ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থা অনুকরণীয়

0
35

কায়সুল খান

ইউরোপের অন্যতম উন্নত রাষ্ট্র ফ্রান্স শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে। দেশটি তার বার্ষিক বাজেটের ২১ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করে থাকে। শিক্ষার প্রতি ফ্রান্সের এই মনোযোগ ও গুরুত্বারোপের ফলে দেশটি ৯৯ শতাংশ সাক্ষরতার হার অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ফ্রান্সে শিক্ষার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। ১২১৫ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে ইউনিভার্সিটি অব প্যারিস স্থাপিত হয়, যা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। ১৭৮৯ সালের আগ পর্যন্ত ফ্রান্সে ক্যাথলিক চার্চ কর্তৃক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হতো। কিন্তু ফরাসি বিপ্লবের পর পরিস্থিতি বদলে যায় এবং ১৭৯৯ সালের পর থেকে ফ্রান্সে সবার জন্য শিক্ষার একটি নির্দিষ্ট মান নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয়ভাবে তা পরিচালনা করা শুরু হয়।

ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন ও জটিল। মূলত এখানকার পরীক্ষা পদ্ধতির ভিন্নতা বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে ফ্রান্সের শিক্ষাকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছে। ফ্রান্সের স্কুলগুলো প্রথাগত শিক্ষাকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করে এবং স্কুল পর্যায়ে সংস্কৃতি ও খেলাধুলা চর্চার চেয়ে পাঠ্যবইনির্ভর পড়াশোনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখানে একটি নির্দিষ্ট মানে উন্নীত হওয়ার আগ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের একই শ্রেণিতে একাধিকবার পড়া লাগতে পারে। কোনো শিক্ষার্থীই নির্দিষ্ট মান অর্জন ব্যতীত পরবর্তী শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ পায় না।

শিক্ষা কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা ও দেশের সব নাগরিকের জন্য শিক্ষা নিশ্চিতের জন্য ফ্রান্সকে ভৌগোলিকভাবে ৩১টি শিক্ষা অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। এই অঞ্চলগুলোকে ফরাসি ভাষায় একাডেমিস বলে। এই একাডেমিগুলোর প্রধানকে বলা হয় রেক্টর। ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিয়োগকৃত রেক্টর তার দায়িত্বপ্রাপ্ত অঞ্চলের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার সমস্ত দায়িত্ব পালন করে থাকেন। একাডেমিগুলো আবার ডিপার্টমেন্টে বিভক্ত হয়ে থাকে; যার প্রধানকে বলা হয় ইন্সপেক্টর দ্য একাডেমি। যিনি মূলত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা দেখভালের দায়িত্ব পালন করেন।

ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা। ফ্রান্সে সাধারণত সেপ্টেম্বর মাসে শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় এবং পরবর্তী বছরের জুন মাসে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। যদি কোনো শিক্ষার্থী বার্ষিক পরীক্ষায় পাস করতে ব্যর্থ হয়, তবে সে সেপ্টেম্বরের শুরুতে মানোন্নয়ন পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পায়। ফ্রান্সে দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা স্কুলের সঙ্গে পরিচিত হয়। মূলত ডে-কেয়ার ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলিংয়ের মাধ্যমে শিশুদের সর্বপ্রথম শিক্ষার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। তবে এই শিক্ষা বাধ্যতামূলক নয়। ওই দেশে ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য শিক্ষাগ্রহণ বাধ্যতামূলক। ওই দেশে ছয় বছর বয়সে প্রথম এলিমেন্টারি স্কুল শুরু হয় এবং তা পাঁচ বছর চলমান থাকে। এলিমেন্টারি স্কুলিং আবার দুটি সাইকেলে বিভক্ত। লার্নিং সাইকেল (দুই বছর) এবং কনোলিডেশন (তিন বছর)। এনিমেন্টারি স্কুলে শিক্ষার্থীদের ফরাসি ভাষা, গণিত পড়তে ও লিখতে শেখা, সামাজিক বিজ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান এবং একটি বিদেশি ভাষা শেখানো হয়।

শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক বা এলিমেন্টারি শিক্ষা সমাপ্ত করার পর তাদের মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হয়। ফ্রান্সের মাধ্যমিক শিক্ষা দুটি লেভেলে বিভক্ত। নিম্ন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক। প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ সমাপ্ত করা সব শিক্ষার্থী নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। ফ্রান্সে নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা চার বছর মেয়াদি এবং এটিকে ডিসেন্টিং অর্ডারে শ্রেণিবিন্যাস্ত করা হয়। শিক্ষার্থীরা ষষ্ঠ গ্রেডে ভর্তি হয় এবং তৃতীয় গ্রেডে এসে নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে থাকে। এই পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ফরাসি ভাষা, গণিত, ইতিহাস ও ভূগোল, জীববিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিত্রকলা, প্রকৌশলবিদ্যা, শরীরবিদ্যা এবং সংগীতের ওপর পাঠ দেওয়া হয়। এই শিক্ষা আবার তিনটি ধারায় বিভক্ত। একাডেমিক, টেকনোলজিক্যাল এবং ভোকেশনাল। নিম্ন মাধ্যমিক সমাপ্ত করতে শিক্ষার্থীদের এই তিন ধারার যে কোনো একটিতে নিম্ন মাধ্যমিক সমাপ্তিকরণ পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। যেসব শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় পাস করে, তাদের সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। আর যারা এই পরীক্ষায় পাস করতে ব্যর্থ হয় তাদের স্কুল ত্যাগের একটি সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।

সাধারণ শিক্ষার স্ট্রিমকে ফ্রান্সে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। সাহিত্য ও কলা, অর্থনীতি ও সামাজিক বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞান। এই পর্যায়ে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে জোর দিয়ে থাকে। অন্যদিকে অর্থনীতি ও সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের অর্থনীতি, ইতিহাস, ভূগোল ও গণিতে মনোযোগ দিতে হয়। একইভাবে সাহিত্য ও কলার শিক্ষার্থীরা মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি ভাষা, ইতিহাস ও ভূগোল, চিত্রকলা এবং সাহিত্যের ওপর পড়াশোনা করে থাকে।

ফরাসি শিক্ষার্থীরা ফ্রান্স বাদেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। ফরাসি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার প্রিয় গন্তব্য গ্রেট ব্রিটেন। শতকরা ২০ ভাগ ফরাসি শিক্ষার্থী গ্রেট ব্রিটেনে উচ্চশিক্ষার জন্য যায়।

ফ্রান্সের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর্যায়েও বিভিন্ন ভাগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা দুই বছর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে ইৎবাবঃ ফব ঞবপযহরপরবহ ঝঁঢ়বৎরবঁৎ (বিটিএস) সার্টিফিকেট গ্রহণ করতে পারে। এই পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বিটিএস স্টাডি করতে পারে। বিটিএস মূলত টেকনিক্যাল সার্টিফকেট পরীক্ষা। ১২০ ক্রেডিটের এই ডিগ্রি অর্জনের পর একজন শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে ঢুকতে পারে। ফ্রান্সের উচ্চশিক্ষার আরেকটি ধারা হলো ‘আইইউটি’। মূলত কর্মমুখী এই শিক্ষায় প্রবেশও বেশ প্রতিযোগিতামূলক। তবে এই ধারার সুবিধা হলো এখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক করার পথ খোলা থাকে।

ফ্রান্সে ৮৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এখানে বিদেশ থেকেও শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে আসে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো ফ্রান্সেও বোলগোনা পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই পদ্ধতি অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার তিনটি স্তর রয়েছে। ব্যাচেলর, মাস্টার্স এবং ডক্টরাল এডুকেশন। এখানে তিন বছর মেয়াদি ব্যাচেলর এবং দুই বছর মেয়াদি মাস্টার্স শিক্ষা প্রচলিত। অন্যদিকে ডক্টরাল ডিগ্রির জন্য তিন বছর পড়াশোনা ও গবেষণা করতে হয়। তারপর থিসিস ডিফেন্স করার মাধ্যমে ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করা যায়। ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার পরীক্ষা দিতে হয়। ব্যাচেলর পর্যায়ে এখানে পড়ার গড় টিউশন ফি বার্ষিক দুই হাজার ৭৭০ ইউরো এবং মাস্টার্স পর্যায়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৭৭০ ইউরো।

সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি এখান চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রকৌশলবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ আছে। সাধারণ চিকিৎসা শিক্ষা, মেডিসিন, দন্ত্যশাস্ত্রে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে যারা প্রকৌশলবিদ্যায় অংশগ্রহণ করে তারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় এবং এখানে স্নাতক করা শেষে ডিগ্রি লাভ করে। ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থায় গ্রেডিং হয় ০-২০ এর মধ্যে। ০ এখানে সর্বনিম্ন গ্রেড এবং ২০ সর্বোচ্চ গ্রেড। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাসের গ্রেড ন্যূনতম ৭।

ফ্রান্সে শিক্ষকদের অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হয় এবং তাদের জন্য রয়েছে উচ্চ সম্মানী। এখানকার প্রাথমিক পর্যায়ের একজন শিক্ষক বার্ষিক গড়ে ৪১ হাজার ইউরো সম্মানী পান। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের একজন সহযোগী অধ্যাপক গড়ে বার্ষিক ৭৩ হাজার ইউরো সম্মানী লাভ করেন। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় ফ্রান্সের অবদান অনস্বীকার্য। একটি সুপরিকল্পিত ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের মাধ্যমেই ফরাসিরা জাতিগতভাবে উন্নতির শিখরে উন্নীত হতে সক্ষম হয়েছে। শিক্ষার এই ফরাসি সৌরভ যদি আমরা বাংলাদেশেও নিয়ে আসতে পারি, বাংলাদেশও নিশ্চয় একদিন উন্নত দেশের কাতারে উন্নীত হতে সক্ষম হবে।

প্রবাসী শিক্ষার্থী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here