সীমান্তের ১৫ জেলায় রোগী বাড়ছে দ্রুত

0
35

সত্যপাঠ ডেস্ক

পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর থেকে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে তুলনামূলকভাবে সংক্রমণ বেশি বাড়ছে। দেশের সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

১৭ থেকে ২৩ মেÍএই এক সপ্তাহের সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গতকাল বুধবার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, আগের সপ্তাহের (১০ থেকে ১৬ মে) তুলনায় ২২টি জেলায় নতুন রোগী বৃদ্ধির হার শতভাগ বা তার বেশি ছিল। এগুলোর মধ্যে ১৫টি জেলাই সীমান্তবর্তী। এই জেলাগুলোর মধ্যে নয়টির প্রতিটিতে এক সপ্তাহে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা পঞ্চাশের নিচে। সংখ্যায় কম হলেও হঠাৎ করে এক সপ্তাহের ব্যবধানে শতভাগের বেশি রোগী বেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে শঙ্কা হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।

ঈদে অনেক মানুষ ঢাকা থেকে নিজ নিজ গ্রাম এলাকায় গিয়েছিলেন। লোকসমাগমও আগের চেয়ে বেশি হয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদেরা সংক্রমণে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার এটি একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন। তাঁরা ঈদের আগেই এই শঙ্কার কথা বলেছিলেন। এর সঙ্গে করোনার ভারতীয় ধরনের (ভেরিয়েন্ট) কোনো যুক্ততা আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

অবশ্য এরই মধ্যে দেশে করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়েছে। ঈদের পর সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে তুলনামূলক সংক্রমণও বেশি বাড়তে দেখা যাচ্ছে। আক্রান্তদের কারও কারও সম্প্রতি ভারত সফরের ইতিহাস আছে। গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় এক দিনেই ভারত থেকে আসা ১৩ জনের করোনা শনাক্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছে। তাঁরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে (সঙ্গনিরোধ) আছেন। এ নিয়ে আখাউড়া সীমান্ত হয়ে আসা ২৩ জনের করোনা শনাক্ত হলো।

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্তের ঘোষণা দেওয়া হয়। চলতি বছরের মার্চ থেকে দেশে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ৫ এপ্রিল থেকে গণপরিবহন চলাচলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ ঘোষণা করে সরকার। অনেকটা শিথিল হলেও সেই বিধিনিষেধ এখনো চলছে। বিধিনিষেধের প্রভাবে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে সংক্রমণ নিম্নমুখী হতে শুরু করে। ২৯ এপ্রিল পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ১০ শতাংশের নিচে নেমেছিল। ১১ দিন ধরে রোগী শনাক্তের হারে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
যেখানে দ্রুত সংক্রমণ বাড়ছে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১০ থেকে ১৬ মে এই এক সপ্তাহের তুলনায় ১৭ থেকে ২৩ মে এই এক সপ্তাহে দেশের ২২টি জেলায় রোগী বৃদ্ধির হার শতভাগ বা তার চেয়ে বেশি। এই জেলাগুলোর মধ্যে আছে ভারতের সীমান্তবর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, লালমনিটরহাট, কুড়িগ্রাম, জয়পুরহাট, রাজশাহী, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, জামালপুর, রাঙামাটি ও বান্দরবান। এ ছাড়া এই তালিকায় আছে নাটোর, গাইবান্ধা, খুলনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, কক্সবাজার ও নরসিংদী।

এক সপ্তাহে ১০১ থেকে ৫০০ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে এমন জেলাগুলোর মধ্যে সীমান্তবর্তী সাতটি জেলা হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, রাজশাহী, যশোর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও সিলেট। এ ছাড়া এই তালিকায় আছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, নোয়াখালী ও গাজীপুর।

করোনা পরিস্থিতিবিষয়ক এক বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র নাজমুল ইসলাম বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিশেষ লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর দিকেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিশেষ নজর রাখছে। অন্য কোনো সীমান্তবর্তী জেলায় লকডাউন ঘোষণা করা হবে কি না, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহ ও জরিপ হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় জনস্বাস্থ্য নিরাপদ করতে সরকার যেকোনো সিদ্ধান্ত নেবে।
করোনা সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় গত সোমবার থেকে এক সপ্তাহের জন্য বিশেষ লকডাউন চলছে। তারপরেও সেখানকার অনেকে রাজশাহী ও ঢাকায় যাচ্ছেন। এক সপ্তাহে (১৭–২৩ মে) এই জেলায় ১৭৯ জন রোগী শনাক্ত হয়। আগের সপ্তাহে শনাক্ত হয়েছিল ৭৩ জন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান সাবেরা গুলনাহার জানান, গত মঙ্গলবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে নমুনা পরীক্ষায় প্রায় ৬২ শতাংশ ব্যক্তির দেহে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে। আর রাজশাহী জেলায় শনাক্তের হার ছিল ২৮ শতাংশ।

লালমনিরহাট সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় গত দুই সপ্তাহে ১০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আটজনেরই সম্প্রতি ভারত সফর করার ইতিহাস আছে। জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য তিনজনের নমুনা সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) পাঠানো হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।

খুলনায় এক সপ্তাহে ৩৩৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। আগের সপ্তাহে করোনা শনাক্ত হয়েছিল ১৫৪ জনের। সর্বশেষ আক্রান্তদের মধ্যে ১৯ জনের ভারত সফরের ইতিহাস রয়েছে। খুলনার সিভিল সার্জন নিয়াজ মোহাম্মদ মনে করেন, এখানে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার একমাত্র কারণ স্বাস্থ্যবিধি না মানা।

সুনামগঞ্জে ১০ থেকে ১৬ মে- এই এক সপ্তাহে চারজনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল। পরের সপ্তাহে শনাক্ত হয়েছে ১৯ জন। তবে সিভিল সার্জন শামস উদ্দিন বলেছেন, এখানে সংক্রমণ বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় কম। আগের তুলনায় মানুষ নমুনা পরীক্ষাও কম করাচ্ছেন।

১৮ মে থেকে সংক্রমণ বাড়ছে কুষ্টিয়ায়। এখন সেখানে রোগী শনাক্তের হার ১৪–১৬ শতাংশ। কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ঈদের সময় জেলায় ঢাকা থেকে অনেক মানুষ এসেছেন। এ কারণে সংক্রমণ বাড়তে পারে।

ভারত থেকে আসা ১৪৫ জন এখন কুষ্টিয়ায় কোয়ারেন্টিনে আছেন। তাঁরা ভারত থেকে নেগেটিভ সনদ নিয়ে এসেছিলেন। তবে তাঁদের মধ্যে তিনজনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।

সাতক্ষীরায় ঈদের আগে নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ছিল ১৩ শতাংশ। গত সোমবার থেকে শনাক্তের হার ৪০ শতাংশের ওপরে।

সারা দেশে শনাক্তের হার ১০ শতাংশের কাছাকাছি

ঈদের পর থেকে দেশে পরীক্ষার বিপরীতে করোনা শনাক্তের হার আবার বাড়তে শুরু করেছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রোগী শনাক্তের হার ছিল ৯ দশমিক ১১ শতাংশ। আগের দিন ছিল ১০ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৯৭ জন। মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। গতকাল পর্যন্ত মোট ৭ লাখ ৯৩ হাজার ৬৯৩ জনের দেহে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৮৬৬ জন। মারা গেছেন ১২ হাজার ৪৫৮ জন।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ঈদকেন্দ্রিক যাতায়াত ও কেনাকাটার প্রভাবে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল। ঈদের পর সংক্রমণে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সীমান্তবর্তী জেলায় যেমন বাড়ছে, তেমনি অন্য জেলাগুলোতেও বাড়ছে। ঈদকেন্দ্রিক সমাগম এবং করোনার ভারতীয় ধরনÍদুটোই কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। যেখানে রোগী বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা আছে, সেখানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে গত মার্চের মতো অপ্রত্যাশিতভাবে হঠাৎ করেই সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here