করোনা একটু বাড়লেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয় : জেলা প্রশাসক

0
61

সত্যপাঠ রিপোর্ট

করোনা পরিস্থিতি এবং তা নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেছেন, জেলায় করোনা সংক্রমণ একটু বৃদ্ধি পেয়েছে ঠিক; কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। যশোরে করোনা প্রতিরোধ কমিটি প্রতিনিয়ত এসব বিষয়ে আলোচনা করছে।
তিনি জানান, করোনা নিয়ন্ত্রণে যেসব স্বাস্থ্যবিধি আরোপিত আছে, তা আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে এবং জনসচেতনতায় আরও বেশি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি যদি অনুকূলে না থাকে তবে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন পিছপা হবে না।
বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এই সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন। সভায় অন্যদের মধ্যে যশোরের পুলিশ সুপার প্রলয়কুমার জোয়ারদার, সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন প্রমুখ আলোচনা করেন।

সভায় সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন বলেন, সীমান্তবর্তী জেলা যশোরে দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর, বিমানবন্দর, রেলজংশন আছে। সড়ক যোগাযোগে বহু জেলার সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে যশোর। সেক্ষেত্রে করোনাসহ যেকোনও নতুন রোগ সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই জেলা ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২০ সালে প্রতিদিন গড়ে ১০০ জন সংক্রমিতও হয়েছে। কিন্তু এই বছরের এপ্রিলে সংক্রমণের হার ছিল ২৫ শতাংশ, মে মাসে ১৮ শতাংশ আর জুন মাসের এই তিনদিনের প্রথম দিনে ২৮-২৯ শতাংশ, দ্বিতীয় দিনে ২৩ শতাংশ এবং আজকে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

তিনি বলেন, ‘ভারতফেরত কোয়ারেন্টিন শেষ করা যাত্রীদের মধ্যে সংক্রমণের হার খুবই নগণ্য। আজ ১০০ জনের পরীক্ষা করে দুইজনের পজেটিভ শনাক্ত হয়েছে। আমরা এইসব বিষয় পর্যবেক্ষণে রেখেছি; তবে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়।’

সভায় লিখিত বক্তব্যে জেলা প্রশাসক জানান, সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় করোনাভাইরাস মোকাবেলায় যশোর জেলার চ্যালেঞ্জ বহুমুখী। ভারতে করোনা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানে মারাত্মক ভারতীয় ধরন আবিষ্কৃত হয়। এর ফলে বাংলাদেশ সরকার ভারতের সীমান্তে যাত্রীদের আগমন ও বহির্গমন বন্ধ করে দেয়।

এতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক আটকা পড়েন ভারতে। দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশন ও কলকাতায় উপ হাই কমিশন থেকে বিশেষ অনুমতিক্রমে আটকে পড়া যাত্রীদের দেশে ফেরার জন্য যশোর জেলার বেনাপোল স্থলবন্দর উন্মুক্ত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৬ এপ্রিল ছয়জন বাংলাদেশি যাত্রী বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করলে জেলা প্রশাসন তাদের গ্রহণ করে। শুরু হয়, যশোর জেলায় ভারতীয় যাত্রীদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন; যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। ২ জুন পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে চার হাজার ৩৭১ জন প্রবেশ করেছে। গতকাল (২ জুন) ৭০ জন যাত্রী প্রবেশ করেছে।

ভারতফেরত যাত্রীদের কোয়ারেন্টিনে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে বেনাপোল এলাকায় ১৩টি হোটেল, ঝিকরগাছা উপজেলার গাজীর দরগাহ মাদরাসা হোস্টেল এবং যশোর শহরের ১৯টি হোটেল নির্ধারণ করা হয়। এছাড়াও শেখ হাসিনা আইটি পার্ক, এফপিএবির হোস্টেলসহ মোট ২০টি স্থানে কোয়ারেন্টিনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়। প্রত্যেক হোটেলে জেলায় কর্মরত সরকারি অফিসারদের মধ্য হতে ট্যাগ অফিসার ও চিকিৎসককে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। কয়েকদিনের মধ্যেই যাত্রীর চাপে এসব হোটেলসমূহ পূর্ণ হয়ে গেলে তাদের অন্য জেলায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। খুলনা, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, মাগুরা, কুষ্টিয়া ও বাগেরহাটে এ পর্যন্ত এসব জেলায় এক হাজার ৬১৮ জনকে পাঠানো হয়েছে। এই সময়ে ২৯টি লাশ গ্রহণ করে অ্যাম্বুলেন্সে তাদের নিজেদের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। ২৬ এপ্রিলের মোট ১৩ জন সার্টিফাইড কোভিড রোগী গ্রহণ করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বলা প্রয়োজন, ভারতফেরত যাত্রীরা কেউই প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে আগ্রহী ছিলেন না। তারা আর্থিক ও মানসিভাবে মোটেও রাজি হচ্ছিলেন না। সেক্ষেত্রে হোটেলগুলোতে কথা বলে অল্প টাকায় তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ভারত থেকে দেশে প্রবেশের সময় যাত্রীদের পাসপোর্ট জমা রাখা হয়। ১৪ দিন শেষে তাদের প্রত্যেককে পিসিআর টেস্টে অংশ নিতে হয়। এই টেস্টে নেগেটিভ ফলাফল এলেই কেবল তাদের লিখিত ছাড়পত্র ও পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়। এপর্যন্ত যশোর জেলায় কোয়ারেন্টিন শেষে ২৫ জন পজেটিভ হয়েছেন, যাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতাল থেকে পজেটিভ রোগী পালিয়ে গেলেও তাদের আবার হাসপাতালে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে আইনের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে।

কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তিদের জন্যে উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সামর্থ্য অনুযায়ী থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরপরেও অনেক অসহায় ব্যক্তির বিল জেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া হয়েছে। অন্য জেলাগুলোতে ভারতফেরত যাত্রীদের নিয়ে লোকজনের প্রতিক্রিয়া থাকলেও যশোর ছিল পুরোপুরি ব্যতিক্রম। অনেকে স্বেচ্ছায় এসব যাত্রীকে বিনামূল্যে খাবার দিয়ে যাচ্ছেন। বিগত ঈদুল ফিতরের দিনে যশোর সদরে জেলা প্রশাসন, বেনাপোলের হোটেলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মেয়র উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। পরিবারের সাথে কোনও পুরুষ যাত্রী না থাকা নারী যাত্রীদের জন্য ডেডিকেটেড কোয়ারেন্টিন সেন্টার নির্ধারণ করা হয়।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর উপহার ও নগদ অর্থ বিতরণ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে করোনায় নিষেধাজ্ঞার ফলে সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির শিকার পরিবহন শ্রমিক, টেইলরিং শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অটোচালক, হোটেল শ্রমিক, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ অগ্রাধিকার পেয়েছেন। যশোরের শিল্পী ও সংবাদকর্মীদেরও উপহার দেওয়া হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here