জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত পৃথিবী সম্ভব?

0
22

কামরুল ইসলাম চৌধুরী

শিল্পবিপ্লবের পর থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির অপরিমাণদর্শী ব্যবহারের ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। এর ফলে বাড়ছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা। বরফ গলছে মেরু অঞ্চলে। দ্রুত হারে বাড়ছে সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা। সাগরের নোনাজল ঢুকছে উপকূলে। বদলে যাচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। আর হারিয়ে যাচ্ছে এসব প্রাণীর হরেক রকম প্রজাতি। হারিয়ে গেছে নানান ঔষধি বৃক্ষ, লতা-গুল্ম। হানা দিচ্ছে নানা ধরনের ভাইরাস। জলবায়ু পরিবর্তনের রাজনৈতিক অর্থনীতিও বদলে যাচ্ছে। সে পালাবদলের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে জাতিসংঘ জলবায়ু আলোচনা। তিন সপ্তাহ ভার্চুয়ালি চলবে এই শলাপরামর্শ।

আমরা জানি, জলবায়ু পরিবর্তনে ঐতিহাসিকভাবে উন্নত দেশগুলো দায়ী। আর উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তাই জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সনদ অনুযায়ী জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলা সর্বজনীন উদ্দেশ্য ও অগ্রাধিকার হলেও দেশভেদে দায়িত্ব ভিন্ন। জলবায়ু সনদ মোতাবেক উন্নত দেশগুলোকে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি দেশের বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের উন্নত, টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও বৈষম্যহীন জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে- উন্নত দেশগুলোকে এ সত্য কার্যকরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণসহ টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে। শিল্পোন্নত দেশগুলো আগেই বিশ্বের বায়ুম-লে বিপুল পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ করেছে। এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে দিতে না চাইলে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমাতে হবে। শিল্পোন্নত দেশ কী পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমাবে, তার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে দেশগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো কার্বন নিঃসরণ নিয়ে কাজ করছে। তাই সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা রয়ে গেছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রতিরোধে প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ২০৩০ সাল নাগাদ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার যে পরিমাণে কমাতে হবে, বর্তমানে বিশ্ব তার চেয়ে ১২০ শতাংশ বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের পথে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বিশ্বব্যাংক জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ করেই চলেছে। অথচ বিশ্বব্যাংকই বলছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব কমাতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০৩০ সাল নাগাদ ১০ কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যের কাতারে চলে যাবে। এটা স্পষ্টত পরস্পরবিরোধী নীতি।
কিয়োটো প্রটোকলে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ কমানোর অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু ওই চুক্তির শর্ত সব দেশ পালন করেনি। পরবর্তীকালে ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ‘ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন’-এর (এনডিসি) নামে সে বাধ্যবাধকতার শর্তটি উঠিয়ে দেওয়া হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে ঐচ্ছিকভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন মাত্রা ঠিক করা হয়েছে। যার অর্থ হলো, রাষ্ট্রগুলো জাতীয়ভাবে নির্গমন কমানোর মাত্রা ঠিক করবে এবং তা পূরণের জন্য কাজ করবে। বাধ্যবাধকতার শর্ত উঠিয়ে নেওয়ার পরও দেশগুলো পর্যাপ্ত কার্বন নিঃসরণ কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি গত পাঁচ বছরে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চুক্তির ১৯৭টি দেশের মধ্যে মাত্র ৭৫টি দেশ নতুন এনডিসি দাখিল করেছে। এর বেশিরভাগই উন্নয়নশীল দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ এনডিসি দাখিলে পিছিয়ে রয়েছে। আবার জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো অধিকাংশ দেশ নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য বৃদ্ধি করেনি। চীন বলছে, ২০৬০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিঃসরণ ৫৫ শতাংশ ও যুক্তরাজ্য ৬৮ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা পর্যাপ্ত নয়। প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৪৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে। কিন্তু জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন রূপরেখা সনদের (ইউএনএফসিসিসি) এক সমীক্ষা বলছে, যেসব দেশ ইতোমধ্যে এনডিসি দাখিল করেছে, তাদের অঙ্গীকার অর্জিত হওয়ার পরও ২০১০ সালের তুলনায় ২০৩০ সাল নাগাদ বৈশ্বিকভাবে মাত্র ১ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব। এমন পরিস্থিতিতে বড় রকমের ধাক্কা না দিলে ২০৫০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না। সে বড় ধাক্কা কতটা দেওয়া হবে, কীভাবে দেওয়া হবে, সে আলোচনাই এবার শুরু হচ্ছে।

কোপেনহেগেন আর কানকুন সম্মেলনে ধনী দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে দরিদ্রদের জন্য বছরে ১০ হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সে প্রতিশ্রুতি অধরাই থেকে যাচ্ছে। বাস্তবে বিশ্বের কয়েকটি দরিদ্রতম দেশের জনগণ প্রতি বছর জলবায়ু সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় মাথাপিছু মাত্র এক ডলারের মতো সহায়তা পাচ্ছে! যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোতে হতে যাওয়া কপ-২৬-এ নতুন তহবিল ঘোষণা করার আভাস এখন পর্যন্ত নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, সেখানে নতুন বোতলে পুরোনো দাওয়াই কি পরিবেশিত হবে? উপরন্তু আগের অঙ্গীকার পূরণ করা হবে কিনা, তা নিয়েই সংশয় আছে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো একাট্টা হলে আশাব্যঞ্জক ফল কপ-২৬ সম্মেলনেও আসতে পারে।

বর্তমানে বিশ্বে মোট শক্তি ব্যবহারের ৮১ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি। উদ্বেগজনকভাবে কয়েক দশক ধরে অব্যাহত মোট জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে। একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক চুক্তি এ বিপর্যয় অনেকাংশে এড়াতে পারে। দরিদ্র দেশগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসতে পর্যাপ্ত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ইতোমধ্যে, যুক্তরাজ্যের জলবায়ুমন্ত্রী কপ-২৬ সভাপতি অলক শর্মার নেতৃত্বে ধনী সাত-জাতি মন্ত্রী সন্মেলনে ২০২১ সালের শেষ থেকে জীবাশ্ম জ্বালানিতে আর কোনো বিনিয়োগ না করার ঘোষণা করা হয়েছে, যা ইতিবাচক।

প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ আহরণ ও ব্যবহারের মাধ্যমে ধ্বংস ত্বরান্বিত না করে টেকসই পথে চলা শুরু করতে হবে। উৎপাদন ব্যবস্থা টেকসই, সবুজ ও পরিবেশবান্ধব করা ছাড়া উপায় নেই। প্রাণ-প্রকৃতিবিধ্বংসী ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে মানুষ ও প্রকৃতির ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কই এখন বিশ্ববাসীর কাম্য। পৃথিবীর সর্বজনের এই আকাঙ্ক্ষার জন্য বৈশ্বিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের বিকল্প নেই। প্রত্যাশা করছি- বছরে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার জীবাশ্ম জ্বালানির পেছনে ভর্তুকি না দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের অঙ্গীকার আসবে কপ-২৬ সম্মেলন থেকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগসহ জলবায়ু প্রশমন ও অভিযোজনে অর্থায়নের জোর প্রতিশ্রুতি ও পথনকশা মিলবে। জলবায়ুতাড়িত ক্ষয় ও ক্ষতি মোকাবিলায় মিলবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা।

পরিবেশ বিশ্লেষক; সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here