‘দুর্যোগে বাঁধ ভাঙে, মেরামত করেন ক্ষতিগ্রস্তরাই’

0
18
খুলনার কয়রা উপজেলার পবনা এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে বেড়িবাঁধ মেরামত করছেন গ্রামবাসী। শুক্রবার তোলা

সত্যপাঠ ডেস্ক

ভোরের আলো ফোটার আগেই একদল লোক ঝুড়ি, কোদাল ও বাঁশ নিয়ে বাঁধ মেরামতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। পরে সেখানে দলে দলে লোকজন এসে যোগ দেন। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই নিজেদের ভালো থাকার তাগিদে কাজে এসেছেন সবাই। সেখানে বৃদ্ধ থেকে শুরু করে নারী ও শিশুরা কাজে সহযোগিতা করেছেন।

শুক্রবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ১৪/১ নম্বর পোল্ডারের আওতাধীন খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের পবনা এলাকায় গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। প্রতি দুর্যোগের পর ভাঙা বাঁধ মেরামতে স্থানীয় মানুষকেই এভাবে দায়িত্ব নিতে দেখা যায়। এটা এ অঞ্চলের মানুষের নিয়মিত কাজের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার এবং দুর্যোগের পর বাঁধের ভাঙন ঠিক করার ব্যাপারে পাউবো উদাসীনতা দেখায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

গ্রামবাসী জানায়, যে ভাঙন মেরামতে এত পরিশ্রম, এত কষ্ট; সেখানে বাঁধ ভাঙার কথা ছিল না। আইলায় যখন এই বাঁধ ভেঙেছিল, সে সময় কয়েক দফা চেষ্টার পর বিপুল অর্থ ব্যয়ে তা মেরামত করা হয়েছিল। ১০ বছর আগে নির্মিত এ বাঁধটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ফের ভেঙে আগের মতো দুর্ভোগে ফেলে দিয়েছে হাজারো মানুষকে।

বাঁধ মেরামতে আসা লোকজন অভিযোগ করেন, এ বাঁধটি সংস্কারের জন্য কর্তৃপক্ষকে বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও তারা এড়িয়ে গেছে। এলাকার জনপ্রতিনিধিদের জানালে এ কাজ তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না বলে জানিয়ে দেন। উপজেলা প্রশাসনও একই কথা জানায়। অথচ বাঁধ ভাঙলে বারবার ভুক্তভোগী মানুষকেই তা রক্ষায় এগিয়ে আসতে দেখা যায়।

দেখা গেছে, স্থানীয় মানুষ কেবল পবনা বাঁধ মেরামত করছেন তা নয়। ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ এর প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসে উপজেলার যে সাতটি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙেছে, তা মেরামতের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের গাতিরঘেরি এলাকার বাঁধ মেরামতে আসা শমসের মোড়ল বলেন, ‘এক দিন আয় না করলে সংসার চলে না, তবুও বাঁচার তাগিদে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতি হচ্ছে। আমরা না করলি এ বাঁধ বানতি অনেক দেরি হবে। তখন এলাকায় আর বাস করবার মতো পরিস্থিতি থাকবে না।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা সদরের পশ্চিম পাশে হামকুড়ো এলাকার বাঁধটি দুই বছরের অধিক সময় ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও সংস্কার করা হয়নি। ফলে ইয়াসের প্রভাবে ওই স্থানে বাঁধ ছাপিয়ে লোকালয়ে কপোতাক্ষ নদের পানি প্রবেশ করে। স্থানীয় মানুষ কয়েক দিন ধরে সেখানে কাজ করে কোনো রকমে রক্ষা করেছেন।

দশহালিয়া বাঁধের পার্শ্ববর্তী আটরা গ্রামের বাসিন্দা ইউছুফ মোড়ল বলেন, বুধবার জোয়ারের চাপে বাঁধ ভাঙার পর সেখানে পাউবোর নিয়োজিত এক শ্রমিক সরদার কিছু বস্তা নিয়ে হাজির হন। গ্রামবাসীর তোপের মুখে তিনি পালিয়ে যান। পরে আর কর্তৃপক্ষের কেউ সেখানে আসেননি। লোকজন গত তিন দিন বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। জোয়ারের তীব্র চাপে বাঁধের তিনটি স্থানে এক কিলোমিটারের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

এদিকে দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের আংটিহারা বাঁধ শুক্রবার জোয়ারের আগে মেরামত করেছেন স্থানীয়রা। ওই কাজে অংশ নেওয়া ছাত্রলীগ নেতা আবু সাঈদ খান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো স্থানীয় মানুষ টানা পরিশ্রমে মেরামত করেছেন।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বলেন, কয়রার আংটিহারা, বেদকাশী, মঠবাড়িয়া ও পবনা এলাকায় স্থানীয় লোকজন স্বেচ্ছাশ্রমে বেড়িবাঁধ সংস্কার করছেন। পাউবোর পক্ষ থেকে বেড়িবাঁধ মেরামতের জন্য বাঁশ ও জিও ব্যাগ দেওয়া হয়েছে। লোকালয়ে পানি ঢোকা ঠেকানো গেলে তারপর পাউবো বাঁধ শক্তিশালী করার কাজ করবে। ইতোমধ্যে ডিপিএম পদ্ধতিতে বাঁধ শক্তিশালী করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিয়েছে। দুর্যোগের পর পাউবো কেন সঙ্গে সঙ্গে বেড়িবাঁধ সংস্থার করে না- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাদের কাজ শুরু করতে কিছুটা সময় লাগে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য আকতারুজ্জামান বাবু জানান, কয়েক দশক আগে নির্মিত বাঁধগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। যে কারণে নদীতে জোয়ারের চাপ বাড়লে সহজেই কোনো না কোনো স্থানে ভেঙে যায়। তখন নিজেদের জানমাল রক্ষায় স্থানীয় মানুষ এগিয়ে আসে। পরিকল্পিতভাবে এসব বাঁধ সংস্কার করা না গেলে এ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে না। উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ এসব বাঁধ মেরামতের জন্য একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সেটি বাস্তবায়ন হলে দুরবস্থা কেটে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here