বঙ্গে পারুল সন্ধান ও পুষ্পপ্রেমিকগণ

0
46
আমিরুল আলম খান

আমিরুল আলম খান

বাঙলায় পারুল অনুসন্ধান কি শেষ হল? পারুল অনুসন্ধানে প্রবাদপ্রতিম তিন মহাপ্রাজ্ঞই এখন লোকান্তরিত। প্রথমে সর্বপ্রাজ্ঞ ওয়াহিদুল হক (১৯৩৩-২০০৭), পরে সেলুলয়েডে নিসর্গশিল্পী, বিজ্ঞানী নওয়াজেশ আহমদ (১৯৩৫-২০০৯) সর্বশেষ বৃক্ষসখা কবি ও উদ্ভিদশাস্ত্রী দ্বিজেন শর্মা (১৯২৯-২০১৭)। আরও চলে গেছেন ম. মীজানুর রহমান (১৯৩১-২০০৯), পণ্ডিত রসরাজ আবদুশ শাকুর (১৯৪১-২০১৩)। আলো হাতে তাঁরা ছিলেন আঁধারের যাত্রী। বাংলার নিসর্গকে তারা আমাদের নতুন করে চিনিয়েছেন, শিখিয়েছেন নিসর্গ পাঠের মন্ত্র। শিল্প ও বিজ্ঞানের যে নিটোল সংশ্লেষ, যে অচ্ছেদ্য বন্ধন তাই তাঁরা আমাদের উপহার দিয়েছেন। বিজ্ঞান যেন অর্গলমুক্ত হয়ে, অচলায়তন ছিন্ন করে আমাদের নিঃস্ব রিক্ত হৃদয়ে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। বিজ্ঞানের কঠিন পাঠ হয়ে উঠেছে সংগীতের সুর মুর্ছনা।

সুপ্রাচীন কালে অনার্য ভারতেই বৃক্ষ বন্দনার সূচনা। প্রকৃতপক্ষে অনার্য ভারতে ছিল একান্ত আরণ্যক জীবন। বৃক্ষই তার কেন্দ্রবিন্দু। রবীন্দ্রনাথ বন্দনা করেছেন,

“অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনছিলে সূর্যের আহবান
প্রাণের প্রথম জাগরণে, তুমি বৃক্ষ, আদি প্রাণ;
ঊর্ধশীর্ষে উচ্চারিলে আলোকের প্রথম বন্দনা
ছন্দোহীন পাষাণের বক্ষ ’পরে; আনিলে বেদনা
নিঃসাড়, নিষ্ঠুর বনস্থলে।”

কালিদাসে আমরা প্রকৃতি বন্দনার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করি। আমাদের পুরাণ, উপকথায় প্রকৃতি সাহিত্য প্রোজ্জ্বল। শতবর্ষ পূর্বে এক বাঙালি পণ্ডিত জগদীশচন্দ্র বসু বৃক্ষ যে প্রাণময় তা বিশ্বসভায় প্রথম উপস্থাপন ও প্রমাণ করে প্রকৃতি জগতকে নতুন মাত্রা দান করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দসহ এ যুগের নিসর্গসখাগণ শিল্প ও বিজ্ঞানের এক অভিনব বিন্যাসে বাঙালি মননে সংস্থাপন করেছেন অশ্রুতপূর্ব সংগীত লহরী। বৃক্ষ অন্তঃপ্রাণ এইসব বিদ্যোৎজনের তিরোধানে আজ রিক্ত নিঃস্ব বাংলায় এখন শুধুই ক্রন্দনরোল।

এঁদের প্রায় সকলেই বাংলায় তিনটি ফুলের একদা প্রবল উপস্থিতি কীভাবে বিলুপ্ত বা প্রায় বিলুপ্ত হলো তাই নিয়ে হাহাকার করেছেন। সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণায় কুঠারাঘাত করে বলেছেন, মাধবী অচেনা হয়েছে, বিলুপ্তির প্রায় কাছাকাছি তার অবস্থান। মধুমঞ্জরীকে সারা বাংলায় কারা যেন মাধবী নামে ভুল পরিচিত করেছে। পারুল আছে, কি নেই সেই বিতর্কের সমাধান প্রায় অর্ধ শতাব্দী যাবত অনবসিত; আর সুনির্দিষ্ট উচ্চারণে দ্বিজেন শর্মা জানিয়েছন,‘বঙ্গে পিয়াল নেই’!

বাংলার একদা অতি প্রিয় ফুল ছিল পারুল। আজও পারুল আমাদের সাহিত্যে, সংগীতে, নামাকরণে ব্যাপকভাবে উপস্থিত। ১৯৭০ দশকে সেই প্রিয় পারুল বাংলায় আছে, না হারিয়ে গেছে সে প্রশ্ন প্রথম উত্থাপন করেছিলেন সর্ববিষয়ে উৎসাহী ওয়াহিদুল হক, দৈনিক সংবাদ-এ, তাঁর নিয়মিত কলাম ‘অথঃ পুষ্পকথা’য় (প্রবন্ধটি পরে তাঁর চেতনাধারায় এসো গ্রন্থে সংকলিত হয়)। মস্কো থেকে তার সূত্র ধরে সংবাদ-এ প্রবন্ধ লিখে দ্বিজেন শর্মা বাংলায় পারুল অনুসন্ধানে নতুন মাত্রা যোগ করেন। বাংলার নিসর্গবিষয়ক তাঁর মহাকাব্যিক গ্রন্থ শ্যামলী নিসর্গ। পারুল প্রসঙ্গটি দ্বিজেন শর্মা বারবার উল্লেখ করেছেন তাঁর নানা গ্রন্থে। বিপ্রদাস বড়ুয়া তার বিভিন্ন রচনায় অবশ্য দাবি করেন, পারুল আছে এই বাংলায়। তিনি কোথায় কোথায় পারুল পেয়েছেন তারও বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু তার বর্ণনা বিতর্ক উস্কে দিলেও সমাধান মেলে নি। সে অনুসন্ধানে আমরাও কিছু অর্বাচীন যুক্ত হয়ে পড়ি।

মুখ্যত ওয়াহিদুল হক এবং দ্বিজেন শর্মাই আমাকে পারুল অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেন। এ বিষয়ে আমার দীর্ঘ অনুসন্ধানী একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ভারত বিচিত্রায়। তার প্রতিক্রিয়ায় ভারত বিচিত্রায় প্রবন্ধ প্রকাশ করেন বাংলার আরেক নিসর্গপ্রেমী বিপ্রদাস বড়ুয়া। জবাবে ভারত বিচিত্রায় আমার দ্বিতীয় প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। পরে পারুলের সন্ধানে নামে আমার ফুল বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে। ২০০৯ সালের একুশে বইমেলায় বইটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করেন নিসর্গসখা দ্বিজেন শর্মা। উল্লেখ্য, পারুলের সন্ধানে গ্রন্থের পূর্বভাষ রচনা করেন ওয়াহিদুল হক। বইটি বাংলাদেশে পঞ্চ বৃক্ষসখার (ওয়াহিদুল হক, দ্বিজেন শর্শা, নওয়াজেশ আহমদ, আবদুশ শাকুর ও বিপ্রদাশ বড়ুয়া) নামে উৎসর্গিত। এ বিরল সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য জ্ঞান করি। তাঁদের সকলের কাছে আমার অপ্রতিশোধ্য ঋণ। ততদিনে ওয়াহিদুল হক লোকান্তরিত হয়েছেন।

বাংলাদেশে গাছগাছালির স্বাভাবিক ভাণ্ডার ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে লোভী আর দুর্নীতিবাজদের যোগসাজসে। বৃক্ষ হন্তারকদের লোভের শিকার ভাওয়াল, মধুপুর, বরেন্দ্র, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, সুন্দরবন। এই প্রকৃতিবিনাশী হৃদয়বিদারক কাহিনী ভাষা পেয়েছে ফিলিপ গাইন, পাভেল পার্থ, আমিরুল আলম খান এবং আরও অনেকের গ্রন্থে। আমাদের এক কালের সমৃদ্ধ বনভূমি এখন যেন হারিয়ে যাওয়া উপকথা, বাস্তব অস্তিত্বহীন। সোৎসাহে আজও এই ধংসযজ্ঞ চলছে। দুর্বৃত্তদের এই অপরাধকর্মে শরিক আমাদের নির্বোধ রাষ্ট্রযন্ত্রও। স্বভূমিজাত স্বাভাবিক উদ্ভিদ নিধনে কারো সামান্য লজ্জা নেই, অনুতাপ নেই; বরং আছে অপার উৎসাহ। তাদেরই পরম উৎসাহে আবার নির্বিচার বিদেশি বৃক্ষের বিস্তারে আমাদের ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থানচিত্র বদলে গেছে।

ফলে, এককালে বাঙালির অতিপ্রিয় ফুল পারুল এখন খুঁজে পেতে হয়রান সবাই, কিন্তু হতোদ্যম নন। আমি নিজেও গোটা বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিম বাংলা, বিহার, কেরালা, মুম্বাই এবং মালয়েশিয়া খুঁজে পারুল না পেয়ে বারবার হতাশ। সে অনুসন্ধানে শরিক আরও নানা বিদগ্ধ প্রকৃতিপ্রেমী।

পারুল বিতর্ক দেশব্যাপী নতুন উৎসাহ সৃষ্টি করে প্রথম আলোয় (১০ জুলাই, ২০০৯) নওয়াজেশ আহমদের অতি নির্ভরযোগ্য একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হলে। পারুল নিয়ে আলোচনার সূচনাতেই তাই উচিত হবে পারুল চিনে নেয়া। যদিও আমার পূর্বেক্ত প্রবন্ধে, বইয়ে এবং সকলের গ্রন্থে তা লিপিবদ্ধ আছে তবু, পুনরুক্তিতে দোষ কি?

কেমন ফুল পারুল? ডেভিড প্রেইন (১৮৫৭-১৯৪৪) কালিপদ বিশ্বাস ও এককড়ি ঘোষ, (সম্পা. অসীমা চট্টোপাধ্যায়) দ্বিজেন শর্মা দিলিপ দাশ ও খায়রুল আলম তাঁদের গ্রন্থে পারুলের কাণ্ড, শাখা, পত্র, পুষ্প, ভেষজ গুণ, নিবাস সম্পর্কে বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন, সেই সাথে স্কেচ। ডেভিড প্রেইন প্রণীত এবং ১৯০৩ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত Bengal Plants গ্রন্থকেই সকলে প্রামাণ্যগ্রন্থ হিসেবে মান্য করেন।

পারুলের কাণ্ড, শাখা, পত্র ইত্যাদি বিষয়ে প্রায় সকল গ্রন্থে বর্ণনা মোটামুটি এরকমই। উল্লেখযোগ্য কোন পার্থক্য নেই। তবে ফুলের রঙ ও সাইজে কিছু পার্থক্য দেখি, যা স্বাভাবিক। আয়ুর্বেদাচার্য্য শিবকালী ভট্টাচার্য্য তাঁর বিখ্যাত চিরঞ্জীব বনোষৌধি গ্রন্থে পারুল ফুলের আলঙ্কারিক সংস্কৃত বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, “উষসি প্রতিপক্ষ কামিনী সদনা দন্তিক মঞ্চতি প্রিয়ে। সুদৃশো নয়নাজ-কোনয়ো রুদিয়ায় পটলারুণদ্যুতি।”

অর্থাৎ, ‘নিন্দা, আক্ষেপ, অপমান, অনাদর ও ঈর্ষায় চোখেমুখে ফোটে পাটল (পারুল) ফুলের রং, আর মাথায় আসে কাঁপুনি, ভ্রূতে আসে বঙ্কিমতা, আর মুখের ফাঁকে আসে ভর্ৎসনার অব্যক্ত সঙ্কেত যা তখুনি ব্যক্ত হবে।’ এই যে অমর্ষ ভাবের লক্ষণ তাই-ই হলো পারুল ফুলের রং।

পারুল মূল্যবান ভেষজ ও দারুবৃক্ষ। শিবকালী ভট্টাচার্য্য লিখছেন, ‘শাখা-প্রশাখা ও কাণ্ডের নরম অংশগুলি রোমশ ও গ্রন্থিময়। গাছের ডাল ধূসর বর্ণের, কাঠের বাইরের দিকটা ধূসর অর্থাৎ ছাই রঙের হলেও ভিতরটা পীতাভ (হলদে আভাযুক্ত), তাতে কালো কালো দাগ থাকে। কাঠ পালিশ করলে দেখতে খুব সুন্দর হয়।’
আয়ুবেদাচার্য পারুলের সমালংকৃত নাম পাটলা, অমোঘা, মধুদূতী, কৃষ্ণবৃন্তা, অলিপ্রিয়া বলে জানাচ্ছেন। শীতের শেষে বসন্তের আগমনবার্তা ঘোষণা করতেই প্রস্ফুটিত হয় পারুল। তাই সে বসন্তদূতী। আর ফুলের বোঁটার রং কালো বলে তার এক নাম কৃষ্ণবৃন্তা। সুগন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ভীড় জমায় অলিগণ, তাই তো সে অলিপ্রিয়া। বেদে উল্লিখিত এই ভেষজের নামের ভাষিক বিকাশ: পাটল>পাড়ল>পারল>পারউল>পারুল। তাঁর বর্ণনায় পাই পারুলের উড়িয়া নাম পাট্লি, হিন্দিতে পারুল, পাড়ল, পারর।

তিনি অবশ্য জানাচ্ছেন যে, সারা ভারতেই অল্পবিস্তর পারুল পাওয়া যায়। দুই প্রজাতির পারুল — তাম্রপুষ্প (Stereospermum suaveolesns) I সমনাম (Stereospermum tetragonum), উভয়ের গোত্র Bignoniaceae বলে উল্লেখ করেছেন শিবকালী ভট্টাচার্য। ঘন্টাসদৃশ এক পারুলের উল্লেখও করেছেন আয়ুর্বেদাচার্য্য। তিনি এর নাম দিয়েছেন ঘন্টা পারুল (Schrebera swieteniodes), গোত্র Oleaceae. তবে কি বলধা গার্ডেনে কথিত পারুল যাকে দ্বিজেন শর্মা গড়শিঙ্গা বলেছেন সেটা এই ঘণ্টা পারুল (Schrebera swieteniodes)?

দ্বিজেন শর্মা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ শ্যামলী নিসর্গে পারুলের বর্ণনা দিয়েছেন,

‘‘পারুল (Stereospermum suaveolesns), গোত্র Bignoniaceae. একহারা লম্বাটে উঁচু বৃক্ষ, ৩০-৪০ ফিট উঁচু। কাণ্ড ধূসর বর্ণ, কোমল কাঠও তদ্রুপ। সার পীতাভ ধূসর, কালো দাগ ছিটানো, মসৃণ সুশ্রী। পত্র পক্ষবৎ যৌগিক, ১২-১৮ ইঞ্চি লম্বা যেন ছোটখাটো ডাল, বিজোড়পক্ষ। পত্রিকাগুলিও বেশ বড় সংখ্যা ৭-৯; লম্বা ৭ থেকে ৯ ইঞ্চি, চওড়া ৩ থেকে ৫ ইঞ্চি। বোঁটা খুব খাটো, ১/১০ইঞ্চি, আয়তাকার, সূক্ষ্ণকোণী, অভঙ্গ বা ক্রকচ-প্রান্তিক, কচিপাতা রোমশ; মঞ্জরিদণ্ড দীর্ঘ, বহুপৌষ্পিক; পুষ্প ১ থেকে দেড় ইঞ্চি লম্বা। ফুল ফোটে গ্রীষ্মে। অসমাঙ্গ, ঘন্টাকার, হালকা বা ঘন বেগুনি, সুগন্ধী। দলওষ্ঠ মসৃণ; বৃতি ১/৩ ইঞ্চি লম্বা, লোমশ, ৩-৫ খণ্ড, খাটো ও চওড়া; পাপড়ি ৫, যুক্ত, গোলাকার; পুংকেশর ৪, দুটি লম্বা, দুটি খাটো, দললগ্ন, একটি পুংকেশর বন্ধ্যা, পরাগহীন। গর্ভদণ্ড ১, গর্ভমুণ্ড দ্বিখণ্ডিত। ফল ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি লম্বা, শুকনো, খাদালো, পাকে শীতকালে। শুষ্ক, ঈষৎ লোমশ; বীজ ১/৪ ইঞ্চি X ১ ইঞ্চি, খাঁজকাটা, বায়ুবাহী।

পারুলের ভেজষগুণ আছে। মূলের ছাল প্রশান্তিকর ও মূত্রবর্ধক। ফুল কামোদ্দীপক। পারুল ফুল সুগন্ধী, পানিতে ভিজিয়ে রাখলে তাতে সুগন্ধ ছড়ায়। পারুলের এক নাম তাই অম্বুবাসী।’’

পারুলের সর্বস্বীকৃত নাম Stereospermum cheloniodes গোত্র Bignoniaceae। ডেভিড প্রেইন তাঁর Bengal Plants গ্রন্থে Stereospermum cheloniodes প্রজাতির প্রাপ্তিস্থান উত্তরবঙ্গ, ডুয়ার্স, চটগ্রাম এবং Stereospermum suaveolens প্রজাতির পারুলের প্রাপ্তিস্থান ছোট নাগপুর, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরবঙ্গ বলে উল্লেখ করেছেন। টি. কে বোস, পি দাশ ও জি. জি মাইতি Trees of the World গ্রন্থে পারুলের প্রাপ্তিস্থান সম্পর্কে লিখেছেন, “distributed in sub-Himalayan track from Jumna to eastward, Rajstan, Bihar, Central India and Myanmar.”

ও বৃক্ষ, ও নিসর্গ গ্রন্থে বিপ্রদাস বড়ুয়া বুদ্ধগয়া মন্দির প্রাঙ্গণে পাঁচটি, জাপানি মন্দিরের পিছন দিকে একটি, রাস্তা ও পার্কের পাশে আরও কয়েকটি পারুল আছে বলে লিখেছেন। বলধা উদ্যানে একটি ‘পারুলজাতীয় গাছ’ (গাছপালা তরুলতা) এবং ঢাকার রমনা পার্কে একটি পারুল আছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন (ও বৃক্ষ, ও নিসর্গ এবং নিসর্গের খোঁজে)।

চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহের মধুপুর বনে পারুল আছে বলে উল্লেখ করেছেন দিলীপ কুমার দাস ও এম. খায়রুল আলম তাদের Trees of Bangladesh গ্রন্থে। কিন্তু, এথেলবার্ট ব্লাটার ও ওয়ালটার স্যামুয়েল মিলার্ড লিখিত Some Beautiful Indian Trees গ্রন্থে পারুলের কোন উল্লেখই নেই।

প্রফেসর দ্বিজেন শর্মাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘পারুলের বৈজ্ঞানিক নাম এখন Stereospermum cheloniodes. পূর্বে নাম ছিল Stereospermum suaveolens. অর্থাৎ এটি এখন পারুলের সমালঙ্কৃত বৈজ্ঞানিক নাম।’

পারুলের সন্ধানে প্রকাশিত হবার পর আমি জনাব নওয়াজেশ আহমেদকে তার বাসায় গিয়ে বইটি তাঁকে দিতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। তিনি পারুল সংক্রান্ত নানা বিষয়ে আলোচনা করেন এবং আমার এই শ্রমলব্ধ কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন। শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ আমার প্রয়োজনমত ব্যবহারের অনুমতি দান করে আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেন। একই ভাবে আবদুশ শাকুর এবং বিপ্রদাশ বড়ুয়া, মোকারম হোসেন, প্রফেসর নাদেরুজ্জামান আমাকে অভিনন্দিত করেন।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি, দৈনিক প্রথম আলোয় নওয়াজেশ আহমদ লিখিত ‘দেখা মিলেছে পারুলের’ প্রকাশিত হলে সর্বত্র নতুন উৎসাহ সৃষ্টি হয়। বগুড়ার সোনাতলা নাজির আখতার মহিলা কলেজে একটি শতবর্ষী পারুল গাছ ফুলে ফুলে সকলকে মোহিত করে এ খবরে অনেকেই উৎসাহী হয়ে ওঠেন। নওয়াজেশ আহমদ তাঁর প্রবন্ধ প্রকাশের পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ থেকে নমুনা পরীক্ষা করিয়ে নেন। সে পরীক্ষায় সোনাতলার নাজির আখতার মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণের এই ফুলগাছটিকে পারুল (Stereospermum chelonoides) বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

এদেশে ফুল নিয়ে যাঁদের লেখা নির্ভরযোগ্য তাঁদেরই একজন নওয়াজেশ আহমেদ। তিনি প্রথম আলোয় লেখেন,
“রূপকথার সাত ভাই চম্পার বোন পারুল নয়, ঘুরে বেড়াই আমাদের দেশের এক দুর্লভ ফুলের সন্ধানে। তার নাম পারুল। পুষ্পরসিকদের সঙ্গে দেখা হলেই করেন পারুলের কথা। আমাদের রূপকথা, কাব্য আর গানে এত যার উল্লেখ, তার কেন দেখা পাই না। সে এত দুর্লভ কেন? পারুল কি শুধু রূপকথার ফুল! আমি নিজে উদ্ভিদ শনাক্ত করার মতো বিশেষজ্ঞ নই, জিনেটিক বিজ্ঞানী। তবে ফুল ভালোবাসি বলে ফুল নিয়ে লেখালেখি করে থাকি। তাই উদ্ভিদ শনাক্ত করতে পারেন এমন বিশেষজ্ঞ বন্ধুদের জিজ্ঞেস করি পারুলের কথা। বাংলাদেশে ফ্লোরা বা উদ্ভিদকুল নিয়ে যারা কাজ করেন তাঁদের সাথেও কথা বলি। কিন্তু সঠিক উত্তর পাওয়া যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানির প্রফেসর আবুল হাসান বাংলাদেশের ফ্লোরার উপর একজন বিশেষজ্ঞ। তাঁকে জিজ্ঞেস করি। তিনি মুচকি হেসে বলেন, ‘আমরাও সঠিক খোঁজ পাইনি আসল পারুলের।’”

নওয়াজেশ আহমদকে পারুল ফুলের সন্ধান দেন বগুড়ার সোনাতলার জামিল আখতার বিনু। তার চাচা নূরল হোদা প্রায় শতবর্ষ পূর্বে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের খড়গপুর থেকে পারুল ফুল গাছের দুটি চারা এনে রোপণ করেন। বেঁচে থাকে একটি। পারুল ফুলের গাছসহ ওই জমি তিনি (নুরুল হোদা) ও তার ভাই এবং বিনুর পিতা নাজমুল হোদা ১৯৬৭ সালে নাজির আখতার কলেজ স্থাপনের জন্য দান করেন। দুষ্প্রাপ্য পারুল বিতর্কে সঠিক মতামত জানতে জামিল আখতার বিনু তাঁর চাচার রোপিত নাজির আখতার কলেজ ক্যাম্পাসের গাছ থেকেই ফুলসমেত একটি ডাল নিয়ে তা পৌঁছে দিয়েছিলেন নওয়াজেশ আহমেদকে। তিনি লিখেছেন,
“বোটানিক্যাল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখে মনে হল এটা আসল পারুল। পরের দিন সকালবেলাই ফুলসমেত ডালপালাগুলো পাঠিয়ে দিলাম প্রফেসর হাসানের কাছে বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত করার জন্য।

“পরের দিন হাসান সাহেবের ফোন। তিনি বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ করে দেখছেন। হ্যাঁ, এটা আসল পারুল। তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। কারণ অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাঁদের উদ্ভিদকুল সার্ভেতে বাংলাদেশে পারুল গাছের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আমি তো রীতিমত উদ্বেলিত”।

তিনি আরও লিখছেন, “পারুল Bignoniaceace পরিবারভুক্ত। বৈজ্ঞানিক নাম Stereospermum sauveolens। এই দুর্লভ পারুল ফুলের একটি ঘনিষ্ট প্রজাতি দেখা যায় বাংলাদেশে। এ হল হলুদ ফুলের পীত পারুল, যা আটকপালী নামে পরিচিত। পারুলের ফুল ফোটে মে-জুন মাসে। হালকা এক মিষ্টি গন্ধে ভরপুর। পুষ্প স্তবক ঘন বেগুনে, ফুল ফিকে তাম্রবর্ণ।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক আবুল হাসান বাংলাদেশের ফ্লোরার উপর একজন বিশেষজ্ঞ। নওয়াজেশ আহমদ তাঁরই মতামতের উপর ভিত্তি করে সোনাতলার গাছটিকে পারুল বলে স্বীকৃতি দেন।
ফুল নিয়ে লেখালেখি করে খ্যাতি অর্জন করেছেন মোকারম হোসেন। তিনি জামিল আখতার বিনুর সাথে সোনাতলা যান সরেজমিন গাছটি দেখতে। গাছটির ফুল, পাতা ও ফুলের নমুনা সংগ্রহ করেন তিনি। নমুনাগুলো বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সরদার নাসির উদ্দিন, দ্বিজেন শর্মা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান আবুল হাসানকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়েও এটিকে পারুল বলতে অস্বীকৃতি জানান এবং গাছটিকে ধারমারা বলে মত প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে মোকারম লেখেন,
“২০০৯ সালের ১০ জুলাই নওয়াজেশ আহমদ প্রথম আলোয় ‘দেখা মিলেছে পারুলের’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেন। সেই গাছটির ফুল, পাতা ও ফলের নমুনা সংগ্রহ করে নমুনাগুলো পাঠানো হলো বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সরদার নাসির উদ্দিন, দ্বিজেন শর্মা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান আবুল হাসানের কাছে। তাঁরা পরীক্ষা করে জানালেন, ফুলটি ধারমারা। বৈজ্ঞানিক নাম Stereospermum colais (Syn. T. personatum)। আসল পারুল ফুল রঙভেদে দু’রকম। তাম্রপুষ্প ও পীতপুষ্প। তাম্রপুষ্প পারুলের বৈজ্ঞানিক নাম- Stereospermum chelonoides আর পীত পারুলের বৈজ্ঞানিক নাম- Stereospermum tetragonum। দু’রকম পারুলই Bigoniaceae পরিবারের।”

মোকারমের লেখার তীব্র প্রতিবাদ করে সমুদ্র হক জনকণ্ঠে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, [মোকারমের] “এ যুক্তি মেনে না নিয়ে জামিল আক্তার বিনু এ বছর [২০১১] মে মাসের মধ্য ভাগে গাছের ডাল, পাতা, ফুল, মঞ্জুরি দণ্ড ইত্যাদি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ আবুল হাসানের কাছে যান পরীক্ষার জন্য। ড. হাসান একাধিক পন্থায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরিষ্কার সিদ্ধান্ত দিয়ে শনাক্ত করেন, বগুড়ার সোনাতলা নজির আখতার কলেজ চত্বরে যে গাছ আছে তা পারুল ফুলেরই গাছ। এই প্রজাতির নাম ‘চম্পা পারুল’। আগেও তিনি নমুনা পরীক্ষা করে পারুল ফুলই শনাক্ত করেন। ড. হাসানকে সহযোগিতা করেন ড. জসিম ও ড. অলিউর”।

আমি ব্যক্তিগতভাবে দু’বার সোনাতলার পারুল গাছটি দেখতে গেছি। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে রংপুর থেকে ফেরার পথে পারুল সন্দর্শনে সোনাতলা যাই। কিন্তু পারুল ফোটে এপ্রিল-মে মাসে। তাই জানুয়ারি মাসে গাছে ফুল ছিল না। তখন নাজির আখতার কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রফেসর রফিকুল আলম বকুল আমাকে নানা তথ্য দিয়ে সাহায্য করেন।

এরপর ২০১৬ সালের মে মাসে আমি আবার যাই সোনাতলা, পারুলের খোঁজে। যাবার আগে যোগাযোগ করি সোনাতলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাবিবুর রহমান ও সাংবাদিক ইকবাল হোসেন লেমনের সাথে। তারা আমাকে সর্বাত্মক আতিথেয়তা ও সহায়তা করেন। জনাব হাবিবের ব্যক্তিগত আতিথেয়তা অতুলনীয়। ময়দানহাটা মোশাররফ মন্ডল কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল বারী আমার সোনাতলা ভ্রমণের যাবতীয় ব্যবস্থা করেন। এছাড়া সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা ফেরদৌস আলম মুকুল, সাবেক ব্যাংকার মোহাম্মদ আলী তারা ও সাংবাদিক আবু হেলাল উপস্থিত থেকে নানা ভাবে সহায়তা করেন। নাজির আখতার কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অরুণ বিকাশ গোস্বামী, যিনি নিজে একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী এবং পারুলে উৎসাহী, আমাকে পারুল সম্পর্কিত নানা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন। এবার ফুলে ফুলে সুশোভিত গাছটি দেখার সৌভাগ্য হয় আমার। আমি নমুনা সংগ্রহ করি। সকল বৈশিষ্ট্যে তাকে পারুল মনে হয়। এর পত্রক শিরা রোমযুক্ত, মঞ্জরিদণ্ডের শাখা-প্রশাখা রোমযুক্ত, ফুল হলুদ, এক ইঞ্চির সামান্য কম। সন্দেহ ভঞ্জনের জন্য আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ অপূর্ব কুমার রায়ের সহায়তা চাই। তিনি এ বিষয়ে জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রজাতি সনাক্তির কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দেন এবং সোনাতলা যেয়ে গাছটি দেখেও আসেন। ঢাকায় ফিরে ফোনে কথা বলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ জসিমউদ্দীন এবং জামিল আখতার বিনু আপার সাথেও। পরে ডিসেম্বর ১৫, ২০১৬ তারিখে আমি নিউ এস্কাটনে জামিল আখতার বিনুর বাসায় তার সাথে দেখা করে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছি। এ বিষয়ে আমার একটি প্রবন্ধ নিরলে বিরল পারুল সংকলনে প্রকাশিত হয়।

কিন্তু পারুল শনাক্তিকরণে মোকারমের উপরোক্ত দাবির সত্যতা পাওয়া যায় না স্বয়ং অধ্যাপক হাসানের নিজের লেখায়। তিনি লেখেন, “পারুল নিয়ে প্রথম লেখাটি প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালের ১০ জুলাই প্রথম আলোয় [অধ্যাপক হাসান অবশ্য আমার নিবন্ধ বা বই ‘পারুলের সন্ধানে’ সম্পর্কে কিছু জানেন বলে মনে হয় না]। শিরোনাম ছিল ‘দেখা মিলেছে পারুলের’। লিখেছিলেন নওয়াজেশ আহমদ।” নওয়াজেশ আহমদের পাঠানো ফুলের পাতা, ফুল চার-পাঁচ দিন পরে পাঠানোর কারণে সঠিকভাবে শনাক্ত করার মত ছিল না। তাঁর ভাষায়,
“নওয়াজেশ আহমদ বগুড়ার সোনাতলা থেকে একটি ডাল এনে আমাকে শনাক্ত করতে দিয়েছিলেন। সংগ্রহের চার-পাঁচ দিন পর নমুনাটি যখন আমার হাতে পৌঁছায়, তখন ফুল প্রায় বিনষ্ট, গলে গেছে। এর বর্ণ বা গন্ধ বোঝার কোনো উপায় নেই। নমুনা থেকে পাতা ও ফুলের গঠন এবং বর্ণ ও গন্ধ সম্বন্ধে নওয়াজেশ সাহেবের ভাষ্য মিলিয়ে শনাক্ত করে দিই, এটি পারুল।”

পরে মোকারম যে নমুনা সংগ্রহ করে তা অধ্যাপক আবুল হাসানকে দেন শনাক্ত করার জন্য দেন সে সম্পর্কে শুনুন ডঃ হাসানের ভাষায়, “এর অনেক পরে মোকাররম সাহেব ফোন করে জানালেন, তিনি একটি উদ্ভিদের নমুনা পাঠিয়েছেন শনাক্তকরণের জন্য। এবারের নমুনাটি অপেক্ষাকৃত তাজা। আমার সহকর্মীরা (ড. জসিম ও ড. অলিউর) এটিকে শনাক্ত করলেন Stereospermum Chelonoides বলে। এই নমুনাও বগুড়ার সোনাতলা থেকেই তিনি এনেছেন। এটি পীত-পারুল (ফুল হলুদ বলে) বা আটকপালী নামে পরিচিত। চট্টগ্রাম অঞ্চলে এটি ধারমারা নামে পরিচিত।

“প্রশ্ন জেগেছে, সোনাতলার সেই গাছটি পারুল, নাকি ধারমারা। এই বিতর্কের অবসানের জন্য একটু বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের দরকার। Bignoniacea গোত্রের অন্তর্গত Stereospermum গণের দুটি প্রজাতির উল্লেখ আছে David Prain-এর Bengal Plants বইতে। এর একটি হলো S. Chelonoides এবং অপরটি S. Suaveolens। প্রথমটি পাওয়া যায় উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রামে; দ্বিতীয়টি পাওয়া যায় উত্তরবঙ্গ, ছোট নাগপুর, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে।
S. Chelonoides-এর পাপড়ি-নল গোলাপি, নলখণ্ড হলুদ, পত্রক মসৃণ, মঞ্জরিদণ্ডের শাখা-প্রশাখা মসৃণ এবং ফুল এক ইঞ্চি থেকে ছোট। একে বাংলায় পীত পারুল, আটকপালী, ধারমারা (চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নাম), হিন্দিতে পারাল, অসামিজ ভাষায় পারুলী বলা হয়।

S. Suaveolens-এর পাপড়ি পার্পল, পত্রক কচি অবস্থায় রোমযুক্ত, মঞ্জরিদণ্ডের শাখা-প্রশাখা রোমযুক্ত, ফুল এক ইঞ্চি থেকে কিঞ্চিৎ বড়। একে বলা হয় পারুল, হিন্দিতে পারাল।”

অধ্যাপক হাসান এরপর লেখেন,
“সম্প্রতি [১৬ মে, ২০১১] বগুড়ার সোনাতলার একটি নমুনা পরীক্ষা করে দেখা যায়, এর পত্রক (কচি পত্রক ছিল না) শিরা রোমযুক্ত, মঞ্জরিদণ্ডের শাখা-প্রশাখা রোমযুক্ত, ফুল হলুদ, এক ইঞ্চির সামান্য কম। অর্থাৎ বগুড়ার নমুনাটির বৈশিষ্ট্য ওপরে উল্লিখিত দুটি প্রজাতির মিশ্রবৈশিষ্ট্যযুক্ত। শ্রেণীবিন্যাস বিদ্যায় কোনো কাছাকাছি দুটি প্রজাতির মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যের নমুনার উপস্থিতি প্রজাতি দুটিকে একীভূত করার দিকে তাগিদ দেয়। সম্ভবত এ কারণেই বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম থেকে প্রকাশিত (১৯৮৬) Plant Names of Bangladesh বইতে দুটি প্রজাতিকে একীভূত করে Stereospermum Chelonoides (সমনাম S. suaveolens) উপস্থাপন করা হয়েছে, যার বাংলা নাম বলা হয়েছে পারুলজাতা, ধারমারা, আটকপালী, পারুল ইত্যাদি। এই তথ্য অনুযায়ী পারুল ও ধারমারা একই বৃক্ষ, যদিও ফুলের বর্ণে পার্থক্য বিরাজমান। এখানে উল্লেখ, কেবল ফুলের বর্ণের পার্থক্য পৃথক প্রজাতি নির্দেশ করে না, যেমন, নয়নতারা ফুল বেগুনি রঙের হতে পারে আবার সাদা রঙেরও হতে পারে। করবী ফুল লালও হতে পারে আবার সাদাও হতে পারে।”

অধ্যাপক হাসান তৃতীয় দফায় একটি ভিন্ন নমুনা পরীক্ষা করেন বলে জানা যায় মোকারম হোসেনের প্রথম আলোয় প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক লেখায়। এবারের যে নমুনা তিনি পরীক্ষা করেন তা মোকারম হোসেন সংগ্রহ করেন গাজিপুরে সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস থেকে। শিরোনাম ‘তবে কি পারুলের দেখা মিলল?’ এই লেখায় তিনি গাজিপুরের সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে একটি পারুলের সচিত্র বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানেও তিনি বিশেষজ্ঞ মতামত নেবার জন্য অধ্যাপক হাসানের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং আমার পারুলের সন্ধানে বইয়ের উল্লেখ করেছেন [যদিও বইয়ের নাম ভুল লিখেছেন]। তাঁর দাবি এটিই [গাজিপুরের] হয়ত ‘আসল’ পারুল।

এ প্রসঙ্গে মোকারম লিখেছেন,
“পারুল মাঝারি আকৃতির পত্রমোচি গাছ। পত্র যৌগিক, প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার লম্বা, কচি কাণ্ড ও পাতা রোমশ। ফুল ফোটে ডালের আগায়। পাপড়ি গাঢ় বেগুনি থেকে গোলাপি ও সুগন্ধি, ভেতরের অদৃশ্য অংশ হলদেটে। এপ্রিলের প্রথম ভাগে কচি পাতার সঙ্গে দু-একটি করে ফুল ফুটতে শুরু করে। ফল ক্যাপসিকিউল, প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার লম্বা, গাঢ়ধূসর বা বেগুনি লাল, অস্পষ্ট চার খাঁজযুক্ত। বংশবৃদ্ধি বীজ থেকে।”
ব্যাস এ টুকুই। আর সোনাতলার গাছ ফুলের বর্ণনায় মোকারম লিখছেন,
“গাছটির গোড়ার দিকের বেড় প্রায় ১২ ফুট। ধূসর কান্ড, কচি ডালপালা রোমশ, পরে মসৃণ। যৌগপত্রে তিন-চার জোড়া পত্রিকা, প্রায় মসৃণ। ডালের আগায় শাখাবিভক্ত মঞ্জরিতে ছোট ফুল, আড়াই থেকে তিন সেন্টিমিটার লম্বা, দল নলাকার, দেড় ইঞ্চি লম্বা, মলিন সাদা, তাতে লালচে দাগ, ঈষৎ সুগন্ধি, পর্যায়ক্রমে ফোটে।”
কিন্তু অধ্যাপক হাসান সোনতলার নমুনার বর্ণনা…

যশোর শিক্ষাবোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here