মজুত সংকটে কমছে না চালের দাম

0
34

সত্যপাঠ ডেস্ক
খাদ্যশস্য মজুতে সরকার এখনও স্বস্তির জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। সরকারের বোরো সংগ্রহ শুরু হয়েছে। তবে সেটিও চালের বাজার বা সরকারের মজুত পরিস্থিতি, কোথাও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারছে না। এই সুযোগটি নিচ্ছে চালের বড় ব্যবসায়ীরা। ফলে বোরোর ভরা মৌসুমেও কমছে না চালের দাম। বাজার ঘুরে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এদিকে গত বছর বোরো এবং এবার আমনে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ কর্মসূচি শতভাগ সফল হয়নি। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে এবার বোরো সংগ্রহ কর্মসূচি শতভাগ সফলতা আনতে মাঠে কাজ করছে সরকার। এ জন্য জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এবারের চলতি বোরো মৌসুমে সাড়ে ছয় লাখ মেট্রিক টন ধান এবং সাড়ে ১১ লাখ মেট্রিক টন চালসহ মোট ১৮ লাখ মেট্রিক টন বোরো ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। খাদ্য অধিদফতর ৭ মে বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছে। খাদ্য অধিদফতরের এ কার্যক্রম চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ বছর কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি বোরো ধান কেনা হচ্ছে ২৭ টাকা কেজি দরে। আর মিলারদের কাছ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে সিদ্ধ চাল এবং ৩৯ টাকায় আতপ চাল কেনা হচ্ছে। গত বছর একই মৌসুমে বোরো ধান ২৬ টাকা কেজি দরে, ৩৭ টাকা কেজি দরে সিদ্ধ চাল এবং ৩৬ টাকা কেজি দরে আতপ চাল কিনেছে সরকার।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার দুই কোটি পাঁচ লাখ টন বোরো ধানের চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব গুদামে ২৪ মে পর্যন্ত মজুত খাদ্যশস্য, বিশেষ করে চাল ও ধান মজুতের পরিমাণ ৭ লাখ ৯২ হাজার মেট্রিক টন। এরমধ্যে চাল মজুত আছে ৫ লাখ মেট্রিক টন এবং গম মজুতের পরিমাণ ২ লাখ ৯২ হাজার মেট্রিক টন। সরকারের সংশ্লিষ্টরা মনে করেন খাদ্যশস্যের এ মজুত সন্তোষজনক নয়। সরকারি গুদামে কমপক্ষে ১০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য থাকলে তা সন্তোষজনক বলা যায়।
সরকারের খাদ্যশস্য মজুত পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকরাই অসন্তুষ্ট। চলতি বছরের ২২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বর্তমান খাদ্য মজুতকে আশঙ্কাজনকভাবে কম বলেছেন। তিনি দ্রুত মজুত বাড়ানোর তাগিদ দেন। একই সভায় অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার জানিয়েছেন, খাদ্যশস্যের মজুত কমপক্ষে ১০ লাখ টন থাকা উচিত। ১০ লাখ টনের কম খাদ্য মজুত সরকারের জন্য অস্বস্তিকর।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরকারের সন্তোষজনক মজুত পরিস্থিতি না থাকায় বাজারে চালের দাম কমছে না। অথচ চলতি বোরো মৌসুমে চালের দাম কম থাকার কথা। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত বছর আমন ও বোরোর উৎপাদন কম হওয়া, সরকারি মজুত কমে যাওয়া এবং করোনার কারণে খাদ্যশস্যের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ায় চালের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। যা অতীতে কখনও হয়নি। এ সময়ে গরিবের মোটা চাল নামে পরিচিত গুটিস্বর্ণা বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকা কেজি দরে। যা অনেকটাই রেকর্ড। স্বাভাবিক নিয়মে মোটা জাতের এই গুটিস্বর্ণা চালের কেজি ৩৫ থেকে ৩৬ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। ধনী মানুষের মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৬৮ টাকা ও নাজিরশাইলের কেজি উঠেছে ৭২ টাকায়। করোনা মহামারিতে চালের এই দাম অনেকটাই অস্বস্তিকর।
সরকারের মজুত, বোরো ধান ও চাল কেনার নির্ধারিত দর নিয়ে চাল উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীদের মধ্যেও রয়েছে ভিন্নমত। তারা বলছেন, চালের মজুত বাড়াতে হবে, তা না হলে দাম কমনো সম্ভব নয়। কেননা, সরকারের মজুত পরিস্থিতি খারাপ থাকলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই। যা কোনোভাবেই ঠেকানো সম্ভব নয়। গত বছর বিদেশ থেকে চাল আমদানি করেও সরকারের মজুত বাড়ানো যায়নি বলে বাজারে চালের দাম কমেনি। যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। সরকার বোরো ধান ও চালের যে দাম নির্ধারণ করেছে তাকে কেউ কেউ অনেকটাই স্বস্তিদায়ক বললেও অনেকে এর বিরোধিতা করছেন। একপক্ষ বলছেন, নির্ধারিত দরে সরকারকে চাল দেবে মিলাররা। অন্য পক্ষ বলছেন, চাল কেনার দর নির্ধারণ এ বছরও সঠিক হয়নি। তাই সরকার কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ বোরো কিনতে পারবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশিদ (মিনিকেট রশিদ) জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর সরকার চালের ভালো দাম দিয়েছে। আমরা সরকারকে এ বছর হয়তো ভালো পরিমাণে চাল দেবো। হয়তো এ বছর সরকার বোরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করতে পারবে।
তবে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কে এম লায়েক আলী জানান, সরকারের দর নির্ধারণ এ বছরও সঠিক হয়নি। কারণ, প্রতিকেজি ধানের দাম ২৭ টাকা হলে এক কেজি চালের উৎপাদন খরচ দাড়ায় ৪২ টাকা। সেক্ষেত্রে আমরা ৪০ টাকা কেজি দরে চাল সরকারকে দেবো কীভাবে? কাজেই সরকারের বোরো সংগ্রহ অভিযান সফল হবে কিনা তা নিয়ে আমি সন্দিহান।
লায়েক আলী জানিয়েছেন, বর্তমানে কাঁচা ধানের মণ ৯০০ টাকা। এই ধান শুকালে ৪০ কেজির স্থলে নিট ওজন দাঁড়ায় ৩০ কেজি। সেক্ষেত্রে এক মণ শুকনো ধানের দাম দাড়ায় ১২শ’ থেকে ১৩শ’ টাকা। আমরা সব সময় সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই, কিন্তু পরিস্থিতি এমন হলে মিলারদের পক্ষে সরকারের গুদামে ধান ও চাল দেওয়া কতটুকু সম্ভব- তা বিবেচনার সময় এসেছে।
সরকারের খাদ্যশস্য মজুত পরিস্থিতি সম্পর্কে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার জানিয়েছেন, মজুত বাড়াতে সরকারকে সংগ্রহ করতে হবে, আর এটি বাড়াতে ধান সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা থাকতে হবে। প্রতি ইউনিয়নে ধান কেনার মতো অবস্থা সরকারের এখনও গড়ে ওঠেনি। ইউনিয়ন পর্যায়ে কেনার মতো অবস্থা নেই, সংগ্রহের পর তা রাখার জন্য সরকারের গোডাউনও নেই।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে খাদ্য সচিব নাজমানারা খানুম জানান, এখন আর মধ্যস্বত্বভোগী নেই। তবে এক্ষেত্রে কৃষকদের সচেতন হতে হবে। তারা যদি তাদের লটারি স্লিপটি কারও কাছে বেচে না দেয়, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগী সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ নেই। সরকার অ্যাপস ও লটারির মাধ্যমে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনে। ধানের ন্যায্যমূল্য কৃষকের ব্যাংক হিসেবে পরিশোধ করা হয়।
বাদামতলী-বাবুবাজার চাল আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন জানিয়েছেন, বাজারে চালের দাম কমানোর জন্য সরকারের মজুত বাড়ানোর কোনও বিকল্প নাই। যতভাবেই হোক মজুত বাড়াতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হলে বোরো ধান ও চাল কেনার দাম পুনর্র্নিধারণ করতে হবে। দেশীয় বাজার থেকে কিনেই চালের মজুত বাড়াতে হবে। আমদানি করে নয়। মজুত পরিস্থিতি বাড়লে চালের দাম কমবে, তা কেউ ঠেকাতে পারবেন না।
তিনি জানান, যে যাই বলুক, চালের বাজারে এখন আর কোনও সিন্ডিকেট নাই। বাজারের এমন পরিস্থিতিতে সিন্ডিকেট করে চালের ব্যবসা করা সম্ভব নয়। আবার কৃত্রিম সংকটও সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। চালসহ এখন সব ধরনের নিত্যপণ্যের বাজার প্রতিযোগিতাপূর্ণ। এছাড়া সরকারের মনিটরিংও জোরদার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৬ এপ্রিল থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বোরো ধান সংগ্রহ হয়েছিল দুই লাখ ১৯ হাজার টন। এ ছাড়াও ছয় লাখ ৬৭ হাজার ৮৯০ টন সিদ্ধ চাল এবং ৯৯ হাজার ১২৩ টন আতপ চাল সংগ্রহ করা হয়েছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here