উচ্চশিক্ষায় ফটোকপিনির্ভর বই এবং আমাদের দৈন্যদশা

0
30

ড. রাজীব চক্রবর্তী

বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টির ক্ষেত্র। বাস্তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দিন দিন কলুষিত হচ্ছে কিছু নেতিবাচক ঘটনাপ্রবাহের কারণে। যার সর্বশেষ উদাহরণ পুলিশ পাহারায় ভিসির ক্যাম্পাস ত্যাগ। যদিও বা এটা বাংলাদেশের একটা মাত্র দিক। এর অন্যদিকে ভালো খবরও আছে, যেমন আমাদের দেশের পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক গবেষণায় দেশের জন্য সাফল্য বয়ে এনেছেন। পাটের জিনোম সিকোয়েন্স উদ্ভাবন যেমন বাংলাদেশের নামকে বিশ্বে উজ্জ্বল করেছে, ঠিক তেমনি ইদানীং বুয়েটের এক দল তরুণ গবেষকের স্বল্প মূল্যে বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়াই হাইফো অপিজেন মেশিন অপিজেটের আবিস্কার দুঃসময়ে দেশকে করোনা মোকাবিলায় সম্ভাবনার আলো দেখাচ্ছে।

তবে এই সাফল্যের সঙ্গে একটি খারাপ নজির আলোচনার দাবি রাখে- উচ্চশিক্ষায় পাইরেটেড বুকের ব্যবহার। যার অর্থ অনুমতি না নিয়ে অন্যের বই বা গবেষণাপত্র ব্যবহার করা। এই পাইরেসি এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে শুধু ছাত্র না, বিশ্ববিদ্যালয়ও এর সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে গেছে। খুব অনুন্নত দেশ ছাড়া, কোনো দেশেই এভাবে খোলা বাজারের মতো ফটোকপি বই বিক্রি হয় না। যেন দেখেও কেউ দেখছে না। এটাও অনেকটা এক ধরনের একাডেমিক অপরাধ। অথচ আমাদের দেশে এই পাইরেটেড বই দেদার এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে! এটা না হয় মানলাম যে, ছাত্রছাত্রীরা অর্থাভাবে কাসে কম মূল্যের ফটোকপি বই নিয়ে যায়। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে পর্যন্ত পাইরেটেড বই শোভা পায়।
শিক্ষকের গবেষণা ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও গবেষণার পরিবেশ পাচ্ছেন না। ফলে দেশের প্রায় ৫৩টি পাবলিক ও প্রায় ১০০টিরও বেশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে দেশীয় শিক্ষকের গবেষণামূলক বই তুলনামূলকভাবে অনেক কম। দেশীয় শিক্ষকের লেখা টেপট বইয়ের কথা না হয় বাদই দিলাম। শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের বাজেট এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একজন শিক্ষক যখন নিরুপায় হয়ে পাইরেটেড বই নিয়ে কাসরুমে যান, তখনই আসলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্দশার চিত্র ফুটে ওঠে।

দেশে ব্যাপক হারে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা না থাকার দরুন বা সরকারের সঙ্গে উন্নত দেশের সরকারের কোলাবোরেশন কম থাকায় বেশিরভাগ শিক্ষক বিদেশ থেকে পিএইচডি করার সুযোগ পান না। পরিতাপের বিষয় এই যে শিক্ষকের একটা অংশ আবার দেশে ফিরে আসেন না। যারা ফিরে আসছেন তারা গবেষণায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন- হয় পরিবেশের অভাবে বা ফান্ডিংয়ের অভাবে অথবা রাজনীতি করার জন্য। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে বিশাল একটি অংশ বিদেশের উন্নত চাকরির প্রলোভন ছেড়ে দেশে রয়ে গেছেন নিজের দেশে কিছু করার জন্য। কিন্তু প্রতিদানে কী পান! শিক্ষকদের জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো যদি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি অর্থায়নে সংগ্রহ করে দেশের গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে ছড়িয়ে দিতে পারত, তাতে শিক্ষকের স্বীকৃতি বাড়ত। পাশাপাশি শিক্ষকরা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি বক্তা হিসেবে গিয়ে তাদের গবেষণালব্ধ ফলাফলের ওপর সেমিনার করতে পারতেন। আবার একাধিক পাবলিকেশন নিয়ে মৌলিক গবেষণাধর্মী বইও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি অর্থায়নে কিনে নিতে পারে। যার একটা অংশ রয়্যালটি হিসেবে শিক্ষক পাবেন।
অনেক দেশে কিন্তু সরকারি অর্থায়নের মাধ্যমে এভাবেই দেশীয় গবেষণার প্রসার ঘটছে। এতে করে শিক্ষক যেমন অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবেন, একই ভাবে দেখা যাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লাইব্রেরি দেশীয় লেখকের বইয়ে সমৃদ্ধ হবে। আবার এই গবেষণার ফাইন্ডিংস যত বেশি ছাত্ররা তাদের থিসিসের কাজে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করবে ততই শিক্ষকের নিজের সাইটেশনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বাড়বে। প্রয়োজনে দেশীয় শিক্ষক বিদেশি শিক্ষকের সঙ্গে জয়েন্ট কোলাবরেশনে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে বই লিখতে পারেন।

ফলে, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাগুলোর কম মূল্যের ইন্টারন্যাশনাল এডিশন বা এশিয়ান কপি যেখানে বেশিরভাগ রেফারেন্স জাপান, ভারত, চীনের কনট্যান্টে ভরপুর থাকে, একটি সময় পর সেখানে বাংলাদেশের কেইস স্টাডিগুলো ঠাঁই পাবে। এভাবেই দেশের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার যে একটি আমেজ তৈরি হবে, এর সুফল ছাত্র-শিক্ষকরা যেমন পাবেন, তেমনিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ের মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে। ফলে পাইরেটেড বইয়ের প্রয়োজনীয়তা ধীরে ধীরে কমে যাবে। পাশাপাশি আমাদের দেশীয় প্রকাশক, যারা সারা বছর বিভিন্ন নোট এবং গাইড বই বিক্রির ওপর নির্ভরশীল, দেশীয় গবেষণাধর্মী বইয়ের জোগান তাদের ব্যবসায় প্রাণের সঞ্চার করবে। সবার আগে এই ফটোকপিনির্ভর বইয়ের বাজারকে আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

গবেষক ও লেখক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here