যায়বিচারের ধোঁয়া তুলে গৃহযুদ্ধ পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ নিতে পারে।

বিদেশে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটির অবস্থান আফগান ফ্রন্টিয়ারের কাছে তাজিকিস্তানে। এখানে প্রায় ৬ হাজার সেনা, ট্যাংক, ড্রোন, হেলিকপ্টার আর্মার্ড পারসোনাল ক্যারিয়ার রয়েছে। প্রতিবেশী কিরগিজস্তানে রয়েছে রাশিয়ারি বিমানঘাঁটি।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সোমবার রাখমনকে বলেছেন, তাজিকিস্তান সংকটে পড়লে রাশিয়া সহযোগিতা করবে। রাখমন সীমান্তে ২০ হাজার অতিরিক্ত সেনা পাঠিয়েছেন। রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন সামরিক ব্লকের কাছেও তিনি সহযোগিতা চেয়েছেন।

ফ্রোলভ বলেন, আরেকটি হুমকি হলো তুর্কমেনিস্তান। যেটি প্রকৃতপক্ষে কোনও রাষ্ট্র নয় এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্তের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই তাদের হাতে।

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ একটি থিংক ট্যাংক রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের প্রধান আন্দ্রেই কর্তুনভ বলেন, আমি মনে করি না আফগানিস্তানে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেবে রাশিয়া। অনেক রুশ নাগরিকের কাছে বিষয়টি অনেক বেশি স্পর্শকাতর।

তার মতে, সন্ত্রাসবিরোধী তথ্য বিনিময়, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ও বিশেষ অভিযানসহ সীমান্ত নিরাপত্তা মস্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, আফগানিস্তানকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের ঘাঁটি হিসেবে পরিণত হতে না দেও এবং গুরুত্বপূর্ণ হিরোইন রফতানিকারক হিসেবে দেশটির অবস্থান মুছে দেওয়া মস্কোর লক্ষ্য।

তিনটি সূত্র জানায়, রাষ্ট্রীয়ভাবে তালেবানকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মনে করলেও শান্তি আলোচনায় মস্কোতে তাদের অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে। এগুলো ছিল রাশিয়ার পরিকল্পনা।

বৃহস্পতিবার তালেবানের একটি দল মস্কো সফর করেছে। প্রতিনিধি দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা তাজিকিস্তান সীমান্তে হামলা চালাবে না বা আফগানিস্তানকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে হামলায় ব্যবহার করতে দেবে না।

মস্কোভিত্তিক বিশ্লেষক আর্কাদি দুবনভ জানান, সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলোতে তালেবানের সমালোচনা না করতে সতর্ক ছিল রাশিয়া।

ফ্রোলভ বলেন, তালেবান মূলত আদিবাসী শক্তি যাদের আফগানিস্তানের সীমান্ত অতিক্রম করে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের আগ্রহ নেই, এটিতেই বাজি ধরতে চাইছে মস্কো। এই বাজি হলো তালেবানের সঙ্গে যুদ্ধে না জড়ানো, এমনকি প্রোপাগান্ডা হিসেবেও নয়। যার ফলে তালেবান নিয়ন্ত্রিত কাবুলে নতুন সরকারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

পরিস্থিতি হলো মস্কো আফগানিস্তান থেকে সেন্ট্রাল এশিয়ায় পুনরায় ন্যাটোর মোতায়েন এড়াতে চায়। আফগানিস্তানবিষয়ক রাশিয়ার বিশেষ দূত গত সপ্তাহে বলেছেন, এই প্রত্যাহার প্রক্রিয়া আবারও যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সামরিক অবকাঠামো আফগানিস্তানের প্রতিবেশী, বিশেষ করে সেন্ট্রাল এশিয়ায় পুনরায় মোতায়েনে পরিণত হওয়া উচিত না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here