সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে লাগাম আসছে !

0
20

সত্যপাঠ ডেস্ক

দেশবিরোধী অপপ্রচার, গুজব ও বিদ্বেষ ছড়ানো, যৌন হয়রানির মতো নানা অপরাধেও ব্যবহৃত হচ্ছে ফেসবুক, ইউটিউব, বিগো, লাইকি, পাবজি, টিকটকের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। মতপ্রকাশে উদার অনেক দেশও এসব মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে আইন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে কোনো আইন না থাকায় দিন দিন এর অপব্যবহার বাড়ছেই। হুন্ডি, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন বুস্টিংয়ের নামে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। স্থানীয় কার্যালয় না থাকায় এসব প্ল্যাটফর্ম সরকারি সংস্থাগুলোর ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। প্রচলিত আইনেও তাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের ট্যাক্স ও অন্যান্য রাজস্ব আদায় করা যাচ্ছে না। উল্টো তারা হুন্ডিসহ আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অর্থপাচার জারি রেখেছে।

শধষবৎশধহঃযড়এতে একদিকে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারও হারাচ্ছে বড় অঙ্কের রাজস্ব। তাই কঠোর আইন করে এসব মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করার পথে হাঁটছে সরকার। বুস্টিং বিজ্ঞাপনের নামে বৈশ্বিক এসব প্রযুক্তি কম্পানির অর্থপাচার রোধে স্থানীয় কার্যালয়ে বাধ্য করতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ আসছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : বিভিন্ন ওয়েবসাইট, সোশ্যাল মিডিয়া এবং নানা রকম ইউআরএল (ইউনিফর্ম রিসোর্স লোকেটর) ফিল্টারিং করতে আইআইজিতে (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) কনটেন্ট ফিল্টারিং ডিভাইসের মাধ্যমে তদারকির সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপারে তাগাদা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে আইন করে প্রতিটি সোশ্যাল মিডিয়া বাংলাদেশে নিবন্ধন করার উদ্যোগ এবং নিবন্ধিত সোশ্যাল মিডিয়াকে বাংলাদেশের ইনফরমেশন, ডাটা অবশ্যই বাংলাদেশের সার্ভারে রাখার ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিবন্ধিত হলে ফেসবুক, ইউটিউবসহ অন্য সামাজিক মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের জন্য যে বুস্টিং হয়, সেখান থেকে বড় অঙ্কের ভ্যাট ও কর পাবে সরকার।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, যদি কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে কারোর মানহানি হয় তাহলে সেটার দায়ভার সংশ্লিষ্ট সোশ্যাল মিডিয়াকে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে আইনি সুরক্ষা। সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খুলতে অবশ্যই পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ছাত্রদের ছবিসহ পরিচয়পত্র ছাড়াও মোবাইল নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কোনো অ্যাকাউন্ট/পেজ থেকে বাংলাদেশের পরিপন্থী অথবা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হলে তা বন্ধের জন্য সরকার সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে পদক্ষেপ নিতে পারবে।

আইনি পথে অনেক দেশ : ফেসবুকসহ ইন্টারনেট প্রযুক্তিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা যে দেশে ব্যবসা করে সেখানে যথাযথভাবে কর পরিশোধ করে না। এমনকি রাষ্ট্রবিরোধী ও স্পর্শকাতর নানা বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার কনটেন্ট সরাতে বললেও তা তারা কানে তুলছে না। সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, তুরস্ক, কানাডা, রাশিয়ার মতো দেশের আদলে কঠোর আইন প্রণয়নের কাজ বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপের নতুন প্রাইভেসি নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ভারত সরকার। তথ্যপাচার ঠেকানো এবং দেশীয় মাধ্যমের প্রসারে ফেসবুক, গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে চীন। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পর ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে ফ্রান্স ফেসবুকসহ ইন্টারনেট জায়ান্টগুলোর ওপর ডিজিটাল সেবা করারোপ করে আইন পাস করে।

এরই মধ্যে আইন করে ফেসবুককে নিউজ কনটেন্টের মূল্য পরিশোধে বাধ্য করেছে অস্ট্রেলিয়া। নিউজ কনটেন্টের জন্য ফেসবুককে মূল্য পরিশোধে বাধ্য করছে কানাডাও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে রাশিয়ায় অফিস খোলার বাধ্যবাধকতা রেখে নতুন একটি আইনের অনুমোদন দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ব্যক্তিগত তথ্য আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে সম্প্রতি গুগলের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে দেশটি। নতুন আইন অনুযায়ী রাশিয়ায় কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেট কর্মকা- চালাতে চাইলে তাদের অবশ্যই শাখা কিংবা অফিস খুলতে হবে।

আইন নিয়ে যে যা বলছেন : সরকারের পাশাপাশি দেশের উচ্চ আদালতও এই বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ব্যবস্থা নেওয়ার পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ডিজিটাল নেটওয়ার্কে কোনো গুজব, অপপ্রচার বা মানহানিকর কিছু করলে এর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা যায়? কিন্তু ওই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই ? তাই ধারণা করছি, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে চায় সরকার ? সেই ধরনের আইন করা যেতে পারে ?’

জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘শুধু কর ফাঁকিই নয়, দেশে ধর্মান্ধতা, জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ইত্যাদি নিয়ে এসব মাধ্যমে জঘন্য প্রচারণা চালানো হয়। আমাদের জন্য মহাবিপজ্জনক কনটেন্ট সরাতে অনুরোধ করলেও ওরা সেগুলো সরায় না। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে; কিন্তু সেখানে শাস্তির মাত্রা অনেকটাই কম।’ তিনি বলেন, ‘এ ধরনের বৈশ্বিক ছোটখাটো শাস্তি দিয়ে এমন সব প্রতিষ্ঠানকে বাগে আনা যাবে না। এদের ভাতে মারতে হবে, পানিতে মারতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদের তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টা আইন প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন। একজন আইন উপদেষ্টা নিয়োগও দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আইসিটি বিভাগ দেখছে ? তারাই আইনের খসড়া করছে।’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক বলেন, ‘দেশ-বিদেশের বিভিন্ন চক্র সরকারবিরোধী অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে। বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে গুজব ও উসকানি ছড়ানো হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দেশের ভেতর অবস্থানরত চক্রান্তকারীদের বিচারের মুখোমুখি করার সুযোগ থাকে। কিন্তু ডিজিটাল অপরাধের কোনো সীমারেখা নেই। নতুন আইন পাস হলে বিদেশে বসে গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদেরও বিচারের আওতায় আনার সুযোগ থাকছে। বিশেষ করে ইউটিউব এবং ফেসবুক যাতে বাংলাদেশে তাদের সার্ভার ডাটা সেন্টার স্থাপন করে, এ জন্য নতুন আইন প্রণয়নের চেষ্টা চলছে।’

প্রতিমন্ত্রী পলক আরো বলেন, ‘আমরা ডাটা প্রটেকশন আইনের খসড়া করেছি। সেটি এখন যাচাই-বাছাই চলছে। এটি হলে ফেসবুক-গুগলসহ যারা ব্যাংকিং সলিউশন দিচ্ছে, তারা বাংলাদেশের মাটিতে তথ্যগুলো রাখতে বাধ্য হবে। এসব প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো ব্যক্তিদেরও বিচারের আওতায় আনা সহজ হবে।’

রাজস্ব ফাঁকি নিয়ে কঠোর অবস্থানে এনবিআর : ফেসবুক, গুগলে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন এবং সাবস্ক্রিপশন প্ল্যাটফর্মের অবৈধ চার্জিংয়ের ফাঁক গলে দেশ থেকে বছরে হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। ২০২০ সালে ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২’ আইনে সংযোজন করে ফেসবুক, ইউটিউব, গুগলসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে আলাদা বিআইএন নিতে বাধ্য করা হয়। এর পরও ফাঁকি দেওয়া থামেনি। ফেসবুকের বাংলাদেশ এজেন্ট এইচটিটিপুল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) যথাসময়ে ভ্যাট পরিশোধ না করায় ভ্যাট গোয়েন্দা বিভাগ এইচটিটিপুলের বিরুদ্ধে ভ্যাট আইনে মামলা করেছিল। পরে ফেসবুক, ইউটিউবসহ কয়েকটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভ্যাট নিবন্ধন নিতে বাধ্য হয়।

ভ্যাট নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে দুই হাজারের বেশি বিদেশি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নামি-দামি এসব প্রতিষ্ঠান হিসাবমতো রাজস্ব পরিশোধ করলে এনবিআরের কোষাগারে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি জমা হতো।

ভ্যাট নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, ‘বিদেশি ব্যবসাসফল প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে ব্যবসা করতে হলে অবশ্যই নিয়মিত ভ্যাট দিতে হবে। এ জন্য অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন করা খুবই জরুরি। এসব প্রতিষ্ঠান অনেক দেশে আইন মেনে রাজস্ব পরিশোধ করে ব্যবসা করছে, বাংলাদেশে তারা একইভাবে ব্যবসা করবে বলে আশা করছি।’

তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাব্বির বলেন, ‘সমাজের মানুষের চরিত্রের যে অবনতি তার চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। এর মাধ্যমে ভালো কাজের পাশাপাশি খারাপ কাজও খুব দ্রুত করা যাচ্ছে। যারা এসব অপকর্মে যুক্ত, তাদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

সূত্র : কালের কণ্ঠ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here