বুদ্ধিমান সভ্যতার খোঁজে

0
37

ওমর ফারুক
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের জল্পনাকল্পনা প্রসারিত হচ্ছে বহির্বিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে। ছোট্ট শিশুটি থেকে বড় বিজ্ঞানী, সবারই জানার ইচ্ছাÍসত্যিই কি পৃথিবীর বাইরে বুদ্ধিমান এলিয়েন আছে? যদি থাকে, তারা দেখতে কেমন হবে? অনেকেই এদের কল্পনা করে ভয়ংকর প্রাণী হিসেবে, কেউ আবার মনে করে বন্ধুসুলভ প্রাণী তারা। কেউ এদের নিয়ে ছবি এঁকেছে, কেউ গল্প লিখেছে, কেউ বানিয়েছে চলচ্চিত্র। বিজ্ঞানীরাও কিন্তু বসে থাকেননি। তাঁরা নানাভাবে জানার চেষ্টা করে চলেছেন, সত্যিই কি বুদ্ধিমান প্রাণী পাওয়া যাবে মহাবিশ্বের অন্য কোনো তারায়, অন্য কোনো গ্যালাক্সিতে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে নানা সময় নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। সাম্প্রতিক কালে সবচেয়ে বড় উদ্যোগটা মাঠে নামানো হয়েছে, যেটার নাম ব্রেকথ্রু লিসেন।
পৃথিবীপৃষ্ঠে থাকা চারটি রেডিও টেলিস্কোপে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে চলছে প্রজেক্টটি। এ ধরনের উদ্যোগকে বলা হয়ে থাকে সার্চ ফর এক্সট্রাটেরিস্ট্রিয়াল ইন্টেলিজেন্স (ঝঊঞও)। বহির্বিশ্বে বুদ্ধিমান প্রাণের খোঁজে এত বড় উদ্যোগ যে আগে নেওয়া হয়নি, হলফ করেই বলা যায়। আগের সেই প্রজেক্টগুলো এক বছরে যত তথ্য জোগাড় করত, সেই পরিমাণ তথ্য এই প্রজেক্ট জোগাড় করছে এক দিনেই। আগেরগুলোর চেয়ে এটি আকাশের প্রায় দশ গুণ বেশি অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, আগের প্রজেক্টগুলোর তুলনায় এই প্রজেক্ট কাজ করে চলেছে অন্তত এক শ গুণ দ্রুতগতিতে। এর তথ্য পর্যবেক্ষণ আর বিশ্লেষণের ধরনও খানিকটা আলাদা।
২০১৫ সালের ২০ জুলাই লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে প্রথম ঘোষণা করা হয় প্রজেক্টটি। তখন থেকেই এতে কাজ করছেন ফ্রাঙ্ক ড্রেক, অ্যান্ড্রু সিমিয়নের মতো নামকরা অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী। বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীর স্বাক্ষর করা এক চিঠি পেশ করা হয় সেই ঘোষণার সঙ্গে, যেখানে স্বাক্ষর ছিল পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়েরও। প্রজেক্টটি নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘এই অফুরন্ত মহাবিশ্বে নিশ্চয়ই আরও প্রাণ আছে। এর চেয়ে বড় কোনো প্রশ্ন নেই। সময় এসেছে এর উত্তর খুঁজতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার।’
আগে এ ধরনের যত প্রজেক্ট শুরু হয়েছিল, প্রায় সব কটিকেই ভুগতে হয়েছে অর্থসংস্থানের অভাবে। এই প্রথম অনিশ্চিত এ গবেষণায় পাওয়া গেল বেশ বড় অঙ্কের তহবিল-এক শ মিলিয়ন ডলার! দশ বছরমেয়াদি এই প্রজেক্ট রাশিয়ান ধনকুবের ইউরি মিলনারের নেওয়া ব্রেকথ্রু ইনিশিয়েটিভসের অংশ। ইনিশিয়েটিভসের অন্য প্রজেক্টগুলোও কাজ করছে বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব নির্ণয় আর যোগাযোগ নিয়েই। এর মধ্যে ব্রেকথ্রু মেসেজ কাজ করে বুদ্ধিমান এলিয়েনের সঙ্গে যোগাযোগের নৈতিকতা নিয়ে। বুদ্ধিমান প্রাণী যদি অন্য কোথাও থেকে থাকে, আর তারা যদি আমাদের অবস্থান জেনে যায়, তবে সেটা আমাদের জন্য হুমকির বিষয় হবে কি না, সেটা নিয়ে একটা বিতর্ক চলছে অনেক দিন ধরেই। এই প্রজেক্টে ১ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করা আছে একটি ডিজিটাল বার্তা তৈরির জন্য, যেটি পৃথিবী ও মানবসভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। বার্তাটি মহাশূন্যে পাঠানো হবে, যেন অন্য কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী থেকে থাকলে তারা আমাদের কথা জানতে পারে। তবে বিতর্কের অবসান হওয়ার আগে কোনো সংকেতই মহাশূন্যে প্রেরণ করা হচ্ছে না, সে সম্বন্ধে নিশ্চিত করা হয়েছে প্রজেক্টের বিজ্ঞানীদের পক্ষ থেকে।
এ ছাড়া ব্রেকথ্রু স্টারশট কাজ করবে খুব কম ভরের অনেক লাইট সেইলভিত্তিক স্পেসক্রাফট তৈরি নিয়ে, যেগুলো সূর্যের নিকটতম তারা আলফা সেন্টরাইতে আলোর ২০ শতাংশ গতিতে অর্থাৎ সেকেন্ডে ৬০ হাজার কিলোমিটার বেগে যেতে পারবে। অর্থাৎ ২০ বছরে পৌঁছাতে পারবে ওই তারার প্রক্সিমা সেন্টরাই বি নামের গ্রহে। আর এটি সেখানে সফলভাবে পৌঁছানোর তথ্য পাঠাতে সময় নেবে চার বছর।
ব্রেকথ্রু ওয়াচ নামের প্রজেক্টের কাজ হলো বাসযোগ্য গ্রহের সন্ধান। পৃথিবীর ২০ আলোকবর্ষের মধ্যে থাকা সব তারার যেসব গ্রহ আমাদের মতো সুবিধাজনক অঞ্চলে আছে, তার খোঁজ করা হচ্ছে এই প্রজেক্টে। খুঁজে দেখা হবে, পৃথিবীর মতো অক্সিজেনসমৃদ্ধ বায়ুম-ল আর পাথুরে গ্রহ, যেখানে বাঁচতে পারবে প্রাণ।
পৃথিবীর কাছাকাছি থাকা ১০ লাখ তারার কোনো গ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না, তা নির্ণয় করা যেতে পারে সেখান থেকে আসা বেতার তরঙ্গ কিংবা লেজারসংকেত বিশ্লেষণ করে। ব্রেকথ্রু লিসেনে সে কাজটিই করা হচ্ছে। এতে আশপাশের গ্যালাক্সি থেকে আসা নানা রকম বিদ্যুচ্চুম্বকীয় তরঙ্গকে বিশ্লেষণ করা হয়। এ জন্য উত্তর গোলার্ধে আছে গ্রিন ব্যাংক রেডিও টেলিস্কোপ, যেটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নড়নক্ষম (স্টিয়ারেবল) রেডিও টেলিস্কোপ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় অবস্থিত। এর মূল ডিশের আকার এত বড় যে আস্ত একটা ফুটবল মাঠের মধ্যে এঁটে যাবে! দক্ষিণ গোলার্ধে সংকেত গ্রহণে কাজ করছে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত পার্কস অবজারভেটরি।
দুই গোলার্ধের এই দুই টেলিস্কোপ বছরে কয়েক হাজার ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করবে ১ থেকে ১০ গিগাহার্টজ কম্পাঙ্কের সংকেতের জন্য। বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গের অঞ্চলটিকে বলা হয়ে থাকে ‘নিঃশব্দ অঞ্চল’। কারণ, এই কম্পাঙ্কের মধ্যে থাকা রেডিও তরঙ্গ পৃথিবীর বায়ুম-ল কিংবা মহাজাগতিক কোনো সংকেত দিয়ে বাধাগ্রস্ত হয় না। কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী যদি চায় যে তাদের পাঠানো সংকেত কেউ গ্রহণ করুক, তাহলে এই সীমার মধ্যেই তাদের রেডিও সংকেত পাঠানোর কথা। যদি এই কম্পাঙ্কের তরঙ্গ কোনো একটি তারা থেকে আসা সংকেতে পাওয়া যায়, তবে আশা করা যেতে পারে, সেটি বুদ্ধিমান প্রাণীর দ্বারা তৈরি সংকেত। আমরা মানুষেরা যেমন যোগাযোগের কাজে এসব দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ ব্যবহার করি, দূর তারার কোনো এলিয়েনও হয়তো যোগাযোগের উদ্দেশ্যে এ রকম সংকেত তৈরি করে থাকবে।
প্রজেক্টের আর দুটি টেলিস্কোপের একটি হলো চীনের ফাইভ হানড্রেড মিটার অ্যাপারচার স্ফেরিক্যাল টেলিস্কোপ (ঋঅঝঞ)। আর অপটিক্যাল লেজার সংকেত নিয়ে কাজ করছে লিক অবজারভেটরির অটোমেটেড প্ল্যানেট ফাইন্ডার। এ ছাড়া প্রজেক্টটির সঙ্গে গত ৩১ মে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের জডরেল ব্যাংক অবজারভেটরি। আগেই বলা হয়েছে, প্রজেক্টের টেলিস্কোপগুলো কাজ করবে আমাদের পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থিত প্রায় ১০ লাখ তারা নিয়ে। এর মধ্যে বিশেষ কিছু লক্ষ্যও আছে। ১৬ দশমিক ৩ আলোকবর্ষের মধ্যে মোট ৪৩টি তারার সব কটিকেই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া প্রায় ১৬৩ আলোকবর্ষের মধ্যে থাকা সব ধরনের ১ হাজার তারা থেকে আসা সংকেতকে বিশ্লেষণ করা হবে। পৃথিবীর কাছে থাকা প্রায় ১০০ গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় অঞ্চলকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এর মধ্যে সব রকম গ্যালাক্সিই আছে। আর ২০টি সাদা বামন তারা, ২০টি নিউট্রন তারা আর ২০টি কৃষ্ণগহ্বরকেও পর্যবেক্ষণ করা হবে এই প্রজেক্টের আওতায়। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে প্রথম পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু হয়।
যত তথ্য এই রেডিও টেলিস্কোপগুলো গ্রহণ করে, সবই বিশ্লেষণের জন্য ব্রেকথ্রু ইনিশিয়েটিভসের ওপেন ডেটা আর্কাইভে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। যে কেউ ইচ্ছা করলে প্রজেক্টের মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার করে তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে সাহায্য করতে পারে। এই তথ্যগুলো ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির সেটি অ্যাট হোম-এর স্বেচ্ছাসেবী কম্পিউটার নেটওয়ার্কেও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে ২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে। বড় সব রেডিও টেলিস্কোপে পাওয়া এই সংকেতগুলো সাধারণ মানুষের কম্পিউটারেই নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যাচ্ছে। বিশাল সুপার কম্পিউটারের বদলে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত কম্পিউটারগুলো একসঙ্গে অসাধ্যকে সাধন করে চলছে।
ব্রেকথ্রু লিসেন প্রজেক্টের আওতায় এত দিন পর্যন্ত যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, সেসব বিশ্লেষণ করে পাওয়া ফল প্রকাশ করা হয়েছে এই এপ্রিলে। ২০-২১ এপ্রিল স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত ব্রেকথ্রু ডিসকাস (ইৎবধশঃযৎড়ঁময ফরংপঁংং) কনফারেন্সে প্রথমবারের মতো প্রকাশ করা হয় এসব বিশ্লেষিত তথ্য। গবেষণার তথ্যগুলো প্রকাশের জন্য দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নালে জমা দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে।
প্রকাশ করা তথ্যগুলো পাওয়া গেছে গ্রিন ব্যাংক রেডিও টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ থেকে। এটি ৪০০ ঘণ্টা ধরে ৬৯২টি তারা থেকে আসা ১ দশমিক ১ থেকে ১ দশমিক ৯ গিগাহার্টজের তরঙ্গকে পর্যবেক্ষণ করেছে। প্রতিটি তারা ৩-৫ মিনিট ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ৪ হাজার ৭৬৮টি পর্যবেক্ষণের মধ্যে বিজ্ঞানীরা ১১টি পর্যবেক্ষণকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু আরও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এগুলো টেরিস্ট্রিয়াল ব্যতিচারের ফল, যা হয়তো আমাদের স্যাটেলাইটগুলো থেকেই তৈরি।
এই যাত্রায় তেমন কিছু না পাওয়ার পরও আমরা জেনেছি অতিগুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য। আমাদের চারপাশে ১৬০ আলোকবর্ষের মধ্যে কোনো তারা থেকে ১-২ গিগাহার্টজ কম্পাঙ্কের কোনো ন্যারো ব্যান্ড রেডিও তরঙ্গ নিঃসৃত হয় না। আমাদের জিপিএস স্যাটেলাইট, কিংবা ফোনগুলো থেকে এ ধরনের তরঙ্গ নির্গত হয়। তাই বলা যেতে পারে, এই অঞ্চলে কেউ আমাদের মতো এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে না। পাওয়া তথ্যগুলো তো আছেই, সেই সঙ্গে ১০ বছরে যোগ হবে নানা দৈর্ঘ্যের মহাজাগতিক তরঙ্গের বিশাল এক তথ্যভান্ডার। কাছেপিঠে কোথাও বুদ্ধিমান প্রাণী আছে কি নেই, সব তথ্য ঘেঁটে এটুকু সিদ্ধান্তে পৌঁছার আশা করা যায়। এত সব কর্মযজ্ঞের পরও যদি কোনো বুদ্ধিমান এলিয়েনের খোঁজ না মেলে, তাহলে হয় ও রকম প্রাণের অস্তিত্ব নেই, কিংবা তারা সম্ভবত এত দূরে যে আমাদের বর্তমান সভ্যতার হয়তো তাদের সঙ্গে দেখা হবে না কখনো।
এ ছাড়া ব্রেকথ্রু স্টারশট কাজ করবে খুব কম ভরের অনেক লাইট সেইলভিত্তিক স্পেসক্রাফট তৈরি নিয়ে, যেগুলো সূর্যের নিকটতম তারা আলফা সেন্টরাইতে আলোর ২০ শতাংশ গতিতে অর্থাৎ সেকেন্ডে ৬০ হাজার কিলোমিটার বেগে যেতে পারবে। অর্থাৎ ২০ বছরে পৌঁছাতে পারবে ওই তারার প্রক্সিমা সেন্টরাই বি নামের গ্রহে। আর এটি সেখানে সফলভাবে পৌঁছানোর তথ্য পাঠাতে সময় নেবে চার বছর।
ব্রেকথ্রু ওয়াচ নামের প্রজেক্টের কাজ হলো বাসযোগ্য গ্রহের সন্ধান। পৃথিবীর ২০ আলোকবর্ষের মধ্যে থাকা সব তারার যেসব গ্রহ আমাদের মতো সুবিধাজনক অঞ্চলে আছে, তার খোঁজ করা হচ্ছে এই প্রজেক্টে। খুঁজে দেখা হবে, পৃথিবীর মতো অক্সিজেনসমৃদ্ধ বায়ুমন্ডল আর পাথুরে গ্রহ, যেখানে বাঁচতে পারবে প্রাণ।
পৃথিবীর কাছাকাছি থাকা ১০ লাখ তারার কোনো গ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না, তা নির্ণয় করা যেতে পারে সেখান থেকে আসা বেতার তরঙ্গ কিংবা লেজারসংকেত বিশ্লেষণ করে। ব্রেকথ্রু লিসেনে সে কাজটিই করা হচ্ছে। এতে আশপাশের গ্যালাক্সি থেকে আসা নানা রকম বিদ্যুচ্চুম্বকীয় তরঙ্গকে বিশ্লেষণ করা হয়। এ জন্য উত্তর গোলার্ধে আছে গ্রিন ব্যাংক রেডিও টেলিস্কোপ, যেটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নড়নক্ষম (স্টিয়ারেবল) রেডিও টেলিস্কোপ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় অবস্থিত। এর মূল ডিশের আকার এত বড় যে আস্ত একটা ফুটবল মাঠের মধ্যে এঁটে যাবে! দক্ষিণ গোলার্ধে সংকেত গ্রহণে কাজ করছে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত পার্কস অবজারভেটরি।
দুই গোলার্ধের এই দুই টেলিস্কোপ বছরে কয়েক হাজার ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করবে ১ থেকে ১০ গিগাহার্টজ কম্পাঙ্কের সংকেতের জন্য। বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গের অঞ্চলটিকে বলা হয়ে থাকে ‘নিঃশব্দ অঞ্চল’। কারণ, এই কম্পাঙ্কের মধ্যে থাকা রেডিও তরঙ্গ পৃথিবীর বায়ুম-ল কিংবা মহাজাগতিক কোনো সংকেত দিয়ে বাধাগ্রস্ত হয় না। কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী যদি চায় যে তাদের পাঠানো সংকেত কেউ গ্রহণ করুক, তাহলে এই সীমার মধ্যেই তাদের রেডিও সংকেত পাঠানোর কথা। যদি এই কম্পাঙ্কের তরঙ্গ কোনো একটি তারা থেকে আসা সংকেতে পাওয়া যায়, তবে আশা করা যেতে পারে, সেটি বুদ্ধিমান প্রাণীর দ্বারা তৈরি সংকেত। আমরা মানুষেরা যেমন যোগাযোগের কাজে এসব দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ ব্যবহার করি, দূর তারার কোনো এলিয়েনও হয়তো যোগাযোগের উদ্দেশ্যে এ রকম সংকেত তৈরি করে থাকবে।
প্রজেক্টের আর দুটি টেলিস্কোপের একটি হলো চীনের ফাইভ হানড্রেড মিটার অ্যাপারচার স্ফেরিক্যাল টেলিস্কোপ (ঋঅঝঞ)। আর অপটিক্যাল লেজার সংকেত নিয়ে কাজ করছে লিক অবজারভেটরির অটোমেটেড প্ল্যানেট ফাইন্ডার। এ ছাড়া প্রজেক্টটির সঙ্গে গত ৩১ মে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের জডরেল ব্যাংক অবজারভেটরি। আগেই বলা হয়েছে, প্রজেক্টের টেলিস্কোপগুলো কাজ করবে আমাদের পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থিত প্রায় ১০ লাখ তারা নিয়ে। এর মধ্যে বিশেষ কিছু লক্ষ্যও আছে। ১৬ দশমিক ৩ আলোকবর্ষের মধ্যে মোট ৪৩টি তারার সব কটিকেই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া প্রায় ১৬৩ আলোকবর্ষের মধ্যে থাকা সব ধরনের ১ হাজার তারা থেকে আসা সংকেতকে বিশ্লেষণ করা হবে। পৃথিবীর কাছে থাকা প্রায় ১০০ গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় অঞ্চলকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এর মধ্যে সব রকম গ্যালাক্সিই আছে। আর ২০টি সাদা বামন তারা, ২০টি নিউট্রন তারা আর ২০টি কৃষ্ণগহ্বরকেও পর্যবেক্ষণ করা হবে এই প্রজেক্টের আওতায়। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে প্রথম পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু হয়।
যত তথ্য এই রেডিও টেলিস্কোপগুলো গ্রহণ করে, সবই বিশ্লেষণের জন্য ব্রেকথ্রু ইনিশিয়েটিভসের ওপেন ডেটা আর্কাইভে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। যে কেউ ইচ্ছা করলে প্রজেক্টের মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার করে তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে সাহায্য করতে পারে। এই তথ্যগুলো ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির সেটি অ্যাট হোম-এর স্বেচ্ছাসেবী কম্পিউটার নেটওয়ার্কেও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে ২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে। বড় সব রেডিও টেলিস্কোপে পাওয়া এই সংকেতগুলো সাধারণ মানুষের কম্পিউটারেই নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যাচ্ছে। বিশাল সুপার কম্পিউটারের বদলে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত কম্পিউটারগুলো একসঙ্গে অসাধ্যকে সাধন করে চলছে।
ব্রেকথ্রু লিসেন প্রজেক্টের আওতায় এত দিন পর্যন্ত যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, সেসব বিশ্লেষণ করে পাওয়া ফল প্রকাশ করা হয়েছে এই এপ্রিলে। ২০-২১ এপ্রিল স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত ব্রেকথ্রু ডিসকাস (ইৎবধশঃযৎড়ঁময ফরংপঁংং) কনফারেন্সে প্রথমবারের মতো প্রকাশ করা হয় এসব বিশ্লেষিত তথ্য। গবেষণার তথ্যগুলো প্রকাশের জন্য দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নালে জমা দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে।
প্রকাশ করা তথ্যগুলো পাওয়া গেছে গ্রিন ব্যাংক রেডিও টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ থেকে। এটি ৪০০ ঘণ্টা ধরে ৬৯২টি তারা থেকে আসা ১ দশমিক ১ থেকে ১ দশমিক ৯ গিগাহার্টজের তরঙ্গকে পর্যবেক্ষণ করেছে। প্রতিটি তারা ৩-৫ মিনিট ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ৪ হাজার ৭৬৮টি পর্যবেক্ষণের মধ্যে বিজ্ঞানীরা ১১টি পর্যবেক্ষণকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু আরও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এগুলো টেরিস্ট্রিয়াল ব্যতিচারের ফল, যা হয়তো আমাদের স্যাটেলাইটগুলো থেকেই তৈরি।
এই যাত্রায় তেমন কিছু না পাওয়ার পরও আমরা জেনেছি অতিগুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য। আমাদের চারপাশে ১৬০ আলোকবর্ষের মধ্যে কোনো তারা থেকে ১-২ গিগাহার্টজ কম্পাঙ্কের কোনো ন্যারো ব্যান্ড রেডিও তরঙ্গ নিঃসৃত হয় না। আমাদের জিপিএস স্যাটেলাইট, কিংবা ফোনগুলো থেকে এ ধরনের তরঙ্গ নির্গত হয়। তাই বলা যেতে পারে, এই অঞ্চলে কেউ আমাদের মতো এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে না। পাওয়া তথ্যগুলো তো আছেই, সেই সঙ্গে ১০ বছরে যোগ হবে নানা দৈর্ঘ্যের মহাজাগতিক তরঙ্গের বিশাল এক তথ্যভান্ডার। কাছেপিঠে কোথাও বুদ্ধিমান প্রাণী আছে কি নেই, সব তথ্য ঘেঁটে এটুকু সিদ্ধান্তে পৌঁছার আশা করা যায়। এত সব কর্মযজ্ঞের পরও যদি কোনো বুদ্ধিমান এলিয়েনের খোঁজ না মেলে, তাহলে হয় ও রকম প্রাণের অস্তিত্ব নেই, কিংবা তারা সম্ভবত এত দূরে যে আমাদের বর্তমান সভ্যতার হয়তো তাদের সঙ্গে দেখা হবে না কখনো।
লেখক: শিক্ষার্থী, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: ব্রেকথ্রু ইনিশিয়েটিভ ডট ওআরজি, উইকিপিডিয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here