পদ-পদবী নিয়ে মণিরামপুর বিএনপির কোন্দল চরমে

0
56

মিজানুর রহমান, মণিরামপুর
পদ-পদবী দখলে নিতে চরম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন যশোরের মণিরামপুর বিএনপি। দলের কেন্দ্রীয় কর্মসূচীও পালন করা হচ্ছে পৃথক পৃথক ভাবে তিনটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে। দলের তিন নেতার এ দ্বন্দ্বে উপজেলার বিএনপির সাধারণ কর্মী সমর্থকরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের সমাধান চাচ্ছেন তারা।
গত রোববার (৩০ শে মে) দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যু বার্ষিকী পালিত হয়েছে পৃথক তিনটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে। এ ঘটনার পর চরম হতাশ দলের সাধারণ কর্মী সমর্থকেরা। এদিন থানা বিএনপির বর্তমান সভাপতি এ্যাড. শহীদ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে তার বাড়ি সংলগ্ন সংগঠনের কার্যালয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী পালন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ্যাড. সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। পৌর শহরের দক্ষিণ বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় যশোর জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য আলহাজ্ব মোহাম্মদ মুছা তার অনুসারীদের নিয়ে শাহাদাত বার্ষিকী পালন করেছেন। একই সময়ে পৌরসভাধীন দূর্গাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় নেতা ইফতেখার সেলিম অগ্নির নেতৃত্বে শাহাদাত বার্ষিকী পালন করা হয়।
এদিনের ঘটনায় দলের সাধারণ কর্মীরা বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কর্মীরা কোন নেতার কাছে গেলে তা বিপক্ষ গ্রুপ থেকে তাকে নানাভাবে হয়রানি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব ঘটনার দলের এক কর্মী বিল্লাল হোসেনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাংচুরসহ একাধিক নেতা কর্মীকে মারপিটের ঘটনাও ঘটেছে সম্প্রতি। এতে করে সু-সংগঠিত বিএনপি এখন লন্ডভন্ড হতে চলেছে বলে মনে করছেন অনেকেই। থানা বিএনপির সভাপতি এ্যাড. শহীদ ইকবাল হোসেন উপজেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বে আসেন ২০০৩ সালে।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত ১৮টি বছর এ্যাড. শহীদ ইকবাল হোসেন তার অনুসারীদের নিয়ে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম করে চলেছেন। কেউ কেউ এটিকে শহীদ ইকবাল হোসেনের পকেট কমিটি হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন।
তবে এসব অভিযোগ নাকোচ করে এ্যাড. শহীদ ইকবাল হোসেন বলেছেন, বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল। সকলকে নিয়েই সংগঠন চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, বিএনপি একটি বড় দল। সেই হিসেবে দলের নেতা-কর্মীদের মাঝে মান-অভিমান থাকতেই পারে।
যশোর জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য আলহাজ্ব মোহাম্মদ মুছা জানিয়েছেন, ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দলের সাধারণ সম্পাদক হয়ে মণিরামপুরে বিএনপিকে সু-সংগঠিত করা হয়েছিল। এরপর ১৯৯০ থেকে ২০০২ পর্যন্ত মণিরামপুর বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। দলের বর্তমান সভাপতি এ্যাড. শহীদ ইকবাল হোসেন দলের সভাপতি হয়ে দলের অনেকেই সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। দলের বর্তমান প্রেক্ষাপট তা আগের অবস্থানে নেই। বর্তমানে দলের সাধারণ কর্মী সমর্থকদের সংগঠন মুখী করতে নতুন করে চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি দাবী করেন, বয়সের শেষ প্রান্তে এসে শক্ত হাতে হাল ধরার চেষ্টা করে চলেছি। এছাড়া বয়সের শেষ প্রান্তে এসে দলের কাছে কিছুই চাওয়া পাওয়া নেই। ইচ্ছা আছে আগামী সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার। তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, বর্তমান দলের অবস্থানকে সু-সংগঠিত করতে দলের নেতাদের নিয়ে উপজেলার গ্রাম গঞ্জে কাজ করা হচ্ছে। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর দলের নেতা-কর্মীরা হামলা-মামলার শিকার হয়ে অনেকেই নি:স্ব অবস্থায় জীবন-যাপন করছেন। এ অবস্থায় তাদের পাশে দাড়িয়ে বিএনপিকে আগের অবস্থানে আনতে চেষ্টা চলছে।
সাবেক ছাত্রনেতা ও বর্তমান জাতীয়তাবাদী কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ইফতেখার সেলিম অগ্নি মণিরামপুর বিএনপিকে গতিশীল করতে হাল ধরেছেন। বর্তমানে এ উপজেলার প্রত্যান্ত অঞ্চল পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ বিএনপি নেতাকর্মীদের খোঁজ খবর নিচ্ছেন। এ নেতা উপজেলা জাতীয়তবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল এবং উপজেলা জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলকে নিয়ে সাংগঠনিক অবস্থান মজবুত করতে কাজ করে চলেছেন।
ইফতেখার সেলিম অগ্নি ১৯৯৬ সালে যশোর জেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, ১৯৯১ তে জেলা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক এবং ১৯৮৮ তে স্বৈরাচার এরশাদ হঠাও আন্দোলনের সময় যশোর এম এম কলেজের প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে মণিরামপুর বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে সংগঠনকে সু-সংহত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। ইফতেখার সেলিম অগ্নি জানিয়েছেন, মণিরামপুর বিএনপিকে গ্রুপিং করতে নয়, এ্যাড. শহীদ ইকবাল হোসেনের পারিবারিক সংগঠন থেকে সকলকে বের করতে তিনি কাজ করে চলেছেন।
খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, ইফতেখার সেলিম অগ্নি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল ছাড়াও উপজেলা পৌরসভা এবং কলেজ ছাত্রদলের একাংশ এবং সাবেক ছাতনেতা জাহাঙ্গীর হোসেন, ফিরোজ হোসেনসহ স্থানীয় যুবকদের সঙ্গে নিয়েই সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করার কাজ অব্যাহত রয়েছেন। তবে পৃথক এই তিন নেতার সাংগঠনিক কর্মকান্ডকে ভালভাবে নিচ্ছেন না অনেকেই।
এদিকে, মণিরামপুর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটিকে খুব শিঘ্রই বিলুপ্তি ঘোষনা করে আহবায়ক কমিটি গড়তে যাচ্ছেন এমন সংবাদ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মুখেমুখে। কথা উঠেছে থানা বিএনপির আহবায়ক কমিটিতে আহবায়ক হতে নতুন করে চেষ্টা করে চলেছেন প্রাক্তন সভাপতি মোহাম্মদ মুছা। তবে তার এ চেষ্টাকে দলের অনেকেই উড়িয়ে দিচ্ছেন। তাদের দাবী যে ভাবেই আসুক না কেন উপজেলা বিএনপির আহবায়কই হবেন দলের বর্তমান সভাপতি এ্যাড. শহীদ ইকবাল হোসেন।
খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, আহবায়ক কমিটিকে সদস্য সচিবের পদ পেতে তিন নেতার সম্ভাব্য প্রার্থীরা জোর লবিং গ্রুপিং অব্যাহত রেখেছেন দলের নীতিনির্ধারকদের কাছে। থানা বিএনপির সভাপতি এ্যাড. শহীদ ইকবাল হোসেনের পক্ষ থেকে মফিজুর রহমান মফিজ, এ্যাড. মকবুল ইসলাম, আসাদুজ্জামান মিন্টু এবং পৌর বিএনপির বর্তমান সভাপতি খায়রুল ইসলাম চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। মুছা গ্রুপ থেকে ঢাকুরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সাবেক চেয়ারম্যান জিএম মিজানুর রহমান এবং থানা কৃষক দলের আহবায়ক এ্যাড. মুজিবুর রহমান এ পদে আসতে চাচ্ছেন।
ইফতেখার সেলিম অগ্নি গ্রুপ থেকে সদস্য সচিব পদে আসতে চেষ্টা চালাচ্ছেন থানা বিএনপির কোষাদক্ষ ও মণিরামপুর সদর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ডা. আলতাফ হোসেন। এ ছাড়া পৌর বিএনপির অগ্নি গ্রুপ থেকে সাবেক ছাত্রনেতা ও ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন এবং মুছা গ্রুপ থেকে শাহিনুর রহমান পান্না আহবায়ক হতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দলের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে। দলের এসব লবিং গ্রুপিং নিয়ে কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছেন না ইউনিয়ন পর্যায়ের বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতারা।
উপজেলার কাশিমনগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম আহাদ আলী বলেছেন, মণিরামপুর বিএনপির যে অবস্থায় পৌছুয়েছে তা আগামীদের জন্য ভাল কিছু ভাবা যাচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে উপায় কেবল মাত্র লবিং গ্রুপিং বাদ দিয়েই এক কাতারে সামিল হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
নেহালপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাজমুস শাহাদাৎ বলেন, মণিরামপুর বিএনপির বর্তমান যে অবস্থা, তা ভালো কোন বার্তা দিচ্ছে না। দলকে ধরে রাখতে হলে সকলকে অচিরেই এক কাতারে মিলিত হতে হবে।
ঢাকুরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি, সাবেক চেয়ারম্যান জিএম মিজানুর রহমান জানান, মণিরামপুর বিএনপিকে ধ্বংস করেছে বর্তমান সভাপতি এ্যাড. শহীদ ইকবাল হোসেন। তার এই একনায়কতন্ত্র থেকে বিএনপিকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে। পৌর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ কুমার স্বর বলেছেন, মণিরামপুর বিএনপিকে ধরে রাখতে হলে শহীদ ইকবালের মতো নেতাকে সভাপতি প্রয়োজন। এক প্রশ্নের জবাবে সন্তোষ স্বর জানান, যারা এ্যাড. শহীদ ইকবালের বিরোধ করে বিএনপির রাজনীতি করছেন তারা বিএনপির কেউ নন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here