অবহেলিত কৃষি মৎস্য ও খাদ্য নিরাপত্তা খাত

0
35

সত্যপাঠ ডেস্ক

প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ২৪ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২৪ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা। অর্থাৎ দেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক শূন্য শতাংশ।

বাড়ছে কৃষি ভর্তুকি ও প্রণোদনা: আগামী অর্থবছরে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাড়ছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৮ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা, যা আগামী অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে ১০ হাজার ৯৯ কোটি টাকায় উন্নীত হবে। যদিও চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনার পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫০১ কোটি টাকা।

জাতীয় সংসদ বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, কৃষি খামার যান্ত্রিকীকরণে ৩ হাজার ১৯৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষিতে ভর্তুকি বাবদ সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কৃষি ও কৃষিসংশ্লিষ্ট উৎপাদন ও সেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ইত্যাদি খাতে গ্রামের দরিদ্র কৃষক, বিদেশফেরত প্রবাসী শ্রমিক এবং প্রশিক্ষিত তরুণ ও বেকার যুবাদের গ্রামীণ এলাকায় ব্যবসা ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী করোনা দুর্যোগের কারণে খাদ্যশস্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়ে খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশকে তেমন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি।

খাদ্যশস্যের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সিটি করপোরেশন, জেলা সদর ও পৌরসভাসহ প্রায় ২২৭টি স্থানে ওএমএস কার্যক্রমের মাধ্যমে চাল ও আটা বিতরণ করা হচ্ছে। বোরো ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো হাইব্রিড ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আউশ, আমন ও বোরো ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিগত বছরের তুলনায় এ বছর উৎপাদন বেশি হবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে।

গামী ২০২১-২২ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ

উৎস থেকে ২০ লাখ ৫৫ হাজার টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি পূর্ণমাত্রায় সংগ্রহ করে দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

খাদ্যগুদাম: দেশে সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের বিদ্যমান ধারণক্ষমতা প্রায় ২১ লাখ ৮০ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে আরো প্রায় ছয় লাখ টন ধারণক্ষমতার আধুনিক খাদ্যগুদাম নির্মাণের লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এছাড়াও রূপকল্প ২০৪১ এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী খাদ্যশস্যের সংরক্ষণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান গুদামের ধারণক্ষমতা বজায় রাখার লক্ষ্যে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

কৃষিসহায়তা কার্যক্রম: সরকার কৃষি খাতের উন্নয়নের জন্য নানা কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। কৃষির উন্নয়নের জন্য স্বাভাবিক ভর্তুকির অতিরিক্ত হিসেবে কৃষিজাত সামগ্রী রফতানির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ও কৃষি ক্ষেত্রে বিদ্যুচ্চালিত সেচযন্ত্রের ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ বিলের ওপর ২০ শতাংশ রিবেট প্রদান করা হচ্ছে।

কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা বাবদ ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪১৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকার সার-বীজসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ প্রণোদনা ও সহায়তা বাবদ ২ কোটি ৫ লাখ ৯৯ হাজার ৮৬৯ জনকে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রণোদনা প্রদান করা হয়েছে। সম্প্রতি কালবৈশাখীতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় এক লাখ বোরো চাষীকে এককালীন নগদ অর্থসহায়তা বাবদ ২৫ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে।

জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি: গবেষণার মাধ্যমে জলবায়ুসহিষ্ণু প্রযুক্তি ও ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং হস্তান্তরের কাজ চলছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণতার প্রভাব মোকাবেলার জন্য শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধিসহ স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ফসল উৎপাদনের দিকে নজর দেয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় চর অঞ্চল, পাহাড়ি অঞ্চল, খরা ও লবণাক্ততাপ্রবণ অঞ্চলে আউশ, আমন ও বোরো ধানের বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি জাতকে সম্পৃক্ত করে ১১ ধরনের শস্য বিন্যাসের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিশেষ করে খরাপ্রবণ এলাকায় স্বল্পমেয়াদি আমনের জাত সম্প্রসারণে উচ্চফলনশীল জাতের চাষাবাদ করা হচ্ছে।

জাতীয় কৃষিনীতি প্রণয়ন: প্রণীত হয়েছে জাতীয় কৃষিনীতি ২০২০। এ নীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সব শ্রেণীর কৃষক ও উদ্যোক্তাদের চাহিদাভিত্তিক প্রযুক্তি ও তথ্যসেবা প্রদানের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঘাত সহনশীল, পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ, টেকসই ও পুষ্টিসমৃদ্ধ লাভজনক ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করা। সমৃদ্ধ কৃষির অগ্রযাত্রায় সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং এসডিজি বাস্তবায়ন শীর্ষক পরিকল্পনা দলিল প্রণয়ন করা হয়েছে। এ দলিলে কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি, খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে মোট ছয়টি থিমেটিক কৌশল, কৃষি গবেষণা ও উন্নয়ন, গুণগত মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ, কৃষি সম্প্রসারণ, সেচকাজে পানিসম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন নিশ্চিত করা হয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ: বাংলাদেশ মাছ, মাংস ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে এবং দুধ উৎপাদনে অচিরেই স্বযংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ খাত দেশের অভ্যন্তরীণ আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য এবং প্রাণিজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম এবং তেলাপিয়া উৎপাদনে চতুর্থ ও এশিয়ার মধ্যে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। গ্রামীণ মৎস্যচাষী, জেলে ও মৎস্যজীবীদের তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে দেশব্যাপী জেলে নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান এবং ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here