কোচিং বাণিজ্যে মেতেছে মণিরামপুরে অর্ধশতাধিক শিক্ষক

0
64

মিজানুর রহমান, মণিরামপুর

রম-রমা চলছে মণিরামপুরে কোচিং বানিজ্য। সকাল হলেই পৌর শহরের রাস্তায় যেন মিলন মেলা শিক্ষার্থীদের। পিঠে বই বহনের ব্যাগ নিয়েই বের হচ্ছে বাড়ি থেকে। এসব শিক্ষার্থীরা সবই কোচিং সেন্টার মুখি। করোনাকালীন সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ ছুটির সুযোগে এক শ্রেণীর শিক্ষক কোচিং বানিজ্য করে কাড়ি কাড়ি টাকা কামিয়েছেন।

মণিরামপুর পৌর শহরের এ বানিজ্য করছেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষক। এদের মধ্যে ইংরেজির মণিরামপুর সরকারি কলেজের মোস্তাফিজুর রহমান, মনোহরপুর দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক ইনামুল হক, মণিরামপুর সরকারি কলেজের শিক্ষক মশিয়ার রহমান, মণিরামপুর ফাযিল মাদ্রাসার শিক্ষক উত্তম মন্ডল, রোহিতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিদ্যুৎ সরকার, নেংগুড়া ফাযিল মাদ্রাসার শিক্ষক মোকলেছুর রহমান, মণিরামপুর ফাযিল মাদ্রাসার শিক্ষক সঞ্জয় সরকার, ঢাকুরিয়া কলেজের শিক্ষক শাহিন আলম, তালা সুভাশিনী কলেজের শিক্ষক গৌতম রায়, মণিরামপুর মহিলা কলেজের শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল ফারুক এবং বালিয়াডাঙ্গা কলেজের শিক্ষক নুরুন্নবী।

এসব শিক্ষকরা করোনাকালীন সময়ে দীর্ঘ ১বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটির সুযোগে কোচিং বানিজ্য করে কাড়ি কাড়ি টাকা কামায় করছেন। এ ব্যাপারে যথাযথ আইন থাকলেও প্রয়োগ হয়নি আজও।

খোঁজ খবর নিয়ে গেছে, মোস্তাফিজুর রহমান মণিরামপুর সরকারি কলেজের শিক্ষক তিনি। দূর্গাপুর গ্রামে নিজ বাড়িতেই ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থী পড়ান। শতাধিক শিক্ষার্থী প্রতিদিন তার কাছে বিভিন্ন শ্রেণী ইংরেজির বিষয়ে পড়তে আসেন। মণিরামপুর মহিলা কলেজের শিক্ষক মাহামুদুল ইমরান বাবুল, পৌর শহরের গরুহাটা রোড়ের পাশেই নিজ বাড়িতে যেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। সকাল থেকে রাত অবদি তার বাড়িতে শিক্ষার্থীদের পদাচারণা রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ মাহমুদুল ইমরানের কাছে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী ইংরেজি বিষয়ে পড়েন। তবে গত ঈদুল ফিতরের পর থেকে মাহমুদুল ইমরান পড়াচ্ছেন না বলে জানা গেছে। একই কলেজের শিক্ষক কামরুজ্জামান। পৌর শহরের তাহেরপুর গ্রামেই নিজ বাড়িতে শিক্ষার্থীদের মিলন মেলা চলে। সকাল থেকে দিনের অধিকাংশ সময় শিক্ষর্থীদের পদচারনায় মুখর থাকে বাড়িতে।

লাউড়ি মাদ্রাসার শিক্ষক ইনামুল কবির, মুক্তেশ্বরী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক গৌতম মন্ডল, মনোহরপুর দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক ইনামুল হক, সুবলকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মহেন মন্ডল, গোপালপুর কলেজিয়েটের শিক্ষক কামরুজ্জামান, মণিরামপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক পিয়াস, চন্ডিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুল আলম এবং ভরতপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জসিম উদ্দীনও পিছিয়ে নেই।

এসব শিক্ষক গণ ইংরেজি বিষয়ে পড়ান, প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসিক নেন ৮’শ থেকে ১হাজার টাকা করে। এসব শিক্ষকদের কেউ কেউ ১’শ থেকে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীকে পড়ান। গণিত বিষয়ে পড়াচ্ছেন মণিরামপুর সরকারি কলেজের শিক্ষক মশিয়ার রহমান, মহিলা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক আব্দুস সবুর, ফজলুর রহমান, রোহিতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিদ্যুৎ সরকার, মণিরামপুর সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিমান দাস, ফাযিল মাদ্রাসার শিক্ষক উত্তম মন্ডল।

পদার্থ বিষয়ে পড়াচ্ছেন নেংগুড়াহাট ফাযিল মাদ্রাসার শিক্ষক মোখলেছুর রহমান, মণিরামপুর ফাযিল মাদ্রাসার শিক্ষক সঞ্জয় সরকার। রসায়ন বিষয়ে পড়াচ্ছেন ঢাকুরিয়া কলেজের শিক্ষক শাহিন আলম, মণিরামপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক নমিতা মন্ডল ও বাবুল আক্তার এবং মণিরামপুর ফাযিল মাদ্রাসার শিক্ষক সুকুমার রায়। জীব বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াচ্ছেন তালা সুভাশিনী কলেজের শিক্ষক গৌতম রায়, মুক্তেশরী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক বিজন মন্ডল। আইসিটি বিষয়ে পড়াচ্ছেন মণিরামপুর ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল ফারুক মাহমুদ, বিএম আব্দুল হালিম, তালা সুভাশিনী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক পিন্টু। হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াচ্ছেন বালিয়াডাঙ্গা কলেজের শিক্ষক নুরুন্নবী ও অশোক চন্দ্র চন্দ। এবং বাংলা বিষয়ে পড়াচ্ছেন মণিরামপুর সরকারি কলেজের শিক্ষক আহাদ আলী এবং হাফিজুর রহমান।

খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, মণিরামপুর পৌরসভাধীন তাহেরপুর, মনোহরপুর, দূর্গাপুর, হাকোবা এবং গাংড়া একাংশে ভগবান পাড়ায় বাসা বাড়িতে কোচিং সেন্টার বানিয়ে এসব শিক্ষকরা মাসের পর মাস কোচিং বানিজ্য করে লক্ষ লক্ষ টাকা কামাচ্ছেন।

এসব বিষয়ে জড়িত শিক্ষকদের অনেকের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাদের অনেকেই দাবী করেন, আপাতত পড়ানো সীমিত করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেছেন বর্তমানে পড়ানো স্থগিত রাখা হয়েছে।

এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রশাসন জানলেও প্রতিকারের জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন এমন নজির নেই। উচ্চ আদালতের রিট পিটিশন নং- ৭৩৬৬/২০১১ এর আদেশ বলে শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে ২০ জুন ২০১২, স্মারক নং- শিম/শাঃ১১/৩-৯/২০১১/৪০১ পত্রে শিক্ষকদের কোচিং বানিজ্য ঠেকাতে এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

প্রজ্ঞাপনে ৭নং কলামে বলা হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটি কোচিং বানিজ্য রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এছাড়া পরিপত্রে ১৪নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোচিং বানিজ্যে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সেই শিক্ষকের এমপিও বাতিল অথবা এমপিও বন্ধ করার ক্ষমতা রাখে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে জারিকৃত পরিপত্রে এমন আদেশ থাকলেও মণিরামপুর উপজেলা প্রশাসন এসব কোচিং বানিজ্য ঠেকাতে আজওবদি কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তার নজির নেই।

এ ব্যাপারে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বিকাশ চন্দ্র সরকার জানান, বহুবার চেষ্টা করা হয়েছে কোচিং বানিজ্য ঠেকাতে। তিনি আরো বলেন, করোনা এবং লকডাউনের কারণে অফিস ঠিকমত করা সম্ভব হয় না। এছাড়াও অভিযোগ না পাওয়ার ফলে চুরি করে এমন কর্মকান্ডে জড়িত থাকতে পারে। তবে খুব শিঘ্রই খোঁজ খবর নিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here