করোনার টিকার মিশ্রণ: আলোর প্রত্যাশা

0
30

ড. নাদিম মাহমুদ

অনেকেরই প্রশ্ন, করোনাভাইরাসের অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ অন্য কোনো কোম্পানির গ্রহণ করলে অসুবিধা হবে কিনা। প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজের টিকা সময়মতো না পাওয়ায় এই শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকার ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে অপফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কিনলেও তারা তা সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশে টিকা সংকট চরমে।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ২০ মে পর্যন্ত দেশটিতে ৯৮ লাখ ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ৯১২ জনকে প্রথম ডোজ আর ৩৯ লাখ ৩০ হাজার ৭৫১ জন দ্বিতীয় ডোজ টিকা গ্রহণ করেছেন। ফলে ১৪ লাখ ৩৯ হাজার ৮২৪ ব্যক্তির জন্য এই টিকার দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োজন।

দুই টিকার ব্যবধান দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে দেওয়ার কথা বলা হলেও, নির্ধারিত এই সময়ে প্রথম ডোজপ্রাপ্তরা একই কোম্পানির দ্বিতীয় ডোজ পাবেন কিনা তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তবে সরকার ইতোমধ্যে চীন ও রাশিয়ার ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য চুক্তি করেছে। চীনের উপহারস্বরূপ কয়েক লাখ টিকা ইতোমধ্যে দেশে এসেছে।

এই অবস্থায় বাংলাদেশে প্রথম ডোজপ্রাপ্তরা ধরেই নিচ্ছেন, তাদের দ্বিতীয় ডোজ অন্য কোম্পানির গ্রহণ করতে হবে। তবে করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে বিভিন্ন কোম্পানির ভিন্ন প্রযুক্তিতে ভ্যাকসিনগুলো তৈরি হওয়ায় বিপত্তিটা বাড়ছে।

এখন পর্যন্ত যেসব টিকা বাজারে এসেছে, সেগুলো মূলত ভাইরাসের বাহক (অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও স্পুটনিক), নিউকিক অ্যাসিড বা এমআরএন নির্ভর (ফাইজার ও মডার্না), নিষ্ফ্ক্রিয়করণ ভাইরাস (সিনোভ্যাক) ধরনের হয়ে থাকে। এদের মধ্যে এবারই এমআরএনভিত্তিক ভ্যাকসিন ব্যাপক সফলতা দেখাচ্ছে।

তবে ভ্যাকসিনের ধরন যাই হোক না কেন, করোনাভাইরাসের বিপরীতে গড়ে ওঠা অ্যান্টিবডি কিন্তু একই থাকছে। ধরনের ভ্যাকসিনে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডিগুলো করোনাভাইরাসকে প্রায় একই প্রক্রিয়ায় নিষ্ফ্ক্রিয়করণ করার ক্ষমতা রাখে।

ফলে ভ্যাকসিনের মিশ্রণেও শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার প্রশিক্ষণটা একই নীতি অনুসরণে হয়। এই মৌলিক বিষয়টি মাথায় রেখে গবেষকরা ভ্যাকসিনের মিশ্রণে কার্যকারিতা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে কাজ করছেন। ১২ মে চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণায় অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও ফাইজারের ভ্যাকসিনের মিশ্রণের ব্যবহারে ভালো ফলাফল পাওয়ার কথা জানিয়েছে। যদিও এটি তাদের আংশিক প্রবন্ধ, তবে তারা অন্যন্য ভ্যাকসিনের মিশ্রণ নিয়ে কাজ করছে।

অন্যদিকে, ১৮ মে স্পেনে একদল গবেষক তাদের গবেষণার ফল উপস্থাপন করেছেন, যেখানে অনেক হতাশার মধ্যে আমরা কিছু ভালো ফল দেখতে পেয়েছি। এই গবেষকদল জানাচ্ছে তারা প্রায় ৬৬৩ ব্যক্তিকে দৈবক্রমে প্রথম ডোজ অপফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা দেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ ফাইজার-বায়োএনটেক ভ্যাকসিন দেওয়ার পর তাদের শরীরে ইমিউনিটি কয়েকগুণ বেড়েছে, যা একই কোম্পানির প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণকারীদের শরীরে পাওয়া যায়নি। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, প্রথম ডোজ নেওয়ার আট সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজের মিশ্রণে শরীরে অ্যান্টিবডি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে তুলেছে। মজার বিষয় হলো, এই ভ্যাকসিনে মিশ্রণের ফলে গ্রহীতার দেহে অতিরিক্ত কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তৈরি হয়নি। গবেষণার এই ফল বিজ্ঞান সাময়িকীতে এখনও না হলেও নেচার ও অন্যন্য আউটলেটগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদনও করেছে।

স্পেনের এই গবেষণার ফল আসার পর আমরা অনেকটাই আশাবাদী, এই জাতীয় মিশ্রণ কভিড টিকাদান ব্যবস্থাগুলো একই ভ্যাকসিনের দুটি মাত্রার চেয়ে মিশ্রণে আরও বেশি কার্যকরী হচ্ছে। ফলে নির্দিষ্ট কোম্পানির ভ্যাকসিনের দিকে না চেয়ে রাষ্ট্রগুলো বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানির টিকা সরবরাহ করতে কোনো দ্বিধা করবে না।

অন্যদিকে, এই গবেষণাটি নতুন একটি দিগন্ত সূচনা করল। করোনার প্রকোপ যদি চলতে থাকে, তাহলে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের পর ভিন্ন কোম্পানির তৃতীয় ডোজের প্রয়োজন হবে কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

অন্যদিকে, গবেষকরা ইতোমধ্যে আলোচনায় এনেছেন, অপফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি ভ্যাকসিনটিতে থাকা বাহক অ্যাডিনো ভাইরাসের বারবার ডোজ নেওয়ার ফলে অ্যান্টিবডি তৈরি ক্রমশ কমে যাচ্ছে। কারণ অ্যাডিনো ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় এক ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। অন্যদিকে, আরএনএভিত্তিক ভ্যাকসিন যেমন ফাইজার ভ্যাকসিন বারবার নেওয়ার ফলে শক্তিশালী পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে বলে ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার ফাইজারের ভ্যাকসিন পাচ্ছে কিনা তা এখনও জানায়নি। তবে সম্প্রতি চুক্তি হওয়া সিনোভ্যাক ও স্পুটনিক-ভি ভ্যাকসিনের সঙ্গে অ্যাস্ট্রাজেনেকার সংমিশ্রণে ফলাফল আমরা এখনও জানি না। রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের কৌশলগত কিছুটা মিল থাকায় এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে আমরা আশাবাদী।

সরকারের উচিত হবে, অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজ গ্রহীতাদের সীমিত সংখ্যকের শরীরে রাশিয়ার ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ দিয়ে পরীক্ষা করে ফলাফল ভালো পাওয়া গেলে অবশ্যই এই ভ্যাকসিনের সমন্বয় করে অন্যদের জন্যও ব্যবস্থা করা। যদিও স্পুটনিক-ভি ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা ব্যবসায়িকভাবে এই ভ্যাকসিনের ডোজ মিশ্রণের প্রজেক্ট হাতে নিচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজের কার্যকারিতা ৮ থেকে ১২ সপ্তাহ। যদিও ভারত সম্প্রতি কিছুটা বাড়িয়েছে, তবে সেটি গবেষণার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে নয়। প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের মধ্যে ব্যবধান কমাতে সরকারের অবশ্যই উচিত এই ভ্যাকসিন সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সিদ্ধান্তে আসা। চীনের ভ্যাকসিনের দিকে না ঝুঁকে আপাতত রাশিয়ার ভ্যাকসিনের দিকে মনোনিবেশ করা। চীনের ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা প্রায় ৫০ শতাংশ হলেও এই টিকার চেয়ে রাশিয়ার স্পুটনিক বেশি শক্তিশালী।

অনেকেই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। সরকারের উচিত হবে, টিকার এই মিশ্রণে মানুষের শরীরে যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে না, তা দ্রুত জানানো। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে এসব টিকার সংমিশ্রণে অ্যান্টিবডির প্রাপ্যতাবিষয়ক তথ্য জানানো যেতে পারে।

অন্ধকার কেটে আলো আসুক এই প্রত্যাশা করি।

গবেষক, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here