করোনা সংক্রমণ বাড়ছে, চাপ সামলানোর মতো প্রস্তুতি নেই সীমান্তবর্তী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে

0
50

সত্যপাঠ ডেস্ক

সাতক্ষীরার দেবহাটা আর ভারতের চব্বিশ পরগনা জেলার মাঝখানে শুধু ইছামতী নদী। এখানে দেশের সীমানা অতিক্রম করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, বাগদা চিংড়ির রেণু ধরতে গিয়ে দেবহাটার মানুষ সেই নিষেধাজ্ঞা মনে রাখেন না। যেখানে সবচেয়ে ভালো মানের চিংড়ির রেণু পাওয়া যায়, সাঁতরে সেখানেই চলে যান তারা। স্থানটি বাংলাদেশ নাকি ভারতের সীমানায় পড়ল, তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামান না।

২৪ পরগনার বাসিন্দারাও একই কাজ করেন। ফলে, দুই দেশের মানুষ যেখানে মিলিত হন, সেখানে ইছামতীর পানিতে সব রাজনৈতিক সীমানা ধুয়ে-মুছে যায়।

এ বিষয়টিই দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আব্দুল লতিফের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাতক্ষীরায় কোভিড-১৯ আক্রান্তের হার ২৫ শতাংশ, যা সারাদেশের আক্রান্তের হারের দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু, লতিফদের স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র একেবারেই প্রস্তুত নয়।

লতিফ বলেন, ‘আমাদের ১৬টি অক্সিজেন সিলিন্ডার আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমরা একসঙ্গে কেবল আটটি ব্যবহার করতে পারি। সাতক্ষীরায় অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিল করার সুবিধা না থাকায়, আমাদের এগুলো যশোরে পাঠাতে হয়। আমরা একসঙ্গে আটটি করে পাঠাই। এগুলো যশোরেই রেখে আসি এবং বাকি আটটি খালি হলে সেগুলো রেখে এগুলো নিয়ে আসি।’

করোনার ভারতীয় ধরন সামলানোর ক্ষেত্রে তারা একটি আসন্ন সংকটের মুখোমুখি। কিন্তু, তাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী নেই।

‘পিপিই’র হিসাব করলে আমাদের সবকিছু ঠিক আছে। গত বছর থেকে প্রায় ৩০০ পিপিই পড়ে আছে আমাদের। তবে, আমাদের কোনো এন৯৫ বা কেএন৯৫ মাস্ক নেই। এরপরও আমরা সেবা দেব অবশ্যই’, বলেন লতিফ।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দ্য সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১৩০টি এন৯৫ মাস্ক দেওয়া হয়েছিল দেবহাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে। এরপর আর কিছুই পায়নি তারা।

পার্শ্ববর্তী কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেরও একই অবস্থা বলে জানিয়েছেন সেখানকার স্টোর কিপার শ্রীকান্ত দাস।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ১০টি সিলিন্ডার আছে। কিন্তু, এগুলো যশোরে পাঠাতে হয়। পাঠানো মাত্রই অক্সিজেন ভরে দেওয়া হয় না। তাই আমরা এগুলো রেখে আসি এবং পরে অন্য আরেকদিন গিয়ে নিয়ে আসি।’

এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে মাত্র দুজন চিকিৎসক থাকায়, রোস্টারের মাধ্যমে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অথচ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি এমন স্থানে অবস্থিত, যেখানে ভারতের সঙ্গে দূরত্ব বলতে শুধু নদী।

সরকারি গাইডলাইন অনুসারে, একজন স্বাস্থ্যকর্মীর ১৪ দিন ডিউটি করার এবং ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা। কিন্তু, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ হাসপাতালটি বর্তমান জনবল নিয়ে প্রতিদিনের তিনটি ডিউটি শিফটই সামাল দিতে পারবে না। ভারতের কোভিড-১৯ পরিস্থিতি বিবেচনা করে, সরকার আটটি সীমান্তবর্তী জেলা- সাতক্ষীরা, খুলনা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, যশোর, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে লকডাউনের কথা ভাবছে।
কিন্তু, বিভাগীয় মূল মেডিকেল কলেজগুলোর বাইরেও অনেক স্থানেরই অবস্থা ভালো না।

গত বছর এসব জেলার সবগুলোই কিছু হলেও জীবন রক্ষাকারী এন৯৫ বা কেএন৯৫ মাস্ক পেয়েছিল। কিন্তু, এ বছর সরকারি তথ্যই বলছে যে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও দুয়েকটি জেনারেল হাসপাতাল ছাড়া বেশিরভাগ স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই কর্মীদের সুরক্ষার জন্য কোনো ধরনের এন৯৫ বা কেএন৯৫ সরবরাহ করা হয়নি।

কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টোর কিপার আবুল হাশেম জানান, তাদের স্টোরে ৫০০ পিপিই থাকলেও, কোনো এন৯৫ বা কেএন৯৫ মাস্ক নেই। গত বছর তাদের অন্তত চার জন কর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।

এরপরও, এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবস্থা অন্য অনেকগুলোর চেয়ে ভালো। কারণ, এখানে ৫২টি অক্সিজেন সিলিন্ডার এবং তিনটি অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর আছে। সীমান্তবর্তী যেসব জেলার কথা আলোচনা করা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে কুষ্টিয়ার অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটরের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টালের তথ্য অনুসারে, কুষ্টিয়ায় মোট ২২টি অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর আছে। এ ছাড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১১টি, খুলনায় আটটি, সাতক্ষীরা ও নওগাঁয় একটি করে অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর আছে। অন্যদিকে, নাটোরে কোনো অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটরই নেই।

২৩ দশমিক ৮৬ লাখ জনসংখ্যার নওগাঁ জেলায় করোনা শনাক্তের হার ২০ শতাংশেরও বেশি। পুরো জেলার জন্য আইসোলেশন বেড আছে ১৯১টি।

১৬ দশমিক ৪৮ লাখ জনসংখ্যার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় শনাক্তের হার ২৫ শতাংশেরও বেশি। অথচ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখানে মাত্র ২০টি আইসোলেশন বেড আছে।

নাটোরে জনসংখ্যা ১৮ দশমিক ২৬ লাখ এবং এখানে ২৯টি আইসোলেশন বেড আছে। সিভিল সার্জনের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল থেকে পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় নাটোরে ৩২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।

কুষ্টিয়ার জনসংখ্যা ১৯ দশমিক ৪৭ লাখ এবং এ জেলার শনাক্তের হার ২০ শতাংশের বেশি। তবে, এখানে আছে মাত্র ১১৫টি বেড।

২০ দশমিক ৮০ লাখ জনসংখ্যার সাতক্ষীরা জেলায় শনাক্তের হার ২৫ শতাংশের বেশি হলেও এখানে আছে ৮৬টি আইসোলেশন বেড।

খুলনায় আছে মাত্র ৫২টি আইসোলেশন বেড। যদিও, এ জেলার জনসংখ্যা ২৩ দশমিক ২০ লাখ এবং শনাক্তের হার ২০ শতাংশের বেশি। প্রায় একই জনসংখ্যার রাজশাহীর অবস্থা তুলনামূলক ভালো। এখানে শনাক্তের হার ১৫ শতাংশ এবং ৯০টি আইসোলেশন বেড রয়েছে।

এ ছাড়া, যশোরের জনসংখ্যা ১৩ দশমিক ৮৬ লাখ, শনাক্তের হার ১৫ শতাংশ এবং এখানে বেড আছে ১০১টি।
আইসোলেশন বেড না থাকার কারণে কিছু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা আক্রান্তদের পর্যন্ত রাখা সম্ভব হয় না। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইসোলেশন ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের কীভাবে রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে রেফার করা হয়েছে, নাচোল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তারা দ্য ডেইলি স্টারকে সেসব ঘটনা জানিয়েছেন।

এক সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের রোগীরা আইসোলেশন বেড পেতেন। কিন্তু, এখন সংক্রমণ শীর্ষে না পৌঁছালেও সেখানকার ২১টি বেডের ২০টিতেই রোগী আছে। কোনো নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রও (আইসিইউ) নেই সেখানে।

আরও অক্সিজেন সিলিন্ডারের চাহিদার কথা জানিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন জাহিদ নজরুল চৌধুরী বলেন, ‘যতটুকু অক্সিজেন দরকার, তার মাত্র ৫০ শতাংশ পাচ্ছি আমরা।’

নাটোর সদর হাসপাতালেও কোনো আইসিইউ নেই। গতকাল এ হাসপাতালের ৩১টি আইসোলেশন বেডে ৩২ জন করোনা আক্রান্ত ভর্তি ছিলেন।

নাটোর সংবাদদাতাকে সিভিল সার্জন মিজানুর রহমান জানান, রোগীদের জন্য ১৬টি অক্সিজেন সিলিন্ডার থাকলেও এগুলোর মাত্র আটটি একসঙ্গে ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ, সাতক্ষীরার হাসপাতালের মতো নাটোর সদর হাসপাতালের সিলিন্ডারগুলোকেও অক্সিজেন ভরার জন্য রাজশাহীতে পাঠাতে হয়।

তিনি আরও জানান, তাদের হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার কোনো আরটি-পিসিআর মেশিনও নেই। এখানে হওয়া সব পরীক্ষাই জিন এক্সপার্ট বা র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট।

পুরো কুষ্টিয়ার রোগীদের চিকিৎসায় কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে মাত্র চারটি আইসিইউ বেড রয়েছে।হাসপাতালটিতে ৩০টি বেড থাকলেও সেখানে ৩৪ জন করোনা রোগী ভর্তি আছেন।

ভারত থেকে মানুষের অবৈধ প্রবেশের কারণে যশোর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও, সেখানকার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে কোনো কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা নেই। হাসপাতালটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৬৫টি অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে।

প্রতিটি বড় সিলিন্ডার এক ঘণ্টা পর্যন্ত অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির আরএমও আরিফ আহমেদ।

তিনি আরও জানান, হাসপাতালটিতে একটি কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ চলছে। কিন্তু, ভারত থেকে এখনো অক্সিজেন ট্যাংক আমদানি করা হয়নি। সম্প্রতি এ হাসপাতালে তিন শয্যার আইসিইউও চালু করা হয়েছে। যদিও, এটিতে সুযোগ-সুবিধা খুবই অল্প।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (খুমেক) পাঁচ কিলোলিটারের একটি কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা ছিল। লিন্ডে বাংলাদেশ এটিকে ১০ কিলোলিটারে উন্নীত করেছে।

তবে, খুমেকের পরিচালক (ইনচার্জ) বিধান চন্দ্র ঘোষ জানিয়েছেন, ৫০০ শয্যার হাসপাতালটিতে এখনো সুযোগ-সুবিধা অপ্রতুল। এখানে প্রতিদিনই গড়ে এক হাজার ২০০ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

সম্প্রতি খুমেক গিয়ে, আমাদের খুলনা সংবাদদাতা একটি অক্সিজেন ট্যাংক মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেছেন। এটি প্রায় ছয় মাস ধরেই পড়ে আছে বলে জানতে পেরেছেন তিনি।

প্রতিবেদনটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন জারীন তাসনিম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here