করোনার অভিঘাতে অর্থনীতি, জীবন জীবিকা, স্বাস্থ্যসেবা ও লেখাপড়া

0
10

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন

১. গত বছর ৮ মার্চ প্রথম শনাক্ত এবং ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুসংবাদের পর থেকে কভিড অতিমারী জনজীবনকে উত্তরোত্তর অস্থিরতর করে রাখছে। এ পর্যন্ত (৩০/৫/২১) বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৩৮৬, মৃত্যু ১২ হাজার ৫৪৯, সুস্থ ৭ লাখ ৩৭ হাজার ৪০৮ এবং এখনো অসুস্থ ৪৭ হাজার ৩৯১। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে পরীক্ষা করার সংখ্যা ও অনুপাত সর্বনিম্ন বলে এ থেকে পরীক্ষা ও আক্রান্তের চিত্রটি সঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অন্য অনেক ভাষ্যকার ছাড়াও প্রফেসর রেহমান সোবহান (২২/৫/২০২১ বিআইডিএস সেমিনার) টেস্টিং বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। পরীক্ষার সংখ্যা ও অনুপাত না বাড়ালে শনাক্ত শতকরা হিসাবে নিরাপদ সীমার নিচে অবস্থান করছে কিনা, তাও জানা যাবে না।

২. প্রশংসনীয়ভাবেই গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে অন্য মাত্র ২১টি দেশের মতো বাংলাদেশে করোনার টিকা কার্যক্রম শুরু হয়। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত এবং ৩০ ডিগ্রি হিমাংকে সংরক্ষণযোগ্য বলে বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম। খুবই কল্যাণরাষ্ট্রজনোচিতভাবে সদাশয় সরকার বিনা মূল্যে ৫১ লাখ মানুষকে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে কেনা ৭০ লাখ ও ভারত সরকারের উপহার হিসেবে পাওয়া ৩২ লাখ অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকা দিয়ে সুষ্ঠুভাবেই সর্বস্তরের কিছু মানুষকে সুরক্ষিত করেছে। প্রথম ডোজ নেয়া বাকি ১২-১৩ লাখ দেশবাসীর জন্য অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকা সংগ্রহের চেষ্টা হোঁচট খেয়েছে বলেই মনে হয়। সম্ভবত দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অন্তরঙ্গ কূটনীতি এবং কোরিয়ান ইপিজেড ইস্যু সমাধানের উদ্যোগ একসঙ্গে নিলে এক্ষেত্রে সুফল মিলতে পারে। দুই টিকার মধ্যকার ব্যবধান যদি ১৬ সপ্তাহ বিজ্ঞানসম্মত হয়, তাহলে কিছু বাড়তি সময় পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ ও ভারতের দুই সরকারের মধ্যে চুক্তি না করে ৩ ডলারের টিকা ৫ ডলারে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে আনার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা অনেক হয়েছে। ভারতের পরিস্থিতি এত জটিল হয়ে যাবে তা অবশ্যই অজানা ছিল।

৩. ফাইজার ও মডার্নার (রেনেটার মাধ্যমে) টিকার টুকটাক সরবরাহ আসছে ও আসার সম্ভাবনা আছে। চীনের উপহারের ১১ লাখ ডোজ টিকা স্বস্তির সূচনা করেছে। মাসে ৫০ লাখ করে আগস্ট নাগাদ ১ দশমিক ৫ কোটি ডোজ (প্রতি ডোজ ৮৫ টাকা তথা ১০ মার্কিন ডলার) অবস্থার বিপুল উন্নতি ঘটাবে। রাশিয়ার স্পুটনিক টিকার স্থানীয় অংশীদারিত্বের উপাদানের আলোচনা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে তা জনগণকে জানানো প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে অন্যান্য রোগের টিকার উৎপাদন ও প্রয়োগে বাংলাদেশের বিশ্বখ্যাতি রয়েছে। তাহলে করোনার টিকার সিদ্ধান্তহীনতার কারণ কী? করোনা খুব সহজে আমাদের ছেড়ে দেবে না, তাই অন্যান্য সূত্র থেকে টিকা আনা ছাড়াও গ্লোব এবং বিশ্বখ্যাতি অর্জন করা ইনসেপ্টা বা অন্যান্য ফার্মাসিউটিক্যালস যৌথভাবে টিকা বানাতে চাইলে অনুমতি এবং সুযোগ-সুবিধা ও সহযোগিতা দিতে হবে সরকারকে।

৪. সোয়া এক বছর ধরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে শ্রেণীকক্ষে লেখাপড়া নেই। গ্রামবাংলায় ইন্টারনেটে পাঠদান ও সবক গ্রহণের সুবিধা খুবই সীমিত। শতকরা ৮০ ভাগের বেশি ছেলেমেয়ে স্কুল, এর শৃঙ্খলাবদ্ধ নিয়ম নিগড়ের অবস্থান ও সমবয়সীদের সঙ্গে মত আদান-প্রদান থেকে বঞ্চিত। বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা, মাদকের টোপে পা বাড়ানো এবং মূর্খ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা। মহামারীসংক্রান্ত রোগতত্ত্ব গবেষণা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক ও বর্তমানে স্বাস্থ্য বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. মীরজাদী সাব্রিনা ফোরার মতে, কিশোর ও যুবদের অলস মস্তিষ্কে অভ্যাস পরিবর্তনে মারাত্মক অনিশ্চয়তা রয়েছে। সম্মিলিতভাবে এ বিষয়ে ফলিত গবেষণা ও যথোপযুক্ত সমন্বিত কার্যক্রম না নিলে ভবিষ্যৎ আরো তমসাচ্ছন্ন হয়ে যাবে। এমনিতে বাল্যবিবাহ বাড়ছে। কন্যাসন্তানদের ন্যূনতম বিয়ের বয়স সম্পর্কিত আইনে, ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে ১৬ বছরে বিয়ে হতে পারে’ বিধানটি উঠিয়ে দিয়ে ১৮ বছরের আগে বিয়ে নয়, তেমন বিধান রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংকল্পে দৃঢ়ভাবে বলবৎ করতে হবে। প্রাণিবিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণা থেকে সতর্ক করেছেন যে প্ল্যাসেন্টাসহ হাসপাতালের বর্জ্য মিশ্রণে প্রস্তুত পশু ও হাঁস-মুরগি-মত্স্য খাদ্যের মাধ্যমে আমরা ক্রমাগতভাবে ভেজাল বিষাক্ত খাবার খাচ্ছি। কৃতসংকল্প মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা দৃঢ় হাতে প্রয়োগ করা জরুরি।

৫. বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ নমনীয় ধাঁচে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। স্বল্প সচ্ছলতা এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অসচ্ছলতার কারণে খাদ্যতালিকায় মাংসের মুখ দেখে না শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ। মুসল্লিরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে ওজু অর্থাৎ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখেন। এ কারণে বাংলাদেশে করোনার সর্বনাশা ছোবলের অভিঘাত তুলনামূলকভাবে কম। বিদ্যালয়গুলো খুলে দিয়ে কোমলমতিদের নিয়মনীতির শৃঙ্খলে নিয়ে এলে এসব স্বাভাবিক সুবিধার বেশি বেশি সুফল পাওয়া যেতে পারে। আমাদের ছয় মাস আগের প্রস্তাব: ক) সিলেবাস কাটছাঁট করার চলমান প্রক্রিয়াকে আরো বাস্তবসম্মত পরিণতিতে নিয়ে তিন মাসের জন্য (জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর) দুই শিফটে (সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২:৩০ এবং বেলা ১টা থেকে বিকাল ৪:৩০ টা) সপ্তাহে চারদিন সোমবার-বৃহস্পতিবার প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে স্কুল-কলেজ খোলা রাখা; খ) পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর পরীক্ষা স্থায়ীভাবে স্কুলের ওপর ছেড়ে দেয়া। তবে দেশব্যাপী সীমিত আকারে বৃত্তি পরীক্ষার বিধান রাখা; গ) অক্টোবরের প্রথম পক্ষে বাংলা, ইংরেজি, অংক এবং গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট তিনটি বিষয়ে সীমিত আকারে নিজ স্কুলে, তবে একই উপজেলার অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষক তদারকিতে এসএসসি পরীক্ষা নেয়া; ঘ) অক্টেবরের দ্বিতীয় পক্ষে বাংলা, ইংরেজি ও বিভাগীয়/গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট চারটি বিষয়ে (আড়াই ঘণ্টা) নিজ স্কুল-কলেজে, তবে একই জেলার অন্যান্য স্কুল-কলেজের তদারককারী এনে এইচএসসি পরীক্ষা নেয়া; ঙ) খুবই সতর্কতার সঙ্গে প্রশ্নপত্র তৈরি করা এবং নিবিড় তদারকিতে খাতাপত্রের মূল্যায়ন করা যেতে পারে। মাদক ও অন্যান্য দুষ্টচক্র থেকে যুব ও কিশোরদের দৃষ্টি সৃষ্টিশীলতার দিকে নিয়ে আসা এবং ধরে রাখার জন্য পাঠ্যবহির্ভূত কার্যক্রম, খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা, বিতর্কসহ সাহিত্যকর্মে মনোনিবেশ করতে হবে; চ) অতি অবশ্যই কুদরত-এ খুদা কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত মাতৃভাষায় একমুখী ন্যূনতম শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা জরুরি। এই ন্যূনতম সিলেবাসের বাইরে ইংরেজি মাধ্যম, ধর্মীয় এবং কওমি মাদ্রাসার ধারাগুলো অতিরিক্ত পাঠক্রম সংযুক্ত করতে পারবেন; ছ) এলাকাভিত্তিক প্রাথমিক (গ্রামগঞ্জে এরই মধ্যে তা চালু আছে) ও মাধ্যমিকে ভর্তি, স্কুল ইউনিফর্ম, পায়ে হেঁটে যাতায়াত (প্রয়োজনে স্কুল বাসে আসা-যাওয়া, প্রাইভেট যানবাহনে নয়) বাধ্যতামূলকভাবে চালু করার এখনই সময়।

৬. প্রাইভেট-পাবলিক যৌথ সহযোগিতায় বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যাপক প্রসার কওমি মাদ্রাসাসহ সব ক্ষেত্রে চালু করা জরুরি।

৭. সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে যে শিক্ষার খরচ মামুলি ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যতের টেকসই সমতামুখী উন্নয়নে শক্তিমান স্তম্ভ নির্মাণের বিনিয়োগ সিঁড়ি।

৮. স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অসমন্বয় এবং যথেচ্ছাচার সম্পর্কে লেখালেখিতে এখন ভাটা পড়েছে। কারণ গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অবিচ্ছেদ্য চর্চা হিসেবে সমালোচনাকে সরকার আর সহ্য করছে না বলে মনে হচ্ছে। অবৈধ তথা লাইসেন্স হাসপাতালের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে দৃশ্যমান চুক্তি সম্পাদনকারীদের বিরুদ্ধে নীরব থেকে পরোক্ষভাবে পুরস্কৃতই করা হচ্ছে। মিথ্যা করোনা নেগেটিভ প্রত্যয়নপত্র ইস্যুকারী, বিএসএমএমইউ ভেজাল পিপি ৪৯৫ সরবরাহকারী, একই দুর্নীতিবাজ সরবরাহকারীকে কার্যাদেশ দানকারীকে শাস্তি থেকে আড়াল করে এবং ওষুধপত্রের নিম্নমান ও লাগামহীন উচ্চমূল্যে চোখ বুজে থাকা বাংলাদেশ এখন গা-সওয়া হয়ে গেছে। ‘দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণকারী সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতার খ্যাতিতে নিয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেকোনো সময় স্বাস্থ্য খাতের ক্যান্সার নিরোধে অপ্রচলিত আমূল পরিবর্তন আনবেন, সে আশায় রইলাম।

৯. এখন বাজেটের কালে কোনো কোনো মহল থেকে শুনতে পাই বরাদ্দ কল্পনাতীতভাবে বাড়বে। আবার কেউ বলছেন গতানুগতিক। পত্রিকায় এমনও ছাপা হচ্ছে যে জিডিপির শতকরা এক ভাগ বরাদ্দের অর্ধেকও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তবে প্রকল্প শুরুই হয়নি, অর্ধেক টাকা খরচÍএমন সংবাদও ছাপা হয়। ভিয়েতনামের মতো জিডিপির শতকরা ৮ ভাগ বরাদ্দ আমাদের জন্য হনুজ দূর অস্ত। একটা কৌশলিক অগ্রাধিকারমূলক উদ্ভাবনী জনকল্যাণিক, সাহসী অর্থনীতি সব খাতের সঙ্গে সমন্বিত একটা যুক্তিগ্রাহ্য সম্পূর্ণ অপচয় ছিদ্র বন্ধ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য সরকারপ্রধান একজন সোনার মানুষ চিহ্নিত করে তার হাতে স্বাস্থ্য খাতের সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে পরখ করে দেখতে পারেন।

১০. ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ তারিখের বিআইডিএসের একটি ব্যতিক্রমধর্মী তরঙ্গ প্রবাহিক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের উপদেষ্টা আনীর চৌধুরী জানালেন, দেশে করোনা সম্পর্কিত কার্যক্রম একটা জটিল ও সমন্বিত গাণিতিক মডেল দ্বারা নির্ধারণ করা হচ্ছে। করোনা একটি বিস্ফোরণপ্রবণ (ঠড়ষধঃরষব), অনিশ্চিত (টহপবৎঃধরহ), জটিল (ঈড়সঢ়ষবী) এবং বহুরূপী (অসনরমরড়ঁং)- ঠটঈঅ ছলনাময়ী রোগবালাই। অঞ্চলভেদিক ম্যাপিং, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকের সমাহার, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এবং নাগরিকদের স্বেচ্ছা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তাদের মডেলটি লাল, কমলা ও সবুজ অঞ্চলে ভাগ করে দেয় সারা দেশকে। তিনি সময় পরিক্রমায় কমলা অঞ্চলকে লাল বর্ণ ধরতে (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) এবং কয়েক মাস আগে পূর্ব রাজাবাজার ও ইন্দিরা রোড এলাকায় সফল লকডাউনে মৃতের সংখ্যা কমে যেতে দেখাচ্ছিলেন, তখন অন্তত আমি আশ্বস্ত হই যে বাংলাদেশে করোনা অতিমারী বিষয়ে পদক্ষেপগুলো একটি তাত্ত্বিক মডেলিংয়ের মাধ্যমে সঠিকভাবেই নির্দেশিত হচ্ছে। তাহলে জীবন ও জীবিকার মধ্যকার ভারসাম্য জীবিকার দিকে হেলে যায় কি প্রভাবশালী বিত্তবানদের চাপে? এতে বিপন্ন হয়ে জীবনই যদি নিশ্চিহ্নের পথে পাড়ি জমায়, তাহলে জীবনের সংস্থানে লাভ কী হবে!

১১. বিআইডিএস সেমিনারে অর্থনীতিবিদ অভিভাবক প্রফেসর রেহমান সোবহান মত দিলেন যে সামগ্রিকভাবে করোনার মাধ্যমে বাংলাদেশের মজবুত অর্থনীতিতে যে ভঙ্গুরতার হুমকি এসেছে, তার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর বিপদ হচ্ছে আর্থিক ও ব্যাংক খাতে বিশৃঙ্খলা, লুটপাট, পরিবারতন্ত্র, ঋণখেলাপি, মুদ্রা পাচার ও বাজেটের মাধ্যমে কালো টাকার কর সত্ভাবে অর্জিত টাকার ওপর আরোপিত করের চেয়ে কম হারে ধার্য করা একটি অনৈতিক নিকৃষ্ট নীতি। শিরোমণি অর্থনীতিতে প্রফেসর ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বললেন, কঠোর ও দৃঢ়ভাবে সংস্কার এনে অর্থনীতিকে সুস্থ ধারায় নিয়ে আসার এখনই উপযুক্ত সময়। সবকিছু খোলা রেখে গণপরিবহন বন্ধ রাখা যেমন অবৈজ্ঞানিক ও অবাস্তব, তেমনি গণপরিবহন সব নিয়মনীতি মেনে চলবে, সে আশাও পেশি-শক্তিচালিত সমাজ ব্যবস্থায় আশা করা যায় না। ব্যাংকগুলোর তারল্য, খেলাপিদের হাতে আটকে যাওয়া অর্থসম্পদ ও অবলোপনকৃত অর্থ ফেরত না আসা (বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ফেরত আসে মাত্র শতকরা শূন্য ১ ভাগ), মূলধন পরিস্থিতি এবং সুশাসনের দিকে নিয়ে আসতে কঠোরতম নজর দেয়ার এখনই সময়। করোনাকালে শিক্ষা খাতে বৈষম্য আরো বেড়েছে। সমগ্র সংস্কার প্রক্রিয়ায় সামষ্টিক আয়ের শতকরা ৩ শতাংশ সম্পদ ও বিনিয়োগ করতে হলেও তা যথার্থ বলেই বিবেচিত হবে। এ সেমিনারে উদীয়মান ও রত্মসম অর্থনীতিবিশারদ মুশফিক মুবারকের ডিজিটাল বিভাজিত বিশ্বে ‘সবার জন্য সুলভে মাস্ক’ তত্ত্ব সম্পর্কেও ইতিবাচক আলোচনা হয়। যেখানে মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টাও অত্যন্ত মূল্যবান বক্তব্য রাখেন।

১২. বাংলাদেশের সামষ্টিক আয় প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু সামষ্টিক আয় ও সামাজিক অগ্রগতি এখন সর্বজনবিদিত। পাকিস্তান, ভারত তো বটেই, গণচীনকেও আমরা ছাড়িয়ে যাচ্ছি। তবে মনে রাখা ভালো যে উৎপাদনের সমতাভিত্তিক ন্যায্য বিতরণ না হলে প্রবৃদ্ধি টেকসই মানব উন্নয়নে রূপায়িত হবে না। বাংলাদেশে সামষ্টিক আয়ের প্রবৃদ্ধিতে যে গতিশক্তি বিরাজমান এবং এক ধরনের পরিপূরকতার যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও চীনের অর্থনীতিতে যে শক্তির পুনরুত্থান ঘটছে, তাতে কিছুকাল এ নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকবে না। মূল্যস্ফীতিতেও এক ধরনের সমীকরণ রয়েছে বলে হঠাৎ কিছু ঘটে যাবে না। ভালো সংবাদের মধ্যে আছে অচিরেই বৈদেশিক মুদ্রার ভা-ার দ্বিগুণ হয়ে যাবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবকিতাব। তাছাড়া জুলাই-মার্চ সময়কালে গেলবারের তুলনায় ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির হারের চেয়েও বেশি হারে আদায় হয়েছে। সরকারি হিসাবেই সংশ্লিষ্টদের শতকরা ৮০ ভাগ হয় মূল্য সংযোজন কর দেন না অথবা সংগ্রহকারী ব্যবসায়ী এটি সরকারি কোষাগারে জমা দেন না। আসন্ন বাজেটে এ ছিদ্র বন্ধ করা জরুরি। এতে বাজেট ঘাটতিও তুলনামূলকভাবে কমে যাবে। ঘাটতি অর্থায়ন বৈদেশিক সহায়তা পাইপলাইন থেকে বেশি ব্যবহার করার সক্ষমতার মুখে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়ার পরিমাণ কমেছে। দুঃসংবাদ বলে মনে করছি মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হ্রাস পাওয়া। তবে ক্রমবর্ধমান আয়, সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা বৈষম্য এবং ধান-চালের উদ্বৃত্তের সংগ্রহ থেকে শুরু করে পণ্যবাজারে ও ব্যাংকসহ সেবা খাতগুলোয় মধ্যস্বত্বভোগীদের ক্রমবর্ধমান শক্তি প্রদর্শনে ইকোনমিক রেন্ট আদায় হচ্ছে। কোনো একটা সময়ে এসবের লাগাম টানতেই হবে এবং আমি মনে করি, সরকারি ব্যবস্থাপনাকে গা ঝাড়া দিয়ে উঠিয়ে কর্তৃত্ব স্থাপন করার এখনই সময়।

১৩. একেবারেই বাস্তবায়ন হচ্ছে না, সে ধরনের লকডাউন সারা দেশে জারি না করে প্রথমদিককার সাফল্যম-িত ঢাকার টোলারবাগ এবং মাদারীপুরের শিবচরে কার্যকর করা স্থানীয় বিধিনিষেধ জারি করা যেতে পারে। এমনকি মাস ছয় আগে পূর্ব রাজাবাজার ও ইন্দিরা রোড এলাকার লকডাউনেও সুফল এসেছিল। সেজন্য আনীর চৌধুরী মডেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো ১০-১২টি লাল হতে থাকা অঞ্চলে কারফিউর মতো কড়াকড়ি লকডাউন বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য শহরাঞ্চলেও গুচ্ছে গুচ্ছে আক্রান্ত এলাকায় এ ধরনের লকডাউন জারি করা যেতে পারে। সে ব্যবস্থাধীনে অর্থনীতির বাকি সব কর্মকা- মিল, ফ্যাক্টরি, পরিবহন, শপিংমল, পর্যটন এবং বিশেষ করে রিকশা, রাইড, ভ্যান, ছোট ছোট চা ও খাবারের দোকান কড়াকড়িভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে উন্মুক্ত করাই সমীচীন হবে। হাত ধোয়া, নাক-মুখ- চোখে হাত না দেয়া, মাস্ক পরা এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা নিশ্চিত করতে ঘন ঘন তবে অঘোষিত পরিদর্শন ও জরিমানা আদায় করা গেলে অভ্যাস পরিবর্তনের শুভ সূচনা হতে পারে। সব বাসচালক ও সহকারীদের সিংহভাগের জন্য নিয়মিত নিয়োগপত্র এবং স্বাস্থ্যসেবা ও বীমা ব্যবস্থা চালু করা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। কল্যাণ ফান্ডের টাকার হিসাব কোথায়? বছরেরও অধিককাল আগে সরকারপ্রধানের নির্দেশ দেয়া মধ্যপথে বিশ্রামাগারও চালু করা হলো না কেন?

১৪. জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর করতে না পারলেও রাস্তাঘাট নির্মাণ-মেরামত এবং বাঁধ নির্মাণ-মেরামতের কোনো কাজ মে, জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে করা যাবে না বলে বিধিবিধান জারি ও বাস্তবায়ন করা সমীচীন হবে। সরকারি কেনাকাটায় বিশ্ববাজারের মান ও মূল্য নির্ধারণ করে প্রতিটি পণ্য নির্মাণ এবং সেবার ক্ষেত্রে সেই মান ও মূল্যের নিরিখেই দরপত্র গৃহীত হোক।

১৫. শিল্পায়ন প্রধান প্রবৃদ্ধি মডেলে কর্মসংস্থান, আয় রোজগার বৃদ্ধি, দারিদ্র্য নিরসন এবং সুযোগ ও সম্পদবৈষম্য কমানোর কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে। বস্ত্র শিল্পে ব্যাপক ভর্তুকি, শুল্ক সুবিধা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি বরাদ্দ, উচিত মূল্যে হলেও সার্বক্ষণিক ২২০ ভোল্টের বিদ্যুৎ সরবরাহ, সরকার থেকে সেবামূল্যের বিনিময়ে কেন্দ্রীয়ভাবে বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন জরুরি। এতে তৈরি পোশাক শিল্পের ৪২ দিনের অপেক্ষা সময় দুদিনে নামবে, স্থানীয় মূল্য সংযোজন ও পশ্চািশল্পে সংযোগ তথা কর্মসংস্থান বাড়বে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে রুলস অব অরিজিন এক থেকে চার স্তরে বৃদ্ধি পাবে। কুটির, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র শিল্পে কাঠামোগত প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাপক সহায়তা জরুরি।

১৬. তাত্ত্বিক ও দেশে-বিদেশে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে সিদ্ধহস্ত বিআইডিএসের মহাপরিচালক বিনায়ক সেন সম্প্রতি বলেছেন, যে অর্থনীতির পথ চলার নির্ধারিত ছকে নজরদারি, প্রয়োজনীয় সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্তন, সক্ষমতাসম্পন্ন সরকারপ্রধানের শতভাগ আস্থাভাজন একটি অর্থনৈতিক উপদেষ্টাম-লী থাকা জরুরি। অনুরূপভাবে আর্থিক খাত তথা ব্যাংক, বীমা ও পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের জঞ্জাল সাফ করে সুস্থ নিয়মনীতি বিষয়ে পরামর্শদানের জন্য তিন বছর মেয়াদি একটি সংস্কার কমিশন সৃজনও খুবই সময়ের দাবি। সর্বনাশা এবং প্রাণহরণকারী করোনার ছোবলে অপেক্ষাকৃত স্বল্প আয় ও নিঃস্ব মানুষেরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সদাশয় সরকার খাদ্যসামগ্রী ও নগদে যে ত্রাণসামগ্রী মঞ্জুর করেছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই দালাল মধ্যস্বত্বভোগীরা চুরি করে নেয়। সামাজিক সুরক্ষাবলয়ের জন্য খুবই সতর্কতার সঙ্গে সরকারি ত্রাণ সহায়তাপ্রাপ্যদের তালিকাটি অবিলম্বে হালনাগাদ করা জরুরি। ১৯৯৮ সালে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার পর শেখ হাসিনার সরকার নয় মাস ধরে দেড় কোটি মানুষকে ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে প্রায় ষোলো আনা সঠিকভাবে উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ে একটি শক্তিমান পদ্ধতি নির্ধারণ করার সুপারিশ করছি। একই সঙ্গে কুটির, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র শিল্প উৎপাদনকারীদের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় এনে প্রকল্প প্রণয়ন ও অর্থসাহায্যপ্রাপ্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে পারলে কর্মসংস্থান, আয়-রোজগার, দারিদ্র্য নিরসন ও বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর সুফল আসবে।

পিএইচডি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সচিব; শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও সমাজকর্মী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here