দ্রুত ব্যবস্থা নিন, না হলে নারী পাচার চলতেই থাকবে?

0
22

মধ্যযুগের দাস ব্যবসার ‘আধুনিক’ সংস্করণ মানব পাচার নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নানা বিধিবিধান ও নজরদারি সত্ত্বেও মানবতাবিরোধী এ অপরাধ যে থেমে নেই- সম্প্রতি বাংলাদেশের এক তরুণীকে ভারতে বিবস্ত্র করে ধর্ষণ ও নির্যাতনের ভিডিও ‘ভাইরাল’ হওয়ার মধ্য দিয়ে আরেকবার স্পষ্ট হলো। আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি- চাকরি, চলচ্চিত্রে সুযোগ দেওয়া বা প্রেম ও বিয়ের নাম করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যে পাচারকারী চক্র পুলিশের হাতে আটক হয়ে থাকে। এর পর কিছুদিন মানব বা নারী পাচার বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যায়। অথচ পাচারকারীরা যে থেমে নেই- কথিত ‘টিকটক হৃদয়’ আটক হওয়া তার প্রমাণ। বস্তুত পাচারকারীরা যে সীমান্তের উভয় পাশেই সমান সক্রিয় এবং পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত- এ ঘটনায় তা স্পষ্ট। আমরা গভীর বিস্ময় ও উদ্বেগের সঙ্গে দেখলাম, করোনার সময় সীমান্তে কড়াকড়ি সত্ত্বেও এই চক্র ঘটনার শিকার নারীকে নিয়ে বৈধ নথিপত্র ছাড়াই ভারতে পাড়ি দিতে পেরেছে।

শুধু তাই নয়, বেঙ্গালুরু শহরে গিয়ে অপরাধ সংঘটন এবং তা ভিডিও করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। সীমান্তের অপর পাশে শক্ত খুঁটি ছাড়া তা কীভাবে সম্ভব? শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের এ বক্তব্য যথার্থ যে, এরা আন্তর্জাতিক পাচারকারী দলের সদস্য। তাদের নেটওয়ার্ক ভারত ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে সক্রিয়। আপাত স্বস্তির বিষয়, বাংলাদেশ থেকে তরুণীটিকে পাচারকারী চক্রের মূল হোতা টিকটক হৃদয়সহ নির্যাতন ও ধর্ষণকারী ছয়জনকেই আটক করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধার করা গেছে পাচার ও নির্যাতনের শিকার তরুণীকেও। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শুধু একজন তরুণীকে নিয়ে ছয়জন পাচারকারী বাংলাদেশ থেকে বেঙ্গালুরু যেতে পারে না। তাদের হাতে আটক বা পাচার হওয়া অন্য তরুণীদেরও উদ্ধার করতে হবে। তাদের নেটওয়ার্কের ভারতীয় সদস্যদের শনাক্ত ও আটকেও দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্তরিকভাবে কাজ করবে বলে প্রত্যাশা। এই চক্র বিভিন্ন সময় কীভাবে সীমান্ত পাড়ি দিত, তাও চিহ্নিত করতে হবে। সীমান্তের এ-পাশেই আরও সহযোগী ছাড়া তাদের পক্ষে এ অপকর্ম সম্ভব নয়।

আলোচ্য এ ঘটনার শিকার তরুণীকে উদ্ধার এবং চক্রটিকে শাস্তি প্রদান ছাড়াও পাচার বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের কথা ভাবতে হবে। আমরা জানি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে পিছিয়ে থাকা দেশ ও অঞ্চলগুলোতে পাচারের প্রকোপ যেন অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু বাংলাদেশ যখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে, তারপরও মানবতাবিরোধী এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন? আমরা যখন উন্নত দেশের কাতারে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছি, তখনও মানব পাচারের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের খবর আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। কয়েক বছর আগে সমকালেই প্রকাশিত একটি হিসাবে আমরা দেখেছিলাম, নানা কৌশলে প্রতি বছর অন্তত ১৫ হাজার নারী ও শিশু পাচার হয়ে থাকে। আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি আরও বাড়াতে হবে।

এই আশঙ্কাও আমলে নিতে হবে যে, বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরোও পাচারকারীদের সুবিধা করে দেয়। যে কারণে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা মাঝেমধ্যে ধরা পড়লেও দুর্বল মামলা ও ধারার কারণে ছাড়া পেয়ে যায়। আমরা চাই, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মানব পাচার রোধে যে সদিচ্ছা রয়েছে, তা মাঠ পর্যায়েও প্রতিফলিত হোক। পাচারকারীরা প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়াও পেয়ে থাকে।

কয়েক বছর আগে খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রণীত মানব পাচারে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের তালিকায় এ চিত্র উঠে এসেছিল। মনে রাখতে হবে, পাচারের বড় অংশ সংঘটিত হয় স্থল ও নৌ সীমান্ত পথে। সীমান্ত অঞ্চলে কড়া নজরদারি এবং পাচারে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমেও পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতেও মনোযোগ দিতে হবে।

প্রশাসনের পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে তৎপর বেসরকারি উন্নয়ন ও সামাজিক সংগঠনগুলোও এগিয়ে আসতে পারে। সচেতন নাগরিকই হতে পারে মানব পাচার রোধের উত্তম প্রহরী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here