পরিবেশ অপরাধ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?

0
38

ড. এ. এস. এম. সাইফুল্লাহ

অপরাধের নানা প্রকারের মধ্যে পরিবেশ অপরাধ সংগত কারণেই এখন আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর বিলুপ্তি, বনভূমি নিধন, মাটি-পানি-বায়ুদূষণ দিন দিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, যার অনেকটার পেছনের গল্প পরিবেশ অপরাধ। আইনি ভাষায়, পরিবেশ অপরাধ একটি অবৈধ কাজ, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এসব অপরাধ মূলত সামগ্রিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সম্পদকেন্দ্রিক হতে পারে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন যেমন- জি-৮, ইন্টারপোল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘের পরিবেশ প্রোগ্রাম, জাতিসংঘের আন্তঃদেশীয় অপরাধ ও বিচার গবেষণা ইনস্টিটিউটগুলো পরিবেশ অপরাধকে বিভিন্নভাবে নির্ধারণ করেছে।

বন্যপ্রাণী এবং উদ্ভিদের বিপন্ন প্রজাতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কিত কনভেনশনের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে বিভিন্ন জীবজন্তু পাচার কিংবা বাণিজ্য করা একটি অপরাধ। মন্ট্রিল প্রটোকল উপেক্ষা করে ওজন স্তর ক্ষয়কারী পদার্থ পাচার কিংবা ১৯৮৮ সালের বেসেল কনভেনশন অমান্য করে বিপজ্জনক বর্জ্য নিস্কাশন অথবা পাচার উভয়ই পরিবেশগত অপরাধ। ঠিক তেমনি, অবৈধভাবে বন থেকে কাঠ সংগ্রহের মাধ্যমে বনভূমি ধ্বংস কিংবা জলাশয় থেকে অধিক মাছ আহরণের মাধ্যমে মাছের প্রজাতি বিপন্ন করে তোলা সবকিছুই পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর অপরাধ।

বিশ্বব্যাপী সংঘটিত অপরাধের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয়ে থাকে পরিবেশের বিরুদ্ধে এবং এসব অপরাধের পেছনে থাকে বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র। পরিবেশ অপরাধের অনেকাংশই সংঘটিত হয় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে, এর বাইরেও রয়েছে করপোরেশন, ইউনিয়নগুলো ইত্যাদি। পরিবেশ অপরাধ কখনও জাতীয়, আঞ্চলিক অথবা আন্তর্জাতিক পরিম-লে ঘটে থাকে। আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র বিভিন্ন বন্যপ্রাণী হত্যা, পাচার, বনের গাছ কেটে উজাড় করা, প্রাকৃতিক সম্পদ লুটসহ নানা অপরাধ কর্মে যুক্ত থাকে। ইন্টারপোল এবং জাতিসংঘের পরিবেশ সংরক্ষণ প্রোগ্রামের (ইইউএনইপি) তথ্যমতে, এই অপরাধজনিত ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলছে এবং এর অর্ধেকটাই হচ্ছে অবৈধ কাঠ পাচার এবং বন উজাড় করার মাধ্যমে।

বাংলাদেশে দিন দিন পরিবেশ অপরাধ বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে বনভূমি উজাড়, কৃষিজমির পরিবর্তন এবং জলাভূমির অবক্ষয় ও মৎস্য সম্পদের যথেচ্ছ আহরণ, বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে ভূমির ব্যবহারের পরিবর্তন, সুরক্ষিত অঞ্চলগুলোর অবক্ষয়, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পানির প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করা ইত্যাদি। সীমাবদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থা স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কাজনক। দেশব্যাপী মাটি, পানি, বাতাসের সীমাহীন দূষণের কারণে দেশটির টেকসই উন্নয়ন অনেকাংশেই চ্যালেঞ্জের সন্মুখীন হচ্ছে। উন্নয়নের যাত্রায় বিশ্বব্যাপী দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে কলকারখানা, যানবাহনের সংখ্যা এবং সঙ্গে বাড়ছে বায়ুদূষণ। উন্নত রাষ্ট্রগুলো কলকারখানা, যানবাহন থেকে নির্গমনের মান নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও অনুন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অনেক সময় ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে তা সম্ভব হয় না। অথচ রাষ্ট্রের সংবিধান নাগরিকের ‘জীবনের অধিকার’কে স্বীকৃতি দিয়েছে, যেখানে সুস্বাস্থ্যের জন্য নির্মল বায়ু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বায়ুদূষণের মাত্রা বিশ্বের ৯১টি দেশের মধ্যে সব সময়ই প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে থাকে।

পরিবেশ অরপরাধ এবং এর ক্ষতিকর দিকগুলোর ব্যাখ্যার জটিলতার কারণে অনেক সময় বিচারিক কার্যক্রম সমস্যার সম্মুখীন হয়। তবে, বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ এবং ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখিত ‘জীবনের অধিকার এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা’ বিষয়টিকে সুপ্রিম কোর্ট ‘জীবনের অধিকার’ যার মাঝে ‘স্বাস্থ্যকর জীবনের অধিকার’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে ব্যাখ্যা দিয়েছে, যা পরিবেশ সংরক্ষণে এবং আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে। বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩, যা পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, সুরক্ষা এবং সংরক্ষণের জন্য প্রণীত হয়েছিল, এর সেকশন ৩, স্বাস্থ্যবিধি ও স্যানিটেশনের জন্য পানীয় জল ও পানির অধিকারকে সর্বোচ্চ অধিকার হিসেবে গণ্য করার বিধান দিয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিক কিংবা আইনগত সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও আমাদের ভূ-উপরিস্থ এবং ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আইন না মেনে বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে দূষিত বর্জ্য কোনো রকম পরিশোধন ছাড়াই নিঃসরণ করা হচ্ছে জলাশয়গুলোতে। পানির সঙ্গে প্রবাহিত দূষিত রাসায়নিক পদার্থগুলো নানাভাবে ঢুকে পড়ছে আমাদের খাদ্যচক্রে এবং সৃষ্টি করছে বিভিন্ন ধরনের জীবনসংহারী রোগ, ক্ষতি করছে জনস্বাস্থ্যের।

আমাদের পরিবেশকে সুষমভাবে বাঁচিয়ে রাখে মাটি, এর সাহায্যে পরিবেশের বিভিন্ন নিয়ামকের মধ্যে মিথস্ট্ক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের বাস্তুতন্ত্র সচল থাকে। উন্নয়ন কিংবা বেঁচে থাকা সবকিছুর জন্যই আমরা মাটির ওপর নির্ভরশীল। অথচ বিশ্বব্যাপী মাটি দূষণ বেড়েই চলছে। ক্ষতিকর বর্জ্যের প্রথম গন্তব্য মাটি, দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য নিঃসরিত রাসায়নিক মাটি থেকে উদ্ভিদে, পানিতে, বাতাসে মিশে গিয়ে পুরো পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে। পরিবেশে নিঃসরিত এই বিষ খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানব শরীরে স্থান পায়, সৃষ্টি করে নানান রোগের। অথচ, সব দেশই তার নাগরিকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে প্রণয়ন করে আইন কিংবা নীতিমালা, সঙ্গে সঙ্গে এসব না মানার প্রতিযোগিতাও চলে সর্বত্র।

পরিবেশ অপরাধ দমনে জাতীয়, আঞ্চলিক কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন আইন নীতিমালা থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং পরিবেশ অপরাধের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করার বিষয়ে অনীহার কথা বলছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশকর্মীরা। দিন দিন পরিবেশ অপরাধের পরিমাণ যেমন বাড়ছে, তেমনি পাল্টাচ্ছে এর ধরন। বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য পরিবেশ সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হলেও ক্রমবর্ধমান পরিবেশ অপরাধ এবং এর দমনে ঢিলেঢালা পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে টেকসই উন্নয়ন অধরাই থেকে যাচ্ছে।

পরিবেশ রক্ষায় এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিবেশ অপরাধ বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। আইনের দুর্বলতার ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধী যেন মাফ না পেয়ে যায় সেদিকে খেয়াল রেখে আইনকে যুগোপযোগী করে এর প্রয়োগকে নিশ্চিত করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট অধিদপ্তর কিংবা সংস্থাগুলোকে স্বচ্ছ ও কার্যকর হতে হবে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পরিবেশ আদালত, গ্রিন বেঞ্চ নামে পরিবেশ অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা থাকলেও তা কতটা কাজ করছে সেদিকে খেয়াল রাখা যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন একে সক্রিয় করার ব্যবস্থা গ্রহণ। পরিবেশ অপরাধ বিষয়ে জনগণকে ধারণা দেওয়া এবং অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ, শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো একসঙ্গে কাজ করতে পারে। মনে রাখতে হবে, পরিবেশ-প্রতিবেশ বিপর্যস্ত হলে বিপন্ন হবে জীবন, তাই পরিবেশের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ বন্ধে এখনই সোচ্চার হতে হবে জীবের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে।

অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here