গবেষণা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ একটি যৌগিক সূত্র

0
123

ড. মমিনুল ইসলাম

সমাজে প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা হতে দেখি। বিশ্বের ‘র‌্যাঙ্কিং’-এ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে খুঁজে না পেয়ে আমরা হতাশ হই। অবশ্য এই র‌্যাঙ্কিংয়ের সঙ্গে পড়াশোনা-গবেষণার মানসংক্রান্ত অনেক বিষয় জড়িত। তাই এ হতাশা থেকে পরিত্রাণের সরাসরি পথ দেখানো কঠিন। সমাজ একটি বিস্তরক্ষেত্র। ভিন্ন ভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর বসবাস এখানে। তা থেকে কিছুসংখ্যক মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর পড়ালেখা করে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে সামান্য সংখ্যক শিক্ষার্থী গবেষণা নামক কর্মটি করার অপার সুযোগ পেয়ে থাকে। বাস্তবতা হলো গবেষণার প্রয়োজনীয়তা, উপকারিতা ও নিয়ামক সম্পর্কে সমাজের সামান্য সংখ্যক মানুষের অনুধাবন তথা উপলব্ধির বিষয় বটে।

তবে সাধারণের পক্ষে গবেষণা সম্পর্কে মোটাদাগে জ্ঞানার্জন কঠিন নয়। যদি নিজেকে প্রশ্ন করি, কী খাচ্ছি বা ব্যবহার করছি? কথা বলছি, লিখছি; ভালোটাকে ভালো আর মন্দটাকে মন্দ জানছি, ভাবছি। নতুন নতুন আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা, জিনিসপত্র দিয়ে সমাজটাকে নিয়মিতভাবে সমৃদ্ধ হতে দেখছি। এবার ভেবে দেখি উৎস কী? আর এতসব নিত্যনতুনের জন্ম হয় কোথায়? আসলে গবেষণার মাধ্যমে সৃষ্ট ‘নতুন জ্ঞান’ দিয়ে এতসব নিত্যনতুনের জন্ম।

‘নতুন জ্ঞান’ ও ‘গবেষণার স্থান’ আজন্ম জোড়। অন্যদিকে আজকে যার জন্ম, কাল সে পুরোনো। আগে আবিস্কৃত জ্ঞান আজকে পুরোনো এবং তাকে ‘জানা জ্ঞান’ বলে। তাহলে নতুন জ্ঞান কাকে বলবেন? এখানে ইলিশের প্রজনন বৃদ্ধি সম্পর্কে উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। বছরে বিশেষ সময়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহ ইলিশ ধরা বন্ধ রেখে তার প্রজনন কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা গেছে। প্রশ্ন হলো, এ ধারণাটি কি আগে থেকেই জানা ছিল? উত্তর, না। তাহলে এটা ‘নতুন জ্ঞান’ এবং এর সৃষ্টি হয়েছে কোনো গবেষণাগারে। অন্যদিকে তুলা থেকে কাপড় তৈরি একটি মহামূল্যবান জ্ঞান। কিন্তু এটি এখন সবার জানা। এটা এখন মোটেও ‘নতুন জ্ঞান’ নয়। কিন্তু তুলা হতে আরও উন্নতমানের টেকসই বা স্বল্পমূল্যে কাপড় তৈরির পদ্ধিত উদ্ভাবন করা অথবা তুলার বিকল্প অন্য কোনো তন্তু ব্যবহার করে কাপড় তৈরি করা যায় কিনা, তার প্রচেষ্টা করা হলো গবেষণা।

একইভাবে সমাজের অপরাধ দমনে প্রচলিত আইনি-পুলিশি ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে কোনো মনস্তাত্ত্বিক থেরাপি বা অনুশাসন অথবা অন্য কোনো উন্নত পথ বের করার চেষ্টাও গবেষণা। তেমনি নতুন প্রযুক্তি ও ভিনদেশি সংস্কৃতি সমাজে অভিযোজনে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানের প্রচেষ্টা হলো গবেষণা। এ রকম হাজার হাজার ‘নতুন জ্ঞান’ নিয়মিতভাবে সৃষ্টি হচ্ছে বলেই আজ আমরা আধুনিক সমাজে অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অসভ্য থেকে সভ্য হয়ে বসবাস করছি।

দ্বিতীয় ‘গবেষণার স্থান’ বা গবেষণাগার। গবেষণাগার মূলত দুই ধাঁচের। ১. বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার ও ২. সমাজের ছড়িয়ে থাকা অন্য সব গবেষণাগার। প্রকৃত অর্থে গবেষণাগারের উৎপত্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখান থেকেই এর বিস্তৃতি ঘটে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে। আর এই দুই ধরনের গবেষণাগারে একই বিষয়ে গবেষণার দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তর আলাদা। মৌলিক গবেষণা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়ে থাকে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন অধ্যাপকের গবেষণার ক্ষেত্র খুবই সুুনির্দিষ্ট এবং তা জীবনভর সাধারণত বদলায় না। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক গবেষণা করে মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ করা হয়। সেই মৌলিক গবেষণাকে প্রায়োগিক রূপ দিতে অন্য গবেষণাগারগুলোতে আরও ব্যাপক গবেষণা করা হয়।

গবেষণার দুটি ধরন হতে পারে- ১. নিজস্ব আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে কোনো সম্যসার সমাধানে গবেষণা ও ২. বিশ্বভিত্তিক বাণিজ্য করে লাভবান হওয়ার জন্য পণ্য বা প্রযুক্তি তৈরিতে গবেষণা। কোনো সমাজ, জাতি বা রাষ্ট্রের জন্য প্রথমটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর দায়ভার রাষ্ট্রকেই নিতে হয়। প্রসঙ্গত, নোনাপানিতে ধান চাষের প্রযুক্তি আবিস্কার কিংবা ডায়িং ফ্যাক্টরির বর্জ্য দ্বারা পানি দূষণরোধ অথবা দেশে নতুন প্রযুক্তি অভিযোজনে সমাজে সৃষ্ট অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি আমাদের একান্ত নিজস্ব সমস্যা। আমাদের ভৌগোলিক, আর্থসামাজিক, শিক্ষা-দীক্ষা, ধর্মীয় চেতনা এবং সংস্কৃতিকে সামনে রেখেই এগুলোর সমাধান প্রয়োজন এবং তা আমাদেরই করতে হবে। আমাদের সমস্যাগুলোর সমাধান অন্য কোনো দেশ-জাতি তখনই করবে, যদি তারা নিজেদের সমস্যার সমাধান করার পর সময় পায় ও লাভবান হয়। কারও তৈরি কোনো প্রযুক্তি, আইন বা বুদ্ধি তাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে অনুমিত ও সঠিক; আমাদের ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি কাজে নাও আসতে পারে।
সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রকৃত অর্থেই নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের দায়িত্ব অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নয়। গবেষণা করা তাদের জন্য অপরিহার্য কাজ। তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে সমাজের অগোচরে নতুন জ্ঞানের প্রজনন ঘটে। সমাজে কোনটি চলবে, কোনটিকে বাদ দিতে হবে, সে চিন্তা বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়ে থাকে। সমাজ হলো জ্ঞানের চর্চাক্ষেত্র বা চারণভূমি, সেখানে জ্ঞান পুষ্ট হয়, ফল দেয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো জ্ঞানের মেলা, আর সেখানে শিক্ষকরা হলেন জ্ঞানের ফেরিওয়ালা।

আমাদের শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন এ তিনের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধানকে বুঝতে হবে ও তার যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রাপ্ত সুবিধাটুকু সমাজ তথা জাতির উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে। আসলে গবেষণা ও উদ্ভাবন শক্তিশালী জাতি গঠনের মোক্ষম চাবিকাঠি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের প্রচলিত উচ্চ শিক্ষায় এ দুইয়ের উপস্থিতি খুবই কম। কিন্তু গবেষণা ছাড়া আর যাই হোক দেশের প্রকৃত ও টেকসই উন্নতি সম্ভবপর নয়।

বিগত বছরগুলোতে আমাদের অর্জন ঈর্ষণীয় বলে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত। আজ আমরা আর দু’মুঠো ভাতের জন্য লড়াই করছি না। ২০৪১ সালে উন্নত দেশের কাতারভুক্ত হওয়ার স্বপ্টম্ন দেখছি। সে অনুযায়ী পরিকল্পনা-মহাপরিকল্পনা হচ্ছে। এক সময়ের ‘জিঞ্জিরা’কে শিল্প এলাকা হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছি। দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হচ্ছে। পরিকল্পনায় গবেষণার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তারকা চিহ্নিত করতে হবে। শিল্পকারখানাগুলোকে গবেষণায় সম্পৃক্ত হতে বাধ্য করতে হবে। সে ক্ষেত্রে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের চুক্তিতে বা চুক্তি নবায়নে বার্ষিক লভ্যাংশের একটা অংশ গবেষণায় ব্যয়ের শর্ত আরোপ করে দিতে হবে। বিদেশি বিশেষজ্ঞনির্ভর সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দেশি বিশেষজ্ঞ পদায়নের ব্যাপারেও আইন করতে উদোগী হতে হবে। তাহলে একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়-গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণার ব্যাপকতা বাড়বে, অন্যদিকে তেমনি ‘মেধা পাচার’ ও কষ্টে অর্জিত অর্থের অপচয় রোধ করা সম্ভবপর হবে।

বিশেষ উন্নয়নে যৌগিক সূত্রে বাঁধা উল্লিখিত খাতগুলোর সমন্বয় সাধন অবশ্য একটু জটিল! কথায় বলে ‘অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী’। যিনি হিব্রু ও বাংলা ভাষা পুরোপুরি পারদর্শী, প্রয়োজনে তাকেই হিব্রুতে লিখিত বিষয় বাংলায় অনুবাদের দায়িত্ব দেওয়া উচিত, অন্যকে নয়। তেমনি সমাজে যে শ্রেণির মানুষ টাকার অঙ্ক কষতে জানার পাশাপাশি চিন্তাশক্তি দিয়ে ভবিষ্যৎকেও দেখতে পান, সেই শ্রেণির মানুষকেই বিশ্ববিদ্যালয় তথা গবেষণার লালন, পলিসি প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। কাজটি যদি যথাযথ হয়, তবে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও খুঁজে পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বার উন্মোচিত হবে।

অধ্যাপক, রসায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here