‘নেই গোয়াল- নেই গরু’ তবুও সরকারি প্রাইমারীর শিক্ষক, চাকুরিজীবী, অন্য জেলার বাসিন্দারাও পেয়েছেন গাভী প্রণোদনা

0
22

চৌগাছা প্রতিনিধি

যশোরের চৌগাছায় গাভী প্রণোদনার তালিকাভুক্ত করতে হয়েছে অর্থের লেনদেন। আর এই লেনদেনে উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা নিজেই জড়িত বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। গরু নেই, এমনকি গোয়ালও নেই। নেই হাসঁ বা মুরগিও। করেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অথবা কলেজে। থাকেন গ্রামের বাইরে এমনকি নিজ জেলার বাইরে তারাও পেয়েছেন প্রণোদনার টাকা।

ইতিমধ্যেই এমন কয়েকটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দপ্তরে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রকৌশলী এনামুল হক এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আস্বস্ত করে বলেন, বেশ কয়েকটি তালিকা পেয়েছি। আমি নিজেই কিছু বাড়ি সরেজমিনে গিয়ে দেখব। প্রয়োজনে কমিটি করে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সুত্রে জানাগেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে (কভিড-১৯) করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি খামারিদের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে সরকার তাদের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করেন। এ লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প (এলডিপিপি) লাইভস্টক ডেইরি অ্যান্ড প্রজেক্টের অধীনে ন্যাচারাল এগ্রিকালচার ট্যামোলজি প্রজেক্টের আওতায় সারাদেশে খামারিদের জন্য ৪৬৮ কোটি টাকা প্রণোদনা বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় চৌগাছা উপজেলায় ১৬’শ ৭ জন খামারিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যাদের তালিকাভুক্তদের মোবাইল একাউন্টে ২৭ জুন থেকে প্রণোদনার টাকা দেওয়া শুরু হয়েছে।

এর আগে প্রণোদনা যাচাই-বাছাই করতে মাঠ পর্যায়ে উপজেলার ১১ ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় ১০/১২ জন লাইভস্টক সার্ভিস প্রোভাইডার, সুপারভাইজার নিয়োগ দেওয়া হয়। এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প কর্মকর্তা প্রভাষ চন্দ্র গোস্বামী। প্রণোদনার তালিকাভুক্ত করতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পাওয়া যাচ্ছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। যাদের গোয়াল নেই, গরু নেই, এমনকি হাঁস-মুরগিও নেই, তাদেরর দেওয়া হয়েছে সরকারি প্রণোদনা।

নারায়নপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন মুকুলের ছেলে ও চাঁদপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মাহাবুবুর রহমান শাকিল অভিযোগ করেন গ্রামের অনেকেই প্রণোদনার টাকা পেয়েছেন যাদের কোন গাভীই নেই। একই পরিবারের বাবা-ছেলে পেয়েছেন। আবার এমন ব্যক্তিরা পেয়েছেন যারা চাকুরী করেন, এলাকায় থাকেন না।

তিনি বলেন, এই তালিকায় নাম দেয়ার জন্য অর্থ-বাণিজ্য হয়েছে। তালিকা করার সময় এটা জানা না গেলেও এখন অনেকেই বলছেন তাদের কাছ থেকে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা প্রভাষ চন্দ্র গোস্বামী তার ৫জন মাঠ কর্মীসহ নিজে সরেজমিনে দেখে তালিকা করেন। তার অভিযোগ প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তার যোগসাজসে প্রণোদনার তালিকায় নাম দিতে অর্থ লেনদেন হয়েছে। মাঠকর্মীর মাধ্যমে এই অর্থ প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা নিজে নিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে চাঁদপাড়া গ্রামের শরিফুল ইসলাম ছোট, তার স্ত্রী রাহিমা খাতুন ও পালিতপুত্র শাহারিয়ার, তার ভাই নাছির উদ্দিন তার ছেলে তুহিন, দুই ভাবী রাজিয়া খাতুন ও রিপাকে দেয়া হয়েছে প্রণোদনার টাকা। এরমধ্যে রিপা চৌগাছার একটি কলেজের কম্পিউটার ডমেনেস্টেটর। তিনি গ্রামে থাকেন না।

এছাড়া গ্রামের সোহরাব হোসেন ও তার ছেলে সোহাগকে দেয়া হয়েছে প্রণোদনা। তাদেরও গাভী নেই। গাভী নেই অথচ প্রণোদনার টাকা পেয়েছেন এমন আরও ব্যক্তিরা হলেন গ্রামের শাহাদৎ হোসেনের ছেলে লিপটন, আজিজুল ইসলাম ও তার ছেলে কামরুল, আবুল হোসেনের স্ত্রী জোহরা খাতুন, আবু বকরের ছেলে শাহিন আলম, আনছার আলীর মেয়ে শারমিন, মহিউদ্দিনের ছেলে আশিকুর রহমান, শুকুজ্জামানের মেয়ে কবিতা খাতুন, ইসরাইলের ছেলে তুহিন হোসেন, জাহাবক্সের ছেলে সদর আলী, নাসির আলীর মেয়ে মেহেরুন্নেছা, চাঁদ আলীর ছেলে আরাফাত কবীর, ইকরামুল হোসেনের স্ত্রীর সুরাইয়া, আলিম হোসেনের স্ত্রী জিনাত অন্তর জ্যাতি, মহাতাপের মেয়ে শাপলা, খাজা আহাম্মদের ছেলে সোহেল রাজনের কোন গাভী না থাকলেও তারা প্রণোদনার টাকা পেয়েছেন।

চাঁদপাড়া গ্রামের ইউপি সদস্য লাল মিয়া বলেন, গ্রামের শরিফুল ইসলাম ছোট, তার স্ত্রী, ছেলে, ভাই ভাতিজা, ভাবীসহ একই পরিবারের ৯জন এই গাভী প্রণোদনার টাকা পেয়েছেন। যাদের কারো কোন গাভীই নেই। এছাড়া কবিতা খাতুুনের বিয়ে হয়েছে মহেশপুর উপজেলায়। তিনি সেখানে থাকেন। শরিফুলের ভাবী রিপা চৌগাছা শহরে থাকেন। তিনি একটি কলেজে চাকুরী করেন। আরাফাত কবীর খুলনায় চাকরী করেন। তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সেখানেই থাকেন। তিনি প্রশ্ন করেন উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা নিজে এসে তালিকা করেছেন। এরপরও গাভী না থাকা ব্যক্তি, উপজেলা বা জেলার বাইরের বাসিন্দারা কিভাবে প্রণোদনার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়? তিনি অভিযোগ করেন প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা চাঁদপাড়া বাজারে এসে এক ব্যক্তির বাড়িতে বসে এই তালিকা করেছেন। তালিকা করতে অনেক অর্থবাণিজ্য হয়েছে।

তিনিও বলেন, আমি এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। লিখিত অভিযোগে লাল মিয়া বলেন, ইউনিয়নের চাঁদপাড়া গ্রামের শরিফুল ইসলামের নেই কোনো গোয়াল ঘর এবং তার স্ত্রী রহিমা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। তাদের দু’জনের নামই রয়েছে সরকারি প্রণোদনার তালিকায়। একই গ্রামের মৃত হাসেম খাঁর ছেলে নাসির উদ্দীন, তোফাজ্জেল হোসেনের স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার সুমি, নাসির উদ্দীনের ছেলে তুহিন, মৃত আব্দুর রশিদের ছেলে লিটন সহ আরো অনেকের গরু নেই, গোয়াল ঘর নেই তার পরেও তালিকায় তাদের নাম রয়েছে। এছাড়া গ্রামে একই পরিবারে সকল সদস্যদের নাম থাকারও অভিযোগ করেন ইউপি সদস্য লাল মিয়া।

উপজেলার স্বরুপদাহ ইউনিয়নের শরিফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিও এমন ২৩ জনের নাম উল্লেখ করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট একটি অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া ফুলসারা, পাশাপোল, সিংহঝুলি, ধুলিয়ানি, চৌগাছা সদর, জগদীশপুর পাতিবিলা, স্বরুপদাহ, নারায়নপুর, সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে পাওয়া গেছে এমন শতশত অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের ইছাপুর গ্রামের আইউব হোসেনের ছেলে আতিয়ার রহমান, হোসেন আলীর ছেলে সবুজ, একই গ্রামের বিপুলের এদের নেই কোনো খামার। নেই কোনো গরুও, অথচ এরাও পেয়েছেন প্রণোদনার টাকা।

একজন খামারীর নাম রয়েছে তালিকায় মেবাইল একাউন্ট হয়েছে অন্য জনের নামে এমন অভিযোগও রয়েছে। ইছাপুর দেওয়ান পাড়া গ্রামের মৃত এরশাদ আলীর ছেলে লিয়াকত আলীর নাম তালিকায় থাকলেও টাকা তুলছেন একই গ্রামের আতিয়ার রহমান।

উপজেলার জামিরা গ্রামের খাইরুল ইসলাম, আফরা গ্রামের রমজান আলী, রামকৃষ্ণপুর গ্রামের প্রকৃত খামারি নুরুজ্জামান, চাঁদপাড়া গ্রামের ভদুমন্ডল, সবুর খাসহ অনেকেই বলেন, আমাদের গাভী থাকলেও আমরা প্রণোদনার টাকা পাইনি। তাদের অভিযোগ তাদের ৫/১০ টি করে গরু থাকলেও করোনাকালে অর্থসংকটে গরুর খাবার ঠিকমত যোগাতে পারছেন না। আবার দাম কম হওয়ায় গরু বিক্রিও করতে পারছেন না। এই সময়ে প্রণোদনার টাকা পেলে গরুগুলোকে ঠিকমত খাওয়াতে পারতেন বলেও তাদের দাবি।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে চৌগাছা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রভাষ চন্দ্র গোস্বামী বলেন, চাঁদপাড়া গ্রামের তালিকা আমি নিজে থেকে করেছি। সেখানে এমন হওয়ার কথানা। যারা তথ্য দিয়েছে তারা ভূল বলেছে। চেয়ারম্যানের ছেলের নাম প্রণোদনার তালিকায় দিতে তিনি আমার কাছে তদবীর করেছিলেন। কিন্তু তার একটি গরু থাকায় তার নাম দেয়া হয়নি। পরে তিনি আমার অগোচরে আমার স্টাফদের মাধ্যমেও তালিকায় অন্তুভুক্তির চেষ্টা করেন। সেটাও হয়নি। একারনে তিনি অভিযোগ করছেন। এছাড়া চাঁদপাড়া গ্রামে দু’টি গ্রুপ আছে। তারা এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে বলে। ওই গ্রামটি বড় গ্রাম। গ্রামটিতে গত বছর প্রণোদনার টাকা কেউ না পাওয়ায় এবছর গ্রামটিতে বেশি করে দেয়া হয়েছে। যেন প্রকৃত খামারীরা বাদ পড়েছে, অথচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকাও রয়েছে তালিকায়। প্রশ্নের উত্তরর তিনি বলেন, দুই একটা ভুল হতে পারে। তবে বিষয়টি খোজ নিয়ে দেখার কথা জানান তিনি।

তবে প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তার দাবি চ্যালেঞ্জ করে মাহবুবুর রহমান শাকিল বলেন, ইউএনও স্যার নিজে আসতে চেয়েছেন। আমি আপনার মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি। প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তাও আসুন। এসে তারা দেখুন। আমার নিজের দুটি গাভী রয়েছে। এবং দুটি গাভীই নিয়মিত দুধ দিচ্ছে। তিনি মিথ্যে বলে নিজের অপকর্ম ঢাকতে চাচ্ছেন।

চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার এনামুল হক বলেন, কয়েকটি তালিকা পেয়েছি। করোনাকালিন বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন ছাড়াও নানা কাজে ব্যস্ততার মধ্য দিয়েও আমি নিজে কয়েকটি বাড়িতে গিয়ে দেখবো। এরপর উনাকে বলবো। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে তদন্ত কমিটি করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here