লিসবনের গণপরিবহন ব্যবস্থা

0
36

কায়সুল খান

পশ্চিম ইউরোপের দেশ পর্তুগাল। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশটির রাজধানী ও সর্ববৃহৎ বন্দর নগরী লিসবন। পৃথিবীর অন্যতম সেরা গণপরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে লিসবনে। এখানকার জনগণের যাতায়াতের প্রধানতম মাধ্যম মেট্রোরেল। এছাড়া শহরের নানা প্রান্তে যাতায়াতের জন্য রয়েছে বাস, ট্রাম, কম্বোয়োস/সিপি (লোকাল ট্রেন) এবং লঞ্চ।

লিসবন মিউনিসিপ্যালিটিতে বাস ও ট্রাম চলাচল পরিচালনাকারী কোম্পানির নাম ক্যারিস। এটি ১৮৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বছরে ১৫০ মিলিয়ন যাত্রী পরিবহন করে থাকে ক্যারিস। অন্যদিকে লিসবনের ট্রেন বা কম্বোয়োস ১৮৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই তুলনায় লিসবন মেট্রোর বয়স অনেক কম। ১৯৫৯ সালে বাইশা শিয়াদো থেকে জারদিম জুলোজিকো পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ আন্ডারগ্রাউন্ড পথে লিসবন মেট্রো সার্ভিস যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে লিসবন মেট্রো শহরের পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত হয়েছে। লিসবনের পশ্চিমে মেট্রো সার্ভিস নেই। পশ্চিমাঞ্চলে ভ্রমণের জন্য কম্বোয়োস, বাস ও ট্রাম মূল ভরসা। এছাড়া লিসবনের বুক জুড়ে বয়ে চলা তাগুস নদী পার হওয়ার জন্য এখানে লঞ্চ সার্ভিস রয়েছে।

লিসবনের গণপরিবহন ব্যবস্থার মাঝে চমৎকার সমন্বয় রয়েছে। এখানে মেট্রো স্টেশনের পাশে বাস স্ট্যান্ড, কম্বোয়োস স্টেশন ও লঞ্চঘাট রয়েছে। ফলে যাত্রীরা মেট্রো থেকে বের হয়ে খুব সহজেই অন্য পরিবহনে উঠতে পারে। সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো একটি মাত্র পরিবহন পাস ব্যবহার করে লিসবনের সব ধরনের পরিবহনে ভ্রমণ করা যায়। এখানকার পরিবহন ব্যবস্থার জন্য দুটি কার্ড রয়েছে। লিসবোয়া ভিভা ও ভিভা ভিয়াজেই।

লিসবোয়া ভিভা মূলত একটি স্থায়ী কার্ড যা পর্তুগালের ট্যাপ নম্বরধারী জনগণ ব্যবহার করতে পারে। এতে ৩, ৫, ১০, ২০, ৩০ ও ৪০ ইউরো পর্যন্ত জ্যাপিং রিচার্জ করা যায়। আবার এটি দিয়ে একটি যাত্রার টিকিটও কেনা যায়। প্রতি মেট্রো/ক্যারিস যাত্রায় একক টিকিটে খরচ পড়ে ১.৫০ ইউরো। তবে জ্যাপিং রিচার্জ থেকে খরচ করলে যাত্রা প্রতি ১.৩৪ ইউরো খরচ হয়। অন্যদিকে ট্রাম ভ্রমণে প্রতি যাত্রায় ২.৮৫ ইউরো খরচ পড়ে। লিসবোয়া ভিভা কার্ড মাসিক ভিত্তিতেও রিচার্জ করা যায়। লিসবন মিউনিসিপ্যালের মাঝে চলাচলের জন্য ৩০ দিনের একটি মাসিক কার্ডের খরচ পড়ে ৩০ ইউরো এবং মেট্রোপলিটনের মধ্যে চলাচলের জন্য খরচ পড়ে ৪০ ইউরো। তবে সিনিয়র সিটিজেন, ২৩ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থী ও অপেক্ষাকৃত কম আয়ের মানুষের জন্য ২৫% ছাড়ে মাসিক কার্ড রিচার্জের সুযোগ রয়েছে। ট্যাপ নম্বর, পাসপোর্ট, ছবি ও ১২ ইউরো ফি প্রদান সাপেক্ষে ক্যাম্পো গ্রান্দে, মারকেশ পম্বল থেকে লিসবোয়া ভিভা কার্ড করা যায়। এছাড়া যে কোনো মেট্রো স্টেশন থেকে ৭ ইউরো ফি প্রদানের মাধ্যমে ৭-১০ দিনের মধ্যে লিসবোয়া ভিভা কার্ড পাওয়া যায়। সাধারণত তিন বছর মেয়াদি এই কার্ডে কার্ড নম্বর, যাত্রীর নাম ও ছবি থাকে। অন্যদিকে ভিভা ভিয়াজেই মূলত পর্যটক বা অনিয়মিত যাত্রার জন্য ব্যবহার করার কার্ড। ৫০ সেন্টের বিনিময়ে যে কোনো স্টেশন বা মেট্রো/কম্বোয়োস স্টেশনে নির্ধারিত ভেন্ডিং মেশিন থেকে ভিভা ভিয়াজেই কার্ড কেনা যায়। এই কার্ডে মাসিক ভিত্তিতে রিচার্জের সুযোগ নেই। তবে সিঙ্গেল টিকিট, জ্যাপিং রিচার্জ, ২৪ ঘণ্টা কিংবা তিন দিনের জন্য রিচার্জ করা যায়। ২৪ ঘণ্টা ব্যবহারের জন্য খরচ পড়ে ৬.৪০ ইউরো। ভিভা ভিয়াজেই কার্ড ব্যবহার করে লিসবন মিউনিসিপ্যালের মাধ্যমে বাস, মেট্রো, কম্বোয়োস (ট্রেন), ট্রাম ও ফেরিতে চড়া যায়।

লিসবনের নাগরিকদের চলাচলের মূল মাধ্যম মেট্রোরেল। আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত মেট্রো সার্ভিস শহরের বুক জুড়ে দাপিয়ে বেড়ায়। লাল, নীল, সবুজ ও হলুদ রঙে বিভক্ত মেট্রো লাইনের মোট দূরত্ব ৪৬ কিলোমিটার। লিসবন মেট্রোর মোট স্টেশন সংখ্যা ৫৫টি। সকাল সাড়ে ৬টা থেকে শুরু হয়ে রাত ১টা পর্যন্ত এই মেট্রো সার্ভিস চালু থাকে। সর্বোচ্চ ৭২ কিলোমিটার বেগে মেট্রোগুলো চলাচল করে।

লিসবন মেট্রো মূলত আন্ডারগ্রাউন্ড। তবে লাল ও সবুজ লাইনের কিছু অংশ এলিভেটেড। লিসবন মেট্রোর নীল লাইনটি রেবোলেইরা থেকে সান্তা অ্যাপোলোনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি সাও সেবাস্তিওতে লাল লাইন, মারকেশ পম্বলে নীল লাইন এবং বাইশা শিয়াদোতে সবুজ লাইনকে অতিক্রম করেছে। হলুদ লাইনটি ওডিভেলাস থেকে রাটো পর্যন্ত বিস্তৃত। যা নীল লাইনকে মারকেশ পম্বল, সালদানহাতে লাল লাইন এবং ক্যাম্পো গ্রান্দেতে সবুজ লাইনকে অতিক্রম করেছে। লাল লাইনটি সাও সেবাস্তিও থেকে লিসবন এয়াপোর্ট পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি সাও সেবাস্তিওতে নীল লাইন, সালদানহাতে হলুদ লাইন এবং আলামেদাতে সবুজ লাইনকে অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে তেলহেইরস থেকে কয়েস দো সর্দে পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি ক্যাম্পো গ্রান্দেতে হলুদ লাইন, আলামেদাতে লাল লাইন এবং বাইশা শিয়াদোতে নীল লাইনকে অতিক্রম করেছে।

মেট্রো স্টেশনের সঙ্গেই কম্বোয়োস (ট্রেন) স্টেশন রয়েছে। লিসবনের রেবোলেইরা, জারদিম জুলোজিকো, রেস্তোরাদোরেস, কয়েস দো সর্দে, এন্ত্রে ক্যাম্পোস, ক্যাম্পো গ্রান্দে, রোমা, আইইরো এবং ওরিয়েন্তে মেট্রো স্টেশনের পাশেই কম্বোয়োস স্টেশন রয়েছে। এই ট্রেনে করে লিসবনের উপকণ্ঠে অবস্থিত নানা উপশহরে ভ্রমণ করা যায়।

মেট্রো ও কম্বোয়োসের পর লিসবনের জনসাধারণের চলাচলের জন্য তৃতীয় জনপ্রিয় যানবাহন বাস। ভোর ৫টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত লিসবনে বাস চলাচল করে থাকে। লিসবন মিউনিসিপ্যালের মধ্যে চলাচলকারী বাস সার্ভিস প্রদানকারী কোম্পানির নাম ক্যারিস। এই বাসে লিসবোয়া ভিভা কিংবা ভিভা ভিয়াজেই উভয় কার্ড ব্যবহার করে ভ্রমণ করা যায়। প্রতি যাত্রায় এজন্য ১.৫০ ইউরো মূল্যের টিকিট অথবা ১.৩৪ ইউরো ক্রেডিট খরচ হয়। তবে দৈনিক, সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক চুক্তিতে লিসবোয়া ভিভা কার্ড থাকলে কার্ডের ক্রেডিটের ভ্যালিডিটি থাকা পর্যন্ত খুশি মতো যতবার ইচ্ছা বাসে ভ্রমণ করা যায়।

এছাড়া লিসবন মেট্রোপলিটনে ভ্রমণের জন্য আলাদা বাস রয়েছে। এই বাসে লিসবোয়া ভিভা কার্ড ব্যবহার করে চড়া যায়। তবে ভিভা ভিয়াজেই কার্ড এখানে গৃহীত হয় না। বিকল্প হিসেবে চালকের কাছে নগদ অর্থ প্রদানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানের টিকিট সংগ্রহ করা যায়। লিসবন মেট্রোপলিটনের মাঝে চলাচলকারী এই বাস কিছুটা ব্যয়বহুল।

লিসবনের ঐতিহ্যবাহী গণপরিবহন ট্রাম। পর্তুগিজ ভাষায় ট্রামকে বলা হয় ইলেক্ট্রিকো। মূলত লিসবনের পর্যটক অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ট্রামের প্রচলন রয়েছে। লিসবোয়া ভিভা কিংবা ভিভা ভিয়াজেই উভয় কার্ড ব্যবহার করে লিসবনের ট্রামে ভ্রমণ করা যায়। শহরের পাহাড়ি উঁচুনিচু পথে চলাচল ও চারপাশের দৃশ্য দেখার জন্য ট্রামের বিকল্প নেই। স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকরাও আগ্রহভরে লিসবনের ট্রামে চড়ে থাকেন। লিসবন ইলেকট্রিকোয় ট্র্যাডিশনাল ও মডার্ন দুই ধরনের ট্রাম (ইলেক্ট্রিকো) দেখতে পাওয়া যায়। মডার্ন ট্রামগুলো রোসিওর আশপাশের পর্যটক অধ্যুষিত এলাকায় চলাচল করে থাকে। ট্রাম ভ্রমণের জন্য প্রতি যাত্রার টিকিটের মূল্য ২.৮৫ ইউরো, তবে লিসবোয়া ভিভা কার্ডে জ্যাপিং রিচার্জ করা থাকলে যাত্রাপ্রতি ১.৫০ ইউরো করে খরচ হয়।

তাগুস নদীর তীরে অবস্থিত লিসবনে জনগণের চলাচলের জন্য লঞ্চ সার্ভিস রয়েছে। সান্তা অ্যাপোলোনিয়া, কয়েস দো সর্দেসহ বিভিন্ন স্থানে লঞ্চঘাট রয়েছে। লিসবোয়া ভিভা কার্ড ব্যবহার করে এই লঞ্চে যাতায়াত করা যায়। লিসবনের নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ দ্রুতগামী ও নিরাপদ নৌ যাত্রা নিশ্চিতে সর্বদা সচেষ্ট থাকেন। এখানে কঠোরভাবে লঞ্চে যাত্রীসীমা মেইনটেইন করা হয়।

পর্যটক নির্ভর অর্থনীতির দেশ পর্তুগালের গণপরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত ও নিয়মতান্ত্রিক। ইউরোপের অপেক্ষাকৃত কম ধনী এই দেশটির গণপরিবহন ব্যবস্থাকে মডেল করে বাংলাদেশের মেগাসিটিগুলোতে গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জনবহুল শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য লিসবনের গণপরিবহন ব্যবস্থা একটি আদর্শ মানদন্ড হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here