ঘূর্ণিঝড় ইয়াস : বাঁধ ভেঙে ভাসল উপকূল, লাখো মানুষ পানিবন্দি, ৯ জেলার ২৭ উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত, ৭ জনের প্রাণহানি

0
42
ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢুকছে জোয়ারের পানি। খুলনার কয়রা উপজেলার আংটিহারা এলাকার

সত্যপাঠ ডেস্ক

ঘূর্ণিঝড় ইয়াস বুধবার সকালে ভারতের ওডিশা রাজ্যে আঘাত হানার পর ব্যাপক তান্ডব চালিয়েছে। সকাল ৯টার দিকে ওডিশার বালেশ্বরের দক্ষিণে ১৩০-১৪০ কিলোমিটার বেগে ইয়াস আছড়ে পড়ে বলে জানায় ভারতের আবহাওয়া অফিস। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে অতিপ্রবল এই ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডবে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ওডিশা ও পশ্চিমবঙ্গে অন্তত পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটেছে।

এদিকে, বাংলাদেশে আঘাত না হানলেও ইয়াসের প্রভাবে জোয়ারের পানি বেড়ে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের ২৭টি উপজেলায় ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।

ইয়াস ও পূর্ণিমার প্রভাব এবং জোয়ারের কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে দেশের উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে শত শত গ্রাম; তলিয়ে গেছে ফসলি জমি, ভেসে গেছে মাছের ঘের। বিভিন্ন স্থানে নদীতে বিলীন ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহু বাঁধ। এতে পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় অনেকে আশ্রয় নিয়েছে রাস্তার ওপরে। কোথাও কোথাও রাস্তা ভেঙে ব্যাহত হচ্ছে যোগাযোগ। দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুসহ সাতজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ইয়াসের প্রভাবে বৈরী আবহাওয়ায় নৌরুটগুলোতে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ রেখেছে বিআইডব্লিউটিসি।

গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে ঘূর্ণিঝড়ের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। ক্ষতিগ্রস্ত ২৭ উপজেলার মানুষের সহায়তায় সাড়ে ১৬ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট সংশ্নিষ্ট জেলা প্রশাসকের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এ সময় তিনি উপকূলীয় ১৪টি জেলার অবস্থা তুলে ধরেন।

ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলো হলো- শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, শরণখোলা, মোংলা, মোরেলগঞ্জ, মঠবাড়িয়া, বরগুনা সদর, পাথরঘাটা, আমতলী, পটুয়াখালী সদর, গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, দশমিনা, মির্জাগঞ্জ, কলাপাড়া, চরফ্যাশন, মনপুরা, তজুমদ্দিন, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, ভোলা সদর, হাতিয়া, রামগতি ও কমলনগর।

খুলনা , দাকোপ ও ডুমুরিয়া প্রতিনিধি জানান, খুলনার কয়েকটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। বুধবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত কয়রার পাঁচটি স্থানে, পাইকগাছা উপজেলার পাঁচটি স্থানে এবং দাকোপ উপজেলার কামিনীবাসিয়া এলাকায় বাঁধ ভাঙার খবর পাওয়া গেছে। এসব বাঁধের আশপাশে অসংখ্য গ্রাম প্লাবিত হয়ে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া জোয়ারের চাপে কয়রা উপজেলায় ২৬টি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দাকোপের চালনা পৌরসভা ও বটবুনিয়া বাজারসহ কয়েকটি স্থানে বাঁধের সড়ক ধসে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও প্রায় ১৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ।

স্থানীয়রা জানান, জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে তিন-চার ফুট বেড়ে বাঁধ উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। বাঁধ রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বালু ও জিও ব্যাগ নিয়ে প্রস্তুত থাকলেও জোয়ারের চাপে কাজ করতে পারছে না। বুধবার দুপুরে দাকোপ উপজেলার সোনার বাংলা মহাবিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে বেড়িবাঁধ সড়কের প্রায় ৬০ ফুট এলাকা শিবসা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। কয়েকশ পুকুর, ঘের ও সবজি ক্ষেত ভেসে গেছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, বাঁধ মেরামতের জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিক সরবরাহ করতে জনপ্রতিনিধিদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। ভাটা শুরু হলে কাজ শুরু হবে।

ডুমুরিয়া উপজেলায় প্লাবিত হয়েছে দুই শতাধিক বাড়িঘর, অর্ধশতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পুকুর ও মাছের ঘের। আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে ছয় শতাধিক মানুষ। এ ছাড়া উপজেলার ২৯ নম্বর পোল্ডারের বারোআড়িয়া, শম্ভুনগর, চাঁদগড় ও জালিয়াখালী বেড়িবাঁধের অবস্থা খুবই নাজুক বলে জানিয়েছেন সংশ্নিষ্ট শরাফপুর ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবি।

খুলনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন জানান, চারটি উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুই হাজারের বেশি পরিবার। ২৪০টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এসব এলাকায় ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে। এদিকে, সুন্দরবনে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে চারটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম ও সীতাকুন্ডুর সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা গেছে, জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে নগরের পতেঙ্গাসহ জেলার সীতাকু-, সন্দ্বীপ ও বাঁশখালী উপজেলার কয়েকটি নিম্নাঞ্চল। চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ইয়ার্ডেও ঢুকেছে পানি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র।

দুপুরে পতেঙ্গার নিচু এলাকায় জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ে ভেঙে যায় কয়েকটি কাঁচা ঘর ও দোকানপাট। সীতাকুন্ডের সাগর উপকূলে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ ফুট উচ্চতা বেড়ে যায়। জোয়ারের পানিতে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাইছড়ি ঘোড়ামারা, সৈয়দপুর ইউনিয়নের উত্তর বগাচতর প্লাবিত হয়েছে। দক্ষিণ সোনাইছড়িতে ১০০ ফুট ও ঘোড়ামারা এলাকায় ১০০ ফুট বেড়িবাঁধ না থাকায় ওইসব এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট। সাগরের লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

পাউবোর সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার আনিস হায়দার খান জানান, সোনাইছড়ি ও ঘোড়ামারা এলাকার ভাঙা বেড়িবাঁধের অংশটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় হওয়ায় সেখানে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না। মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বললে তারা জায়গা দিতে রাজি হয়নি।

ঘূর্ণিঝড় ইয়াস মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলায় ৫১১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গঠন করা হয়েছে একটি পর্যবেক্ষণ টিম ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেডিকেল টিম। চট্টগ্রাম নগরের ১৩টি ওয়ার্ডে ৬০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।

কক্সবাজার ও টেকনাফ সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা গেছে, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া ও মহেশখালী উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। থেমে থেমে দমকা হাওয়ায় টেকনাফ উপজেলায় সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপের ২৫টি ঘরবাড়ি এবং সাতটি ট্রলার বিধ্বস্ত হওয়ার খবর জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, জোয়ারের পানি ঢুকে দ্বীপের সাতটি অংশে ব্যাপক ভাঙন ধরেছে। শত শত গাছপালা ভেঙে সাগরে বিলীন হয়েছে। বিশেষ করে দ্বীপের উত্তর-পূর্ব বিচ, গলাচিপা, কোনাপাড়া, নজরুলপাড়া এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। টেকনাফের ইউএনও মোহাম্মদ পারভেজ চৌধুরী জানান, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

বরিশাল সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা গেছে, মেঘনা তীরবর্তী উপজেলা হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বরিশাল নগরীর প্রধান সড়ক পর্যন্ত পৌঁছেছে কীর্তনখোলার জোয়ারের পানি। বাকেরগঞ্জ উপজেলায় গতকাল প্লাবিত হওয়া বসতবাড়ির আশপাশে জোয়ারের পানিতে খেলতে নেমে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তারা হলো- ঢালমারা গ্রামের হাফিজুর রহমানের মেয়ে সুমাইয়া আক্তার (আড়াই বছর) এবং পশুরী গ্রামের আজগর আলীর মেয়ে আজওয়া আক্তার (৩)।

বাগেরহাট সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা গেছে, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলার অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি, ভেসে গেছে মাছের দুই সহস্রাধিক ঘের। ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় বিপাকে পড়েছেন মানুষ। অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন রাস্তার ওপরে। কারও কারও রান্নাবান্না বন্ধ রয়েছে। এসব মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করেছে জেলা প্রশাসন।

মোরেলগঞ্জ উপজেলার কেয়ার বাজার থেকে সন্ন্যাসী বাজারে যাওয়ার পিচঢালা রাস্তাটির দুই জায়গায় ভেঙে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া পৌর সদর, বারইখালী, খাউলিয়া, বলইবুনিয়া ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তা নদীতে বিলীন হয়েছে। এদিকে, উপজেলার চালিতাবুনিয়া গ্রামে পানিতে ডুবে জিনিয়া আক্তার নামে চার বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

শ্যামনগর প্রতিনিধি জানান, উপকূলবর্তী শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরাসহ কৈখালী জোয়ারের পানিতে সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। বুড়িগোয়ালিনী, পদ্মপুকুর, মুন্সীগঞ্জ, কাশিমাড়ী ও রমজাননগর ইউনিয়নের আরও অর্ধশতাধিক গ্রামে পানি ঢুকেছে। এসব এলাকার পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি, লক্ষাধিক একর জমির চিংড়ি ঘেরসহ হাজারও পুকুর ভেসে গেছে। অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এসব এলাকায় খাদ্যসহ বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

পটুয়াখালী, গলাচিপা ও বাউফল প্রতিনিধি জানান, জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলার চালিতাবুনিয়া ও চরমোন্তাজ, গলাচিপা উপজেলার চরকাজল ও পানপট্টি, কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ও নিজামপুর এবং দশমিনা উপজেলার রনগোপালদী ও বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১৮-১৯টি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। ফলে পুরো উপকূল এখন পানির নিচে এবং পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। এসব এলাকার ঘের, পুকুর ও বদ্ধ খালের মাছ পানি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।

চালিতাবুনিয়ার ইউপি চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম হাওলাদার জানান, ইউনিয়নের চরলতা বেড়িবাঁধের সাতটি পয়েন্টের প্রায় ৪০০ মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে।

চরমোন্তাজ ইউপি চেয়ারম্যান হানিফ মিয়া জানান, ইউনিয়নের চরআন্ডা ও দক্ষিণ চরমোন্তাজ বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে ছয়টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

এদিকে পটুয়াখালী পৌর শহরের লঞ্চঘাট, নিউমার্কেট, নতুন বাজার, পুরান বাজার, পোস্ট অফিস রোড, মহিলা কলেজ রোড, এসডিও রোডসহ শহরের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা তলিয়ে গেছে।

বাউফল উপজেলায় বেড়িবাঁধ ও জিসি সড়ক ভেঙে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলসহ প্রায় ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গতকাল বগা ফেরিঘাটের পন্টুুন, ধুলিয়, লঞ্চঘাটের পন্টুুন, নিমদী লঞ্চঘাটের পন্টুুনের গ্যাংওয়ে ছিঁড়ে গেছে। গলাচিপায় ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে দুই শতাধিক বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। পাঁচ শতাধিক পুকুর তলিয়ে মাছ ভেসে গেছে।

বরগুনা ও আমতলী সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা গেছে, বরগুনা সদর, পাথরঘাটা ও আমতলীতে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে শিশুসহ দু’জনের। জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে মাছের ঘের; তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। তবে আশ্রয়ণ কেন্দ্রে বসবাসরত বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাদের আশ্রয়ের নামে বিপজ্জনক জায়গায় রাখা হয়েছে। বরগুনা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী কাইছার আলম বলেন, আগে থেকেই বরগুনার ৬৬টি পয়েন্টে ২৯ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। জোয়ারের চাপে এসব বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত করা হচ্ছে।

পিরোজপুর, ভান্ডারিয়া ও মঠবাড়িয়া সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা গেছে, বেড়িবাঁধ ভেঙে পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার অধিকাংশ কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি; ভেসে গেছে অধিকাংশ মাছের ঘের। মঠবাড়িয়া উপজেলার একটি পৌর শহর ও ১১ ইউনিয়নের ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বলেশ্বর ও বিষখালী নদীর পানি বেড়ে বেড়িবাঁধ উপচে অর্ধশত গ্রামে প্লাবন ঘটেছে। বলেশ্বর নদের মধ্যবর্তী মাঝের চরের সাড়ে চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূূর্ণ ভেসে গেছে। অনেক এলাকায় বাঁধের আংশিক বিলীন হয়ে গেছে। এসব বাঁধ সংস্কারে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পাউবো।

ভান্ডারিয়ার কচা ও পোনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা আওলাদ হোসেন জানান, উপজেলার ১২শ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া বহু ঘেরের মাছ ভেসে গেছে।

ভোলা সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা গেছে, ঝড়ে গাছচাপা পড়ে লালমোহনে আবু তাহের (৪৮) নামে এক কৃষক মারা গেছেন। ঢেউয়ের আঘাতে সাগরকূলের ঢালচরসহ বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে দুপুরের জোয়ারের তীব্র আঘাতে মনপুরার কুলাগাজির তালুক নামক স্থান দিয়ে বাঁধ ভেঙে একটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাতের জোয়ারের আঘাতে চরফ্যাসনের ঢালচরে ৩০টি মাছের আড়তসহ অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।

পার্শ্ববর্তী চর পাতিলায় শতাধিক কাঁচা ঘরের ভিটির মাটি ভেসে গেছে। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় আরও ৫টি স্থান দিয়ে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

মুন্সীগঞ্জ ও লৌহজং সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা গেছে, বুধবার সকালে পদ্মায় ঢেউয়ের তোড়ে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ২ নম্বর ফেরিঘাটের পন্টুুন দুই ভাগ হয়ে নদীতে ভেসে গেছে। এ ঘটনার পর নিরাপত্তার স্বার্থে ঘাটে নোঙর করা ফেরি নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে বিআইডব্লিউটিএ দেশে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করায় শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ রেখেছে বিআইডব্লিউটিসি। এতে ঘাটে পাঁচ শতাধিক গাড়িসহ কয়েক হাজার মানুষ আটকা পড়েছে।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা গেছে, দমকা হাওয়া ও তীব্র ঢেউয়ের কারণে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল মঙ্গলবার রাত থেকে বন্ধ রয়েছে। এতে দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় মহাসড়কে নদীপারের অপেক্ষায় আটকে থাকা যানবাহনের দীর্ঘ সারি সৃষ্টি হয়েছে।

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের আড়মুখী গ্রামে হঠাৎ ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়েছে অর্ধশত বাড়িঘর। উপড়ে গেছে শত শত গাছপালা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সদর উপজেলার আড়মুখী গ্রামে এ ঝড় আঘাত হানে।

নলডাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কবীর হোসেন জানান, স্বল্প সময়ের ঝড়ে আড়মুখী গ্রামের কুটিপাড়া থেকে পশ্চিমপাড়া পর্যন্ত শতাধিক কাঁচাপাকা বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝড়ের কবলে পড়ে নারী-শিশুসহ তিনজন আহত হয়েছেন। ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তাদের শুকনা খাবার দেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরের কমলনগর ও রামগতিতে অন্তত ১৫ গ্রাম, ঝালকাঠির রাজাপুরে ২০ গ্রাম, কাঁঠালিয়ায় উপজেলা পরিষদ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফসলি মাঠসহ ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here