বিদ্যুতের পরিকল্পনাগুলো কাজ করছে না

0
33

সত্যপাঠ ডেস্ক
দেশের বিদ্যুৎ খাত নিয়ে গত এক দশকে দুটি মহাপরিকল্পনা হাতে নেয় সরকার। এসব মহাপরিকল্পনা গ্রহণের সময়ে করা প্রক্ষেপণগুলোর সঙ্গে পরে বাস্তবতার ফারাক দেখা গিয়েছে বিস্তর। ফলে এগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে তোলা হলেও দুর্বলতা থেকে গিয়েছে সঞ্চালন ব্যবস্থায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতে গত এক দশকে নেয়া পরিকল্পনাগুলো খুব একটা কার্যকর হয়ে উঠতে পারেনি। এ অবস্থায় পুরনোগুলোকে পর্যালোচনার ভিত্তিতে নতুন একটি মহাপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে গুরুত্ব পাচ্ছে জ্বালানি মিশ্রণ, সঞ্চালন ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা ও চাহিদা বিবেচনায় নতুন কেন্দ্র স্থাপনের মতো বিষয়গুলো।
চাহিদা নির্দিষ্ট হারে বাড়বে ধরে নিয়ে বিদ্যমান মহাপরিকল্পনায় ২০৪১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬০ হাজার মেগাওয়াট। জ্বালানি হিসেবে তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনার কথাও বলা হয়েছিল। এরপর পাঁচ বছর পেরুলেও প্রক্ষেপণ অনুযায়ী চাহিদা বাড়েনি। যদিও এ সময়ে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এমন বাস্তবতায় পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান (পিএসএমপি)-২০১৬ পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পরিকল্পনায় নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় উৎপাদন-চাহিদা, মিশ্র জ্বালানির ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত কম গুরুত্ব পাওয়ায় নানা দিকে ঘাটতি তৈরি হয়। ফলে দেশের বর্তমান বিদ্যুতের চাহিদা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিবেশ বিপর্যয় ও তেলের বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পর্যালোচনায় গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র যথা সময়ে উৎপাদনে আসেনি সেগুলো কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। এসব জায়গায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে বিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখা হচ্ছে।
জ্বালানির সংস্থানের পাশাপাশি উৎপাদন মূল্য নিয়ন্ত্রণে ফুয়েল মিক্সিং বা জ্বালানি মিশ্রণ করা হয়ে থাকে। মূলত সুলভ জ্বালানিনির্ভর কেন্দ্র থেকে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে এটি প্রাপ্যতা বিবেচনায় নিয়ে অন্য জ্বালানির ওপরও নির্ভরতা বাড়ানো হয়।
বিদ্যমান মহাপরিকল্পনায় জ্বালানি মিশ্রণের যে প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। পিএসএমপি-২০১৬ অনুযায়ী, মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩৫ ভাগ হবে কয়লায়, ৪৫ ভাগ হবে গ্যাস ও এলএনজিতে। আর তরল জ্বালানি থেকে আসবে ১০ ভাগ। এছাড়া ১০ ভাগ আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। তবে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিংহভাগই আসছে তেল ও গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, আমরা মূলত বৈশ্বিক জ্বালানির বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যের ওপর আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নির্ভরশীলতা যেহেতু বাড়ছে, তাই এর বিকল্প কিছু নেই। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কমানোর বিষয়ে আমরা চিন্তা করছি। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র এরই মধ্যে চালু হয়েছে। আরো কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার অপেক্ষায়। সব মিলিয়ে মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনাই সরকারের লক্ষ্য।
দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ২৪ হাজার মেগাওয়াট। যদিও সক্ষমতার অর্ধেক ব্যবহূত হচ্ছে। বাকি বিদ্যুৎ ব্যবহারে কোনো খাত তৈরি করতে পারেনি বিদ্যুৎ বিভাগ। এছাড়া পুরোদমে উৎপাদনের অপেক্ষায় রয়েছে পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি আরো দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সব মিলিয়ে এ বছর শেষ নাগাদ আরো প্রায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তুত হচ্ছে।
বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে অসামঞ্জস্যতা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখন আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৪ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে ক্যাপটিভ সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট। ফলে সক্ষমতা সব মিলিয়ে ১৫-১৬ হাজারের বেশি নয়। বাস্তবিক অর্থে উৎপাদন ও চাহিদা ঠিকই রয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ব্যবহার কমিয়ে আনতে সরকার এরই মধ্যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে তেলচালিত রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও দ্রুত বন্ধ করার কথা বলা হচ্ছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী চার বছরের মধ্যে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাবে। মেয়াদ শেষ হওয়ায় তেলভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যদিও রেন্টাল-কুইক রেন্টাল আরো কিছু কেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হলেও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিবেচনায় নবায়ন করা হয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতায় মহাপরিকল্পনাটি পর্যালোচনা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার কারিশমা জাহান। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলনির্ভর রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধের কথা বলা হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন করা যায়নি। উল্টো অনেক রেন্টাল-কুইক রেন্টালের মেয়াদ নতুন করে বাড়ানো হচ্ছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এমন কারণ দেখিয়ে এসব কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ছে। অথচ এতে দেশের বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। এদিকে নতুন নতুন আরো বিদ্যুৎকেন্দ্র আসছে। অতিরিক্ত সক্ষমতার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় ২০ শতাংশের মতো বেশি রাখা হয়। যদিও আমাদের দেশে তা প্রায় ৫০ শতাংশের মতো। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতে প্রতিযোগিতাহীন দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেয়ার কারণে যোগ্য ও দক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মহাপরিকল্পনায় ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ এলএনজি থেকে ব্যবহারের কথা বলা হলেও চলতি বছরে তা ৫ শতাংশ করা যায়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়ায় গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ক্রয় করা যায়নি। অন্যদিকে মোট বিদ্যুতের ১৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও চলতি বছর পর্যন্ত তা ২ শতাংশের বেশি হয়নি।
বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ) সভাপতি ইমরান করিম বলেন, মহাপরিকল্পনায় কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলো কমানো উচিত। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এতগুলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা নেই। বরং গ্যাসভিত্তিক যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে সেগুলোর দিকে বেশি করে নজর দিতে হবে। গ্যাস আমদানি করে হলেও দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রেখে সরবরাহ ব্যবস্থা কীভাবে ঠিক রাখা যায়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া উচিত।
বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধি, উপযোগী এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প অগ্রাধিকার দিয়ে ২০১০ সালে পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান (পিএসএমপি)-২০১০ তৈরি করা হয়। জাপান ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনের (জাইকা) সহায়তায় বিদ্যুৎ খাতের প্রথম এ মহাপরিকল্পনা তৈরি করে সরকার। পিএসএমপি-২০১০-এ মিশ্র জ্বালানির বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে কয়লা থেকে ৫০ শতাংশ (দেশীয় ৩০ ও আমদানি ২০), ২৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস, ২০ শতাংশ পরমাণু ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ৫ শতাংশ তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশীয় উৎপাদনে কয়লার ঘাটতি, ক্রমাগত প্রাকৃতিক গ্যাস কমে আসা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরমাণু প্রযুক্তি সুযোগ তৈরি না হওয়ায় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ‘পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান (পিএসএমপি)-২০১৬’ প্রণয়ন করা হয়। মূলত ২০১০ সালের মাস্টারপ্ল্যানকে ভিত্তি ধরে বিদ্যুতের নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। দেশীয় ও আমদানীকৃত গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যুতের অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করে দেশে অর্থনীতির টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন করা। এ মহাপরিকল্পনার অনেক লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন না হওয়ায় তা এখন পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন পড়ছে।
বিদ্যুতের নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘাটতি রয়েছে এমন বিষয়গুলোকে নতুন মহাপরিকল্পনায় গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বিশেষত বিদ্যুতের চাহিদা তৈরিতে এবার জোর দিচ্ছি। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলো বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এছাড়া ২০৪০ সাল নাগাদ আমাদের যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সেটি পূরণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সব ধরনের জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টিকে সামনে রাখা হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here