উৎপাদনে আসার আগেই প্রয়োজনীয়তা হারাচ্ছে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র?

0
38

আবু তাহের

বাগেরহাটের রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ ও পরিচালনায় গঠিত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, এর প্রথম ইউনিট উৎপাদনে সক্ষম হয়ে ওঠার কথা ছিল গত বছরের শেষ নাগাদ। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী আগস্টে এটির উৎপাদন শুরুর কথা। তবে কভিড পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাজ অনেকটাই বিলম্বিত হয়েছে। এ অবস্থায় আগামী ডিসেম্বরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে বিদ্যুৎ খাতের সরকারি নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান ও রামপাল প্রকল্পের তত্ত্বাবধানকারী সংস্থা পাওয়ার সেল সূত্র জানা গিয়েছে। যদিও এখনো এর কয়লা আমদানিসংক্রান্ত চুক্তি সই হয়নি। কাজ শেষ হয়নি সঞ্চালন লাইন নির্মাণেরও। ফলে ডিসেম্বরেও বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারার বিষয়ে সংশয় রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।

নির্মাণে বিলম্ব এখন বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও সংশয়ের কারণ হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, সরকার এখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে দেখছে। এর মধ্যে যথাসময়ে উৎপাদনে আসতে না পারা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও রয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রও দেখা যাচ্ছে যথাসময়ে উৎপাদনে আসতে পারেনি। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ প্রায় অর্ধেক শেষ হলেও সময় বিবেচনায় এর প্রয়োজনীয়তা কিন্তু খুব বেশি নেই। কারণ এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে।

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন রেকর্ড সর্বোচ্চ পর্যায়ে। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদনের বছরভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা এরই মধ্যে অর্জন করে ফেলেছে বাংলাদেশ। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশনের (জাইকা) সহযোগিতায় প্রণীত ২০১৬ সালের মহাপরিকল্পনায় চলতি বছরের দেশের বিদ্যুতের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২৪ হাজার মেগাওয়াট। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন এরই মধ্যে ২৪ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। উন্নত বিশ্বের সাত দেশ (কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র) নিয়ে গঠিত জোট জি-৭ ঘোষণা দিয়েছে, জোটভুক্ত দেশগুলো শিগগিরই কয়লাভিত্তিক প্রকল্পে বিনিয়োগ বন্ধ করে দেবে। এর বদলে মনোযোগ দেয়া হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বাংলাদেশও এখন উৎপাদনে আসতে না পারা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উপযোগিতা পুনর্বিবেচনা করে দেখছে।

সময়মতো উৎপাদনে আসতে পারেনি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রও। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শুরু হয় মূলত ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল। বিআইএফপিসিএলের তথ্য অনুযায়ী কাজ শুরু হওয়ার তারিখ থেকে ৪১ মাসের মধ্যে প্রকল্প শেষ করতে হবে। সে হিসেবে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরেই রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদনক্ষম হয়ে ওঠার কথা।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে এখনো অনেক সময় প্রয়োজন। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাজের শুরুতে যে গতি ছিল, করোনার কারণে তা পিছিয়ে গিয়েছে। এখনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আমদানি চুক্তি হয়নি। কয়েক মাস ধরে ভারতীয় কর্মকর্তারা এ দেশে না আসায় চুক্তির বিষয়টি ঝুলে রয়েছে। এরপর কয়লা আমদানির জন্য টেন্ডার আহ্বানের বিষয়টিও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন শেষ করতেও এক বছরের বেশি সময় প্রয়োজন।

সময়মতো মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় এর আর্থিক ব্যয়ও অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, বাস্তবায়নের সময় বাড়লেও প্রকল্পের ব্যয়ে কোনো হেরফের হবে না।
বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা এখন আর খুব একটা দৃশ্যমান নেই বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক প্রকৌশলী এজাজ হোসেন। তিনি বলেন, রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা এখন আর খুব বেশি বোঝা যাবে না। কারণ যে পরিকল্পনাকে ঘিরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অনুমোদন দেয়া হয়েছিল তা সময়মতো উৎপাদনে না আসায় প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে।

তার ধারণা, আলোচিত এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন হয়ে যাওয়ায় সরকার এটি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তবে এটার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে হলে এখন অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ৪৩০ একর ভূমির উন্নয়নকাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া সীমানাপ্রাচীর ও স্লোপ প্রোটেকশনের কাজ শেষ। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মূল কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দুটি অংশের সঞ্চালন লাইনের মধ্যে একটি অংশের (৩৩ কেভি) কাজ শেষ হয়ে গেছে। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ১৩৫ কেভিএ ডিজেল জেনারেটর স্থাপন করা হয়েছে।

এছাড়া প্রকল্পে বিভিন্ন সময়ে নানা বাধাও এসেছে। ভারতীয় কোম্পানি ইএমসি বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য নির্মীয়মাণ খুলনা-মোংলা ২৩০ কেভি ডাবল সার্কিট লাইন নির্মাণকাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যায়। এ কাজের প্রয়োজনীয় মালামাল, যন্ত্রাংশ, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের কাজ তাদের করার কথা থাকলেও দুই দফা সময় বাড়িয়েও সে কাজ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে কোম্পানিটির ফেলে যাওয়া কাজ শুরু করছে সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ প্রতিষ্ঠান পিজিসিবি।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার কারণে সীমান্ত বন্ধ থাকায় ভারত থেকে যন্ত্রাংশ ও প্রয়োজনীয় মালামাল আসছে না। এছাড়া করোনার কারণে যেসব ভারতীয় কর্মকর্তা ও কর্মী নিজ দেশে চলে গিয়েছিলেন তারাও এখনো কাজে ফেরেননি। এরই মধ্যে প্রকল্পে ভারতীয় কর্মীদের দ্রুত ফেরার জন্য এবং প্রকল্পের মালামাল আনার জন্য সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা।

সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাইলে রামপাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের উপপরিচালক প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, কাগজে-কলমে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। দ্বিতীয় ইউনিটের উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য নেয়া হয়েছিল আগস্টে। কিন্তু কভিড মহামারীর কারণে গত বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি। প্রকল্পে প্রয়োজনীয় মালামাল আসতে দেরি হওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় লোকবল চলে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে কাজ বন্ধ ছিল।

তিনি বলেন, এখন প্রকল্পে গতি ফিরে পেয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ চলছে। আশা করছি আগস্টের মধ্যে আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং-টেস্টিং শুরু করতে পারব।

তথ্যমতে, বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ বিনিয়োগে রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) যৌথ কোম্পানি গঠন করে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সুন্দরবনের কাছাকাছি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ হওয়ায় পরিবেশবাদীসহ বিভিন্ন সংগঠন এ নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে এসেছে।

তথ্য অনুযায়ী, রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ২০১০ সালে। ওই বছরের নভেম্বরে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে একটি সমঝোতা চুক্তি সই হয়। এরপর ২০১২ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি এনটিপিসি ও বিপিডিবি যৌথ কোম্পানি গঠন করে। এরপর ২০১৩ সালের ১ আগস্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পায়। প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান হয় ২০১৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। চুক্তি সই হয় ২০১৬ সালের ১২ জুলাই।

রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের তত্ত্বাবধানে থাকা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নীতিসহায়তা সংস্থা ‘পাওয়ার সেল’ বলছে, সঞ্চালন লাইন বিলম্বিত হলেও যে লাইনটি বর্তমানে রয়েছে তা দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা সম্ভব।

রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর নির্দিষ্ট সময়সীমা জানতে চাইলে সংস্থাটির মহাপরিচালক (ডিজি) মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, এ বছর ডিসেম্বরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চূড়ান্ত দিন নির্ধারণ করা রয়েছে। আশা করা যায় বড় ধরনের কোনো অসুবিধা না হলে নির্ধারিত সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করা হবে।

রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানির চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কয়লা আমদানি চুক্তি কার্যক্রম চলছে। আশা করা যাচ্ছে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here