ব্ল্যাক ফাঙ্গাস চিকিৎসা ব্যয়বহুল, ওষুধও অপ্রতুল

0
18

সত্যপাঠ ডেস্ক

মিউকোরমাইকোসিস (ব্ল্যাক ফাঙ্গাস) জনিত রোগের চিকিৎসা দেশে ব্যয়বহুল। তার প্রধান কারণ ওষুধের দাম এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সেবা। এই রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ তৈরি করে একটি মাত্র কোম্পানি। আর তাদের কাঁচামাল আসে ভারত থেকে। তাই সেখানেও আছে অপ্রতুলতা রয়েছে। আর স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে- ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ সহজলভ্য করতে কাজ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ কমিটি দ্বারা এই রোগের চিকিৎসার জন্য একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করার কাজ চলছে। তবে গাইডলাইন না থাকলেও ‘বেসিক ট্রিটমেন্ট’ চালাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সন্দেহজনক রোগীর জ্বর রয়েছে। তবে তার শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল। কিন্তু চূড়ান্ত মতামত দিতে আরও সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন বারডেম হাসপাতালের রেসপিরেটরি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। সেখানে উপসর্গ দেখে চিকিৎসকরা ধারণা করেন তিনি ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত। তবে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, এটা নিশ্চিত হতে হলে তাদের সব পরীক্ষা শেষ করতে হবে।

ভারতের ‘ব্ল্যাক ফাঙ্গাস’ ছড়িয়েছে ব্যাপকভাবে। সেখানে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ১১ হাজার ৭১৭ জন। ভারতের গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও অন্ধপ্রদেশের আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি। গত সপ্তাহে ভারতে করোনাভাইরাসের রোগীদের মধ্যে মিউকরমাইকোসিস (ব্ল্যাক ফাঙ্গাস) শনাক্ত হলে এটিকে মহামারি ঘোষণা করার নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এতে সংক্রমিত প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ মারা যাচ্ছে। আর যারা বেঁচে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে একটি অংশের চোখ অপসারণ করতে হচ্ছে।

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন জানান, এই রোগীর বয়স ৫৩ বছর। তার অ্যাজমা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। চিকিৎসা নেওয়ার পর তার অবস্থার কতটা উন্নতি হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না। তার চিকিৎসাটা দীর্ঘমেয়াদি। দুই থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত চিকিৎসা দিতে হয়,কিন্তু তার চিকিৎসা শুরু হয়েছে মাত্র কয়েকদিন হলো।

চিকিৎসকদের মতে , ব্ল্যাকফাঙ্গাসের চিকিৎসা মূলত নির্ভর করে সংক্রমণের তীব্রতার ওপর। সেজন্য কিছু ওষুধ আছে, আবার তীব্রতা বেশি হলে ইনজেকশন প্রয়োগ হয়। এই চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের দাম বেশি হওয়ায় এবং রোগীর নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয় বলে এই চিকিৎসা ব্যয়বহুল।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা নাজমুল ইসলাম বলেন, মিউকোরমাইকোসিস বা কালো ছত্রাক একটি বিরল রোগ। এটি খুব বেশি মানুষের হয় বলে তথ্য-উপাত্ত বলে না। অবশ্যই এর চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল এতে কোনও সন্দেহ নেই। বিষয়টি নিয়ে গত কিছু দিন ধরে আমরা ক্রমাগত কাজ করছি এবং একটি গাইড লাইন দেওয়ার চেষ্টা করছি। ব্ল্যাক ফাঙ্গাস মোকাবিলায় যেসব ওষুধ ব্যবহার করতে হয়, সেসব কীভাবে সহজলভ্য করা যায় সে বিষয়টি নিয়েও আমরা কাজ করছি। আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দেব। তার কারণ হলো এই ওষুধগুলো সহজে পাওয়া যায় না। এই পরিস্থিতির কেউ যেন সুযোগ নিতে না পারে সে বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা অগ্রসর হচ্ছি।

প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ফাঙ্গাস প্রতিরোধে একটি ওষুধ আছে। আবার কোন কোন সময় ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের জন্য ইঞ্জেকশন দেওয়ার প্রয়োজন হয়। এই ওষুধের দামটি বেশি আবার অনেকেরই আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। যার কারণে চিকিৎসা ব্যয়বহুল।

তিনি আরও বলেন, এই রোগের চিকিৎসা নির্ভর করে মূলত তীব্রতার ওপর। এজন্য কোন ফর্মুলা নেই। মাইল্ড রোগী, মোডারেট রোগী এবং সিভিয়ার রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থায় একেক সময় লাগে। আমরা এখন যে বেসিক ট্রিটমেন্ট দিচ্ছি এটিকেই গাইডলাইনে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইনজেকশন প্রস্তুত করে শুধুমাত্র বিকন ফারমাসিউটিক্যালস। এই ওষুধের ৫০ মি লি পরিমানের একটি ভায়ালের খুচরা মুল্য ১৫ হাজার টাকার কিছু বেশি। তবে প্রচলিত ওষুধ না হওয়ায় এর উৎপাদন এবং সরবরাহ কম। আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেই এগুলো প্রস্তুত করতে হয় বলে অন্য কেউ তা তৈরি করতে চায় না বলে জানিয়েছেন বিকন ফারমাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবাদুল করিম।

তিনি বলেন, এই ওষুধ প্রস্তুত করতে খুবই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়। আর এটার কাঁচামাল যেমন অনেক দামি আবার প্রযুক্তিও দামি। যার কারণে বেশি সংখ্যক কোম্পানি পারেও না এটা বানাতে। আমাদের কাছে বর্তমানে যেটুকু স্টক আছে তাই আছে। এমনিতে তো চাহিদা অনেক কমই ছিল। এখন হঠাৎ করে এখানে চাহিদা দেখা দিয়েছে। আবার বাজার থেকে অবৈধ পথে ভারতেও চলে যেতে পারে, এজন্য আমরা সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। কাঁচামালের জন্য জন্য আমরা বলেছি, তাদের আজকে জানানোর কথা। কাঁচামাল বেশিরভাগই ভারত থেকেই আসে। সেখানেও তো সংকট।

তিনি আরও বলেন, ভারত নিজেদের চাহিদা পূরণ করেই পারছেন না। যে কারণে একটু শংকার মধ্যে আছি। আমরা আশা করি হয়তো কিছু একটা ম্যানেজ করতে পারবো। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আমরা চেষ্টা করছি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, যারা বয়স্ক, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে, তাদেরকে বেশি করে এই বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। আমি ইতোমধ্যে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানিকে নির্দেশনা দিয়েছি যাতে এই ফাঙ্গাসের জন্য যে ধরনের ওষুধ প্রয়োজন সেটা যেন এখন থেকেই তৈরি করে। আল্লাহ না করুক যদি এখানে রোগী বাড়ে, তাহলে যেন যথাযথ চিকিৎসা করা যায়।

প্রসঙ্গত এসব ছত্রাক পরিবেশে বিশেষ করে মাটি, পঁচে যাওয়া জৈব পদার্থ যেমন: পঁচা ফলমূল, পাতা বা পশুর বিষ্ঠায় ছড়িয়ে থাকে। এসব ছত্রাককে ল্যাবরেটরির কৃত্রিম মিডিয়াতে যখন বৃদ্ধি করা হয়, এদের রং হয় গাঢ় বাদামি বা কালো। তাই এদের ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা কালো ছত্রাক বলা হয়। এই ছত্রাকের সংক্রমণ ছোঁয়াচে নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here